অবশ্যই। আহারে, আমার সোনা রে । অন্ধকারে একা কেঁদে কেঁদে না জানি কত কষ্টই পেয়েছে। আজ রাতে ওকে আমাদের ঘরে নিয়ে যাই, কি বলো? এখানে একা থাকলে আবার যদি কাঁদে।
আদর দিয়ে দিয়ে তুমিই ওকে নষ্ট করবে, বলল অ্যালিস।
কোনো কথা না বলে বাচ্চাটাকে দোলনাসহ নিজেদের শোবার ঘরে নিয়ে চলল ডেভিড। টের পেল অ্যালিসের চোখ তাদেরকে অনুসরণ করছে।
.
নিঃশব্দে কাপড় ছাড়ল ডেভিড। বসল খাটের এক কোনায়। হঠাৎ কি মনে পড়তে হাতের তালুতে ঘুসি মারল ও।
ধুত্তুরি! তোমাকে বলতে ভুলেই গেছি। আমাকে সামনের শুক্রবার শিকাগো যেতে হবে।
আবার শিকাগো কেন?
যাওয়ার কথা ছিল তো আরও দুমাস আগে। তোমার কথা ভেবে পিছিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওদিকের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে না গেলেই নয়।
কিন্তু তুমি গেলে যে আমি একদম একা হয়ে পড়ব।
তোমার জন্য নতুন হাউজকীপার ঠিক করেছি আমি। মহিলা শুক্রবার আসবে। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া আমি তো মাত্র অল্প কটা দিন থাকব।
তবুও আমার ভয় করছে। কেন জানি না এত বড় বাড়িতে একা থাকার কথা ভাবলেই বুকটা কেমন করে ওঠে। আমি যদি তোমাকে সব কথা খুলে বলি তুমি নির্ঘাত আমাকে পাগল ঠাওরাবে। আমার মনে হচ্ছে। আমি পাগল হয়ে যাব।
বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল ডেভিড। ঘরের বাতি নেভানো। অন্ধকারে বিছানার ধারে হেঁটে এল অ্যালিস, ব্ল্যাংকেট তুলল, ঢুকল ভেতরে। ক্রিমের মিষ্টি গন্ধ নাকে ভেসে এল, রমণীর উষ্ণ শরীর উত্তেজিত করে তুলল ডেভিডকে। সে অ্যালিসকে জড়িয়ে ধরল। তুমি যদি আমাকে আরও কয়েকটা দিন পরে যেতে বলো তাহলে আমি
না, শরীর থেকে ডেভিডের হাতটাকে আস্তে সরাল অ্যালিস। তুমি যাও। আমি জানি ব্যাপারটা জরুরি। আমি আসলে তোমাকে যে কথাগুলো বললাম তখন সেগুলো সম্পর্কে এখন ভাবছি। কিন্তু বাচ্চাটা- শ্বাস টানল ও। তোমাকে সে কি নিরাপত্তা দেবে, ডেভিড?
কী বলা যায় ভাবছিল ডেভিড। বলবে যে সে যতসব আজগুবি ব্যাপার নিয়ে অহেতুক চিন্তা করে মরছে? এমন সময় খুট করে বেড সুইচ টিপল অ্যালিস। সাদা আলোয় উদ্ভাসিত হলো বেডরুম।
দ্যাখো, আঙুল দিয়ে নির্দেশ করল অ্যালিস।
বাচ্চাটা শুয়ে আছে দোলনায়। চকচকে কালো চোখ মেলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
আবার বাতি নেভাল অ্যালিস। সরে এল ডেভিডের দিকে। থরথর করে কাঁপছে ওর শরীর।
যাকে আমি জন্ম দিয়েছি তাকে এত ভয় পাব কেন, অ্যালিসের ফিসফিসে কণ্ঠ কর্কশ এবং দ্রুত হয়ে উঠল। কারণ ও আমাকে খুন করতে চেয়েছে। ও ওখানে শুয়ে আছে, আমাদের সব কথা শুনছে, সব বুঝতে পারছে। অপেক্ষা করছে কবে তুমি বাইরে যাবে আর সে আবার আমাকে খুন করার চেষ্টা চালাবে। ঈশ্বরের দোহাই বলছি! কান্নায় গলা বুজে এল অ্যালিসের।
প্লীজ! ওকে থামাতে চেষ্টা করল ডেভিড। কেঁদো না, প্লীজ!
অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল অ্যালিস অন্ধকারে। স্বামীকে জড়িয়ে ধরে থাকল। আস্তে আস্তে কাঁপুনিটা কমে গেল, নিঃশ্বাস হয়ে উঠল। স্বাভাবিক এবং নিয়মিত। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
চোখ লেগে এল ডেভিডেরও।
ঘুমের গভীরে তলিয়ে যেতে যেতে একটা শব্দ শুনল সে।
ছোট্ট, ভেজা, রবারের ঠোঁট থেকে একটা শব্দ। ঘুমিয়ে পড়ল ডেভিড।
.
সকালবেলা ঝরঝরে মন নিয়ে ঘুম থেকে জাগল ওরা। অ্যালিস মধুর হাসল স্বামীর দিকে চেয়ে। হাতঘড়িটা দোলনার ওপর দোলাল ডেভিড, সূর্যের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল কাঁচ। দেখো, বাবু, দেখো, কি চকমকে, কি সুন্দর! কি চকমকে, কি সুন্দর! সুর করে বলছে সে।
আবারও হাসল অ্যালিস স্বামীর ছেলেমানুষী দেখে। মনে এখন ওর আর কোনো শঙ্কা নেই। ডেভিড নিশ্চিন্তে তার ব্যবসার কাজে শিকাগো যেতে পারে। ভয় পাবে না অ্যালিস। বাচ্চার যত্ন ঠিকই নিতে পারবে সে।
শুক্রবার সকালে শিকাগোর উদ্দেশ্যে উড়াল দিল ডেভিড। নীল আকাশ, পেঁজা তুলো মেঘ আর সূর্যের ঝকঝকে সোনালি রশ্মি ছুঁয়ে গেল ওকে। ফ্রেশ মুড নিয়ে শিকাগো এয়ারপোর্টে পা রাখল ও। শেরাটন হোটেলে আগেই রুম বুক করা ছিল। ওখানে উঠেই প্রথমে লং ডিসট্যান্স কলে অ্যালিসকে ফোন করে জানাল সে ঠিকঠাক মতো পৌঁছেছে। তারপর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ডেভিড। ইমপোর্ট এক্সপোর্টের ব্যবসা ওর। পরবর্তী ছটা দিন ঝড় বয়ে গেল ওর ওপর দিয়ে একটা বিজনেস ডিল করতে গিয়ে। এর মধ্যে একদিন লস এঞ্জেলেসে ফোন করল ও। কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া পেল না। ফোন ডেড। তবে চিন্তিত হলো না ডেভিড। মাঝে মাঝে এভাবে ফোন ডেড হয়ে পড়ে ওদের বাসায়। কাছের এক্সচেঞ্জে কমপ্লেন জানালে আবার ঠিক হয়ে যায়। এবারও ওরকম কিছু একটা হয়েছে ভেবে ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবল না সে। কাজের মধ্যে এত বুঁদ হয়ে গেল সে বাড়ির কথা প্রায় মনেই পড়ল না। সপ্তম দিনে, ব্যাংকোয়েট হলে একটা কনফারেন্স সেরে রুমে ফিরেছে ডেভিড, জামা কাপড় ছাড়ছে বিশ্রাম নেয়ার জন্য, ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল ফোন। অপারেটর জানাল লস এঞ্জেলেস থেকে লং ডিসট্যান্স কল। খুশি হয়ে উঠল ডেভিড। নিশ্চয় অ্যালিস। যাক, তাহলে এবার ওদের ফোনটা তাড়াতাড়িই ঠিক হয়েছে।
অ্যালিস? আগ্রহ ভরে ডাকল ডেভিড।
না, ডেভিড। ড. জেফারস বলছি।
ড. জেফারস!
একটা খবর দেব। কিন্তু ভেঙে পড়া চলবে না। শোনো, অ্যালিস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমার ক্লিনিকে আছে। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এসো। ওর নিউমোনিয়া হয়েছে। ভেব না, আমার পক্ষে যতদূর সম্ভব অ্যালিসের জন্য করব। তবে ওর পাশে এখন তোমাকে খুব দরকার।
