বুঝলাম সন্তান জন্ম নেবার সময়টা খুব সুখকর কিছু নয়, চেয়ারে বসতে বসতে বলল ডেভিড। কিন্তু সব মায়েরই তার বাচ্চার প্রতি কিছু না কিছু মায়া থাকে।
ঝট করে মুখ তুলল অ্যালিস। ওভাবে বলছ কেন? ওর সামনে এসব কথা কক্ষনো বলবে না। পরে বোলো। যদি তোমার বলার এত ইচ্ছে থাকে।
কীসের পরে! সংযম হারাল ডেভিড। ওর সামনে বললেই বা কি আর পেছনে বললেই বা কি! হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল ও। ডাক্তারের কথা মনে পড়ে গেছে। অ্যালিসের মানসিক অবস্থা এখন ভাল নয়। ওর সঙ্গে রাগারাগি করা চলবে না। ঢোক গিলল ডেভিড। নিচু গলায় বলল, দুঃখিত, অ্যালিস।
কোনো কথা বলল না অ্যালিস। প্রায় নিঃশব্দে শেষ হলো ওদের মধ্যাহ্ন ভোজন।
রাতে ডিনারের পর, ডেভিড বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেল ওপরে। অ্যালিস ওকে কিছু বলেনি। কিন্তু ওর নিরব অভিব্যক্তি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল কাজটা ডেভিডকেই করতে হবে।
নার্সারীতে বাচ্চাকে রেখে নিচে নেমে এল ডেভিড। রেডিওতে মিউজিক বাজছে, অ্যালিস সম্ভবত শুনছে না। ওর চোখ বন্ধ, আড়ষ্টভাবে শুয়ে আছে বিছানায়। শব্দহীন পায়ে এগিয়ে এল ডেভিড। দাঁড়াল অ্যালিসের পাশে। একটা হাত রাখল চূর্ণ কুন্তলে। চমকে চোখ মেলে চাইল অ্যালিস। স্বামীকে দেখে স্বস্তি ফুটল দুচোখের তারায়। যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল ওর শরীরে, জড়িয়ে ধরল সে ডেভিডকে। ডেভিড টের পেল ওর আড়ষ্ট শরীর ধীরে ধীরে নমনীয় হয়ে যাচ্ছে, যেন প্রচন্ড ভয় পেয়েছিল কোনো কারণে, এখন পরম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে স্বামীর বুকে। ডেভিড ওর ঠোঁট খুঁজল। অনেকক্ষণ এক হয়ে থাকল দুজোড়া অধর।
তুমি, তুমি খুব ভাল, ডেভিড, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল অ্যালিস। কত নিশ্চিন্তে তোমার ওপর ভরসা করতে পারি আমি! এত নির্ভরযোগ্য তুমি!
হাসল ডেভিড। বাবা বলতেন–পুত্র, মনে রেখো, তোমার সংসারে তুমিই একমাত্র অবলম্বন।
কালো, উজ্জ্বল কেশরাজি ঘাড় থেকে সরাল অ্যালিস। তোমার বাবার যোগ্য পুত্ৰই হয়েছ বটে। তোমাকে পেয়ে এত সুখী আমি। জানো, প্রায়ই ভাবি এখনও যেন আমরা নবদম্পতিই রয়ে গেছি। আমাদের নিজেদের ছাড়া আর কারও কথা ভাবতে হচ্ছে না, কারও দায়িত্ব নিতে হচ্ছে না, আমাদের কোনো সন্তান নেই।
ডেভিডের হাত দুটো নিজের গালে ছোঁয়াল অ্যালিস। হঠাৎ অস্বাভাবিক সাদা হয়ে উঠেছে তার মুখ।
ওহ, ডেভিড, একটা সময় ছিল যখন ছিলাম শুধু তুমি আর আমি। আমরা পরস্পরকে নিরাপত্তা দিতাম। আর এখন এই বাচ্চাটাকে আমাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, কিন্তু বদলে তার কাছ থেকে কোনো নিরাপত্তা পাব না। আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছ? হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে আমি কত কিছু চিন্তা করেছি। দুনিয়াটা হচ্ছে একটা মন্দ জায়গা-
তাই কি?
হ্যাঁ, তাই। কিন্তু আইন সকল মন্দ থেকে আমাদের রক্ষা করে। যখন আইন বলে কিছু থাকে না তখন ভালবাসা নিরাপত্তার সন্ধান দেয়। আমি তোমাকে আঘাত করছি, কিন্তু আমার ভালবাসা তোমাকে রক্ষা করছে। যদি ভালবাসা না থাকত তাহলে পৃথিবীর সব মানুষই অসহায় হয়ে পড়ত। আমি তোমাকে ভয় পাই না। কারণ আমি জানি তুমি আমার ওপর যত রাগ করো, বকা দাও, খারাপ ব্যবহার করো, সব কিছুর ওপর ছাপিয়ে ওঠে আমার প্রতি তোমার গভীর প্রেম, নিবিড় ভালবাসা। কিন্তু বাচ্চাটা? ও এত ছোট যে ভালবাসা কিংবা অন্য কোনো কিছুই সে বুঝবে না যতক্ষণ না আমরা তাকে ব্যাপারটা বোঝাই। যেমন ধর, ও কি এখন বুঝবে কোনটা ডান আর কোনটা বাম?
এখন বুঝবে না। তবে সময় হলে শিখে নেবে।
কিন্তু… কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল অ্যালিস, নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ডেভিডের বাহুবন্ধন থেকে।
কীসের যেন শব্দ শুনলাম!
ডেভিড চারদিকে চাইল । কই, আমি তো কিছু শুনিনি…। লাইব্রেরি ঘরের দরজার দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে। অ্যালিস। ওই ওখানে, ফিসফিস করে বলল সে।
ঘর থেকে বেরুল ডেভিড, খুলল লাইব্রেরি ঘরের দরজা। আলো জ্বেলে এদিক ওদিক চাইল। কিছু চোখে পড়ল না। আলো নিভিয়ে আবার ফিরে এল অ্যালিসের কাছে। নাহ্, কিছু নেই, বলল ও। তুমি আসলে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। নাও, এখন শুতে চলো দেখি।
নিচতলার সব আলো নিভিয়ে ওরা উঠে এল ওপরে। সিঁড়ির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে অ্যালিস বলল, অনেক আজেবাজে কথা বলেছি, ডেভিড । কিছু মনে কোরো না। আসলেই আমার শরীরটা তেমন ভাল নেই।
অ্যালিসের কাঁধে হাত রাখল ডেভিড। কিছু মনে করেনি সে।
নার্সারী রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল অ্যালিস, ইতস্তত করছে। তারপর হাত বাড়াল পেতলের নবের দিকে, দরজা খুলে পা রাখল ভেতরে। খুব সাবধানে এগিয়ে চলল বাচ্চার দোলনার দিকে। ঝুঁকল অ্যালিস, সঙ্গে সঙ্গে কাঠ হয়ে গেল শরীর। ডেভিড! চিৎকার করল ও।
দৌড়ে দোলনার কাছে চলে এল ডেভিড।
.
বাচ্চাটার মুখ টকটকে লাল, সম্পূর্ণ ভেজা; ছোট্ট হাঁ-টা বারবার খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে; চোখ দুটো যেন জ্বলছে রাগে। হাতজোড়া সে তুলে রেখেছে শূন্যে, যেন বাতাস খামচে ধরার চেষ্টা করছে।
আহারে, দরদ ঝরে পড়ল ডেভিডের গলায়, আমার সোনাটা না জানি কতক্ষণ ধরে কেঁদেছে।
কেঁদেছে? অ্যালিস দোলনার একটা পাশ আঁকড়ে ধরল ভারসাম্য রক্ষার জন্য। কই কান্নার আওয়াজ তো শুনলাম না।
দরজা বন্ধ, শুনবে কী করে?
এজন্যই বোধহয় ওর মুখ এত লাল আর এত জোরে শ্বাস টানছে?
