হাত থেকে ফোন খসে পড়ল ডেভিডের। কোনোমতে উঠে দাঁড়াল, পায়ের তলাটা ফাঁকা ঠেকল। মনে হলো অসীম এক ঘূর্ণির মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে ও। ঘরটা অস্পষ্ট হয়ে উঠল, দুলছে।
অ্যালিস, আর্তনাদ করে উঠল ডেভিড। অন্ধের মতো এগোল সে দরজার দিকে।
.
তোমার স্ত্রী মা হিসেবে খুব চমৎকার, ডেভিড। নিজের কথা সে একটুও ভাবেনি। বাচ্চাটার জন্য চিন্তায় চিন্তায়…
ড. জেফারসের একটা কথাও শুনছে না ডেভিড। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অ্যালিসের পান্ডুর মুখের দিকে। অ্যালিসের মুখের পেশী বার কয়েক কাঁপল, চোখ মেলে চাইল ও। অস্ফুট একটা হাসি ফুটল ঠোঁটে, তারপর কথা বলতে শুরু করল। আস্তে আস্তে বলছে অ্যালিস। মা হিসেবে বাচ্চার প্রতি একজন তরুণীর কি দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাই বর্ণনা দিচ্ছে সে। ধীরে ধীরে গলা চড়ল ও, ভয় ফুটল কণ্ঠে, তীব্র বিতৃষ্ণা বিষোদগার হলো। ডাক্তারের মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু ডেভিড বারবার কেঁপে উঠল। থামাতে চাইল ও অ্যালিসকে, কিন্তু পারল না।
বাচ্চাটা ঘুমাতে চাইত না। আমি ভেবেছিলাম ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ও দোলনায় শুয়ে থাকত আর শুধু চেয়ে থাকত। আর গভীর রাতে উঠে কাঁদতে শুরু করত, সারারাত। একের পর এক রাত। কত চেষ্টা করেছি থামাতে। পারিনি। আর আমিও ওর কান্নার চোটে একটা রাতও ঘুমাইনি।
মাথা নাড়লেন ড. জেফারস। ক্লান্তির চরমে পৌঁছে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। কিন্তু এখন ও দ্রুত আরোগ্যের পথে। কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে আশা করি।
অসুস্থ বোধ করছে ডেভিড। বাচ্চা? আমার বাচ্চাটার কী অবস্থা?
ও ঠিকই আছে।
ধন্যবাদ, ডক্টর। আপনাকে যে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব…
ওকে ওকে, সান। এমনিতেই খাটো মানুষ আমি। কৃতজ্ঞ করে আরও খাটো কোরো না। বরং ধন্যবাদ প্রাপ্য তোমাদের ওই হাউজকীপারের। অ্যালিস অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল বাথরুমে। এমনিতেই ক্লান্ত শরীর, তারপর প্রচন্ড ঠান্ডা। ভাগ্যিস নিউমোনিয়াটা ওকে খুব বেশি কাবু করার আগেই আমি উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। তোমাদের হাউজকীপার যদি বাথরুমের দরজা ভেঙে অ্যালিসকে বের করতে আরও ঘণ্টাখানেক দেরি করত তাহলে ওকে বাঁচানো কষ্টকর হয়ে উঠত। এনিওয়ে, অ্যালিসকে তুমি শিগগিরই বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। কাজেই চিন্তার কিছু নেই।
ডাক্তার দরজাটা ভেজিয়ে চলে গেলেন। অ্যালিস দুর্বল গলায় ডাকল, ডেভিড!
ঘুরল ডেভিড। জড়িয়ে ধরল অ্যালিসকে। অ্যালিস ওর হাত দুটো শক্ত করে ধরে থাকল। ভীত গলায় বলতে শুরু করল, আমি নিজের সঙ্গে প্রতারণা করেছিলাম। তোমাকে বুঝতে দিইনি হাসপাতাল থেকে ফেরার পরেও আমি শরীরে পুরো শক্তি ফিরে পাইনি। কিন্তু বাচ্চাটা আমার দুর্বলতা টের পেয়ে গিয়েছিল। তাই প্রতি রাতে ওটা কাঁদত। কিন্তু যখন কাঁদত না তখন অস্বাভাবিকরকম নিরব থাকত। আমি রাতে ঘরের বাতি জ্বালাতে সাহস পেতাম না। জানতাম আলো জ্বাললেই দেখব ও আমার দিকে একঠায় তাকিয়ে আছে।
ডেভিড জড়িয়ে ধরে আছে অ্যালিসকে। অ্যালিসের প্রতিটি কথা ও উপলব্ধি করতে পারছে অন্তরে অন্তরে। বাচ্চাটাকে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে ও, টের পাচ্ছে ওর উপস্থিতি। এই বাচ্চা প্রতিদিন গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে যখন আর সবার বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবে ঘুমায়। এই বাচ্চা জেগে থাকে, যখন কাঁদে না তখন চিন্তা করে। আর তার দোলনা থেকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে। এসব কি হচ্ছে? নিজেকে ভর্ৎসনা করল ডেভিড। এত চমৎকার তুলতুলে একটা বাচ্চাকে নিয়ে এসব কী ভাবছে সে। অ্যালিসের দিকে মনোযোগ দিল সে।
অ্যালিস বলে চলেছে, আমি বাচ্চাটাকে খুন করতে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, তাই। তুমি যেদিন শিকাগো গেলে তার পরদিনই আমি ওর ঘরে ঢুকে ঘাড়ের নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু হাত শুধু ঢুকিয়েই থাকলাম। অনেকক্ষণ নড়তেই পারলাম না। ভীষণ ভয় লাগছিল আমার। তারপর বিছানার চাদর দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে, উল্টো অবস্থায় রেখে দৌড়ে পালালাম ঘর থেকে।
ডেভিড ওকে থামাতে চাইল।
না, আমাকে আগে শেষ করতে দাও। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ফোঁসফেঁসে গলায় বলল অ্যালিস। ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ভাবলাম ঠিক কাজটাই করেছি আমি। বাচ্চারা দোলনায় কাপড় পেঁচিয়ে এভাবে শ্বাসরোধ হয়ে কতই তো মারা যায়। কেউ জানবেই না যে আমিই কাজটা করেছি। কিন্তু ওকে মৃত অবস্থায় দেখব বলে যেই ঘরে ঢুকেছি… ডেভিড, বিশ্বাস করো, দেখি কি ও মরেনি! হ্যাঁ, মরেনি। বেঁচে আছে। তোষকে পিঠ দিয়ে হাসছে আর বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। তারপর ওকে আর আমার ধরার সাহসই হলো না। আমি সেই যে ও ঘর থেকে চলে এলাম আর সেদিকে গেলাম না। আমি ওকে খাওয়াতেও যাইনি কিংবা একবার দেখতেও যাইনি। হয়তো হাউজকীপার ওকে খাইয়েছে। ঠিক জানি না। আমি, শুধু জানি সারারাত সে চিৎকার করে কেঁদে আমাকে জাগিয়ে রাখত। আর মনে হতো সমস্ত বাড়িতে ওটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভয়ে আর দুশ্চিন্তায় আমি ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়লাম। হাঁপিয়ে উঠছে অ্যালিস। দম নিতে একটু থামল। তারপর আবার শুরু করল, বাচ্চাটা ওখানে সারাদিন শুয়ে থাকে আর খালি আমাকে খুন করার পরিকল্পনা আঁটে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। কারণ ও বুঝতে পেরেছে ওর সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জেনে ফেলেছি। ওর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ভালবাসা নেই; আমাদের মধ্যে কোনো নিরাপত্তার বন্ধন নেই; কোনোদিন হবেও না।
