চোখ খুলল না অ্যালিস। নরম গলায় বলল, আমি জেগে আছি। অবাক কান্ড। কথা বলছে সে। তার মানে মারা যায়নি!
অ্যালিস! অনুভব করল ওর হাত দুটো উষ্ণ আবেগে চেপে ধরেছে ডেভিড।
তুমি খুনিটার সঙ্গে দেখা করতে চাইছ, ডেভিড, ভাবল অ্যালিস। আমি শুনতে পাচ্ছি তুমি ওটাকে দেখতে চাইছ, তাহলে আর আমার কিছুই বলার নেই। চোখ খুলল অ্যালিস। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ডেভিড। দুর্বল হাতটা বাড়াল অ্যালিস, শুজনিটা সরাল একপাশে।
ঘাতক তাকাল ডেভিডের দিকে। তার ছোট্ট মুখটা লাল, কালো গভীর চোখ জোড়া শান্ত। ঝিকমিক করছে।
ইসসিরে! হেসে উঠল ডেভিড। কী সুন্দর আমার সোনাটা! চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকল সে, আস্তিন ধরে টান দিলেন ডা. জেফারস।
না, না, এখন নয়, পরে, বললেন তিনি। নবজাতক শিশুকে এভাবে চুমু খেতে নেই। তুমি আমার চেম্বারে এসো। কথা আছে।
যাওয়ার আগে অ্যালিসের হাতে চাপ দিল ডেভিড। কৃতজ্ঞ গলায় বলল, ধন্যবাদ, অ্যালিস। অসংখ্য ধন্যবাদ।
ক্লিষ্ট হাসল অ্যালিস। কিছু বলল না।
ডাক্তারের রুমে ঢুকল ডেভিড । হাত ইশারায় ওকে বসতে বললেন ডা. জেফারস। একটা সিগারেট ধরালেন। গম্ভীর মুখে অনেকক্ষণ চুপচাপ টানলেন ওটা। তারপর কেশে গলা পরিষ্কার করলেন। সোজা তাকালেন ডেভিডের চোখে।
বাচ্চাটাকে তোমার স্ত্রী মেনে নিতে পারছে না, ডেভিড।
কী!
ওর জন্য খুব কঠিন সময় গেছে। তোমাকে তখন বলিনি তোমার টেনশন বাড়বে বলে। ডেলিভারি রুমে অ্যালিস হিস্টিরিয়া রোগীর মতো চিৎকার করে অদ্ভুত সব কথা বলছিল–আমি ওগুলো রিপিট করতে চাইছি না। তবে বুঝতে পারছি বাচ্চাটাকে সে নিজের বলে ভাবতে পারছে না। তবে এর কারণটা আমি তোমাকে দুএকটা প্রশ্ন করে জানতে চাই। সিগারেটে বড় একটা টান দিলেন ডাক্তার, একমুখ ধোয়া ছেড়ে বললেন, বাচ্চাটা কি ওয়ান্টেড চাইল্ড, ডেভিড?
একথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?
জানাটা খুব জরুরি।
অবশ্যই সে ওয়ান্টেড চাইল্ড, আমরা একসঙ্গে এ নিয়ে প্ল্যান করেছি। অ্যালিস তখন কত খুশি–
হুমম–সমস্যাটা তো হয়েছে ওখানেই। যদি বাচ্চাটা আনপ্ল্যানড হত তাহলে ব্যাপারটাকে সাধারণ কেস বলে ধরে নিতাম। অপ্রত্যাশিত শিশুকে বেশিরভাগ মা-ই ঘৃণা করে। কিন্তু অ্যালিসের ক্ষেত্রে এটা ঠিক মিলছে না।
ডা. জেফারস সিগারেটটা ঠোঁট থেকে আঙুলের ফাঁকে ধরলেন, অন্য হাত দিয়ে চোয়াল ঘষতে ঘষতে বললেন, তাহলে ব্যাপারটা অন্য কিছু হবে। হয়তো শৈশবের কোনো ভীতিকর স্মৃতি ওর তখন মনে পড়েছে। কিংবা আর সব মায়ের মতোই সন্তান জন্ম দেবার সময় মৃত্যুভয় ওকে কাবু করে ফেলেছিল। যদি এরকম কিছু হয় দিন কয়েকের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে, ডেভিড, একটা কথা–অ্যালিস যদি তোমাকে বাচ্চাটার ব্যাপারে কিছু বলে… মানে… ইয়ে, সে চেয়েছিল বাচ্চাটা মৃত জন্ম নিক, তাহলে কিন্তু শকড হয়ো না। আশা করছি সব ঠিক থাকবে। আর যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তাহলে ওদেরকে নিয়ে এই ব্যাচেলর বুড়ো ডাক্তারের চেম্বারে চলে এসো, কেমন? তোমাদেরকে এমনিতেও দেখতে পেলে খুবই খুশি হব।
ঠিক আছে, ড. জেফারস। অ্যালিস একটু সুস্থ হলেই সপরিবারে আপনার বাসায় আবার যাব।
চমৎকার একটি দিন। মৃদু গুঞ্জন তুলে টয়োটা স্কারলেট ছুটে চলেছে বুলেভার্ডের দিকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল ডেভিড। আহা, কি সুন্দর নীল আকাশটার রঙ! কাঁচ নামিয়ে দিল ও। রাস্তার পাশের একটা ফুলের দোকান থেকে সুবাস ঝাঁপটা মারল নাকে। প্রাণভরে গন্ধটা টানল ডেভিড। সিগারেটের আনকোরা প্যাকেটটার সেলোফেন ছিঁড়ে একটা সিগারেট জল ঠোঁটে। টুকটাক কথা বলছে অ্যালিসের সঙ্গে। অ্যালিস হালকাভাবে জবাব দিচ্ছে। বাচ্চাটা ওর কোলে। ডেভিড খেয়াল করল আলগোছে ধরে আছে। সে ছোট্ট মানুষটাকে। মাতৃসুলভ কোনো উষ্ণতা প্রকাশ পাচ্ছে না অ্যালিসের আচরণে। যেন কোলে শুয়ে আছে চীনে মাটির একটা পুতুল। ব্যাপারটা দেখেও না দেখার ভান করল ডেভিড।
আচ্ছা! শিস দিয়ে উঠল ও। বাচ্চার নাম কী রাখব আমরা?
অ্যালিস বাইরের সবুজ গাছগাছালি দেখতে দেখতে উদাসীন গলায় বলল, এখনও ঠিক করিনি। তবে একদম আলাদা কোনো নাম রাখতে চাই আমি। এখনই এ নিয়ে গবেষণায় বসতে হবে না। আর দয়া করে বাচ্চার মুখে সিগারেটের ধোয়া ছেড়ো না তো। বলল বটে, কিন্তু এ যেন নিছক বলার জন্যই বলা।
অ্যালিসের গা ছাড়া ভাব আহত করল ডেভিডকে। সিগারেটটা ফেলে দিল জানালা দিয়ে। দুঃখিত, বলল ও।
বাচ্চাটা চুপচাপ শুয়ে আছে তার মায়ের কোলে। দ্রুত অপসৃয়মান গাছের ছায়ারা খেলা করছে তার মুখে। কালো চোখ দুটো খোলা। ছোট্ট, গোলাপী, রবারের মতো মুখ হাঁ করে ভেজা শ্বাস ফেলছে।
অ্যালিস এক পলক তাকাল তার বাচ্চার দিকে। শিউরে উঠল।
ঠান্ডা লাগছে? জানতে চাইল ডেভিড।
অল্প। কাঁচটা তুলে দাও। ঠান্ডা গলায় বলল অ্যালিস।
ডেভিড ধীরে জানালার কাঁচ ওঠাল।
দুপুর বেলা।
ডেভিড বাচ্চাটাকে নার্সারী রুম থেকে নিয়ে এসেছে, উঁচু একটা চেয়ারের চারপাশে অনেকগুলো বালিশ রেখে তার মধ্যে শোয়াল ওকে।
অ্যালিস খাবার দিতে দিতে বলল, ওকে অত উঁচু চেয়ারে শুইয়ো না। পড়ে টরে যাবে।
আরে না, পড়বে না। দেখো এখানে ও দিব্যি আরামে ঘুমাবে। হাসছে ডেভিড। খুব ভাল লাগছে ওর। দেখো, দেখো, ওর মুখ দিয়ে লালা পড়ে কেমন চিবুক ভিজিয়ে দিয়েছে! তোয়ালে দিয়ে বাচ্চার মুখ মুছে দিল ডেভিড। চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করল এদিকে তাকিয়ে নেই অ্যালিস।
