দ্রুত গড়ান দিয়ে মেঝেতে নামল অ্যান, আর তখন সান্ডারফোর্ড ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর, নখ বসে গেল কাঁধে। তীব্র ব্যথাটা যেন ফুসফুসে শক্তি যোগাল অ্যানের, মুখ হাঁ করল ও, গলার গভীর থেকে বেরিয়ে এল চিৎকার। সান্ডারফোর্ডকে দুহাতে ধরল ও, ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। ওর কব্জি চেপে ধরল শুকনো, খটখটে একটা হাত। করে ঘুরল অ্যান। ভৌতিক বুড়ি, দাঁতহীন মাড়ি বেরিয়ে পড়েছে, ভয়ানক লাগছে দেখতে। ঠিক যেন একটা ডাইনি।
ওদিকে বন্ধ দরজায় ক্রমাগত দমাদম করাঘাত পড়ছে। অ্যানের মার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল, কী হয়েছে, অ্যান? দরজা বন্ধ করে রেখেছ কেন… অ্যান?
ডাইনি বুড়ির কী শক্তি! অ্যানকে হাত মুচড়ে জানালার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অ্যান আবার চিৎকার দিল। বুড়ির গলা সাপের মতো হিসহিস করে উঠল কানের পাশে, তোকে আসতেই হবে… আজ থেকে তুই আমার এলিসিয়া… আমার …
হ্যাঁচকা টানে অ্যান ছিটকে পড়ল জানালার ওপর, খট করে খুলে গেল জানালা। টের পেল ওকে জানালা দিয়ে টেনে বের করার চেষ্টা করছে বুড়ি। জানালার ফ্রেম ধরে ফেলল অ্যান, প্রাণপণে ঝুলে রইল…
এমন সময় ভেঙে পড়ল বেডরুমের দরজা, জ্বলে উঠল আলো। জানালার ফ্রেম ছেড়ে দিল অ্যান, পড়ে গেল মেঝেতে। ওর বাবা-মা ছুটে গেলেন ওর দিকে।
এরপরের ঘটনাগুলো যেন ঘোরের মধ্যে ঘটতে লাগল। কাঁদছে অ্যান, ওর মা কাঁধে সান্ডারফোর্ডের নখের আঁচড় পরিষ্কার করে দিচ্ছেন, ব্যান্ডেজ করছেন, ফোঁপাতে ফোঁপাতে অ্যান বলছে, না, স্যান্ডিকে মেরো না। ওর কোনো দোষ নেই। সান্ডারফোর্ড ভয়ের চোটে আলমারির আড়ালে পালিয়েছে।
অনেক সময় লাগল অ্যানের ধাতস্থ হতে। তারপর বলল, সবকিছুর নষ্টের গোড়া চিলেকোঠার রকিং চেয়ারটা…ওটা পুড়িয়ে ফেল… তারপর সে বাবা-মাকে সমস্ত ঘটনা বলল।
বাবা চিলেকোঠা থেকে আরাম কেদারাটা নিয়ে এলেন। কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলেন। দাউ দাউ জ্বলে উঠল আগুন। সে দৃশ্য অ্যান দেখল স্থির চোখে, তার পায়ের নিচে বসে থাকল সান্ডারফোর্ড।
সে-ও দেখল শতাব্দী প্রাচীন আরাম কেদারাটাকে গ্রাস করছে আগুনের লেলিহান শিখা, পুড়ে যাচ্ছে ওটা।
–লুইজি ফ্রাঙ্কি
ঘাতক
খুন হয়ে যাচ্ছে, এই ভয়টা যেদিন থেকে পেয়ে বসল ওকে, সাহস করে কথাটা কাউকে বলতে পারেনি। আশঙ্কাটা একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল গত কয়েকমাস ধরে, ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছিল সন্দেহ, ছোট্ট কয়েকটা ঘটনা সেটাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। গভীর এবং তীব্র এক স্রোতের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে সে এই মুহূর্তে, নিচের দিকে প্রচন্ড জোরে কে যেন টানছে ওকে, কালো এবং বিশাল এক গহ্বরে ঢুকে যাচ্ছে। অষ্ট, টেনিস বল সাইজের ড্যাবডেবে চোখওয়ালা বিকট চেহারার কী ওটা? গোল গোল, চাকা চাকা দাগ খুঁড়গুলোর, এক সঙ্গে প্রসারিত হলো সবকটা; একটা ঝিলিক দেখল সে শুধু, পরক্ষণে টের পেল হিলহিলে গুঁড়গুলো তাকে বেঁধে ফেলেছে ঠান্ডা, কঠিন নিষ্পেষণে। মুখ হাঁ হয়ে গেল তার, চিৎকার করতে যাচ্ছে গলা ফাটিয়ে…
ঘরটাকে তার মনে হলো বিশাল এক সমুদ্র, ভেসে আছে সে। কিন্তু চারপাশে ওরা কারা? সাদা মুখোশ পরা, হাতে ধারাল যন্ত্রপাতি, কথা বলছে নিচু স্বরেকে আমি, ভাবার চেষ্টা করল সে; কী নাম আমার?
অ্যালিস লিবার। বিদ্যুৎ চমকের মতো নিজের নামটা মনে পড়ল তার । ডেভিড লিবারের স্ত্রী। কিন্তু তারপরও অস্বস্তি বোধটা দূর হলো না। নিজেকে ভীষণ একা এবং অসহায় মনে হচ্ছে মুখোশধারী লোকগুলোর মাঝে। প্রচন্ড ব্যথা তার শরীরে, বমি উগরে আসতে চাইছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে মৃত্যুভয়।
আমি ওঁদের চোখের সামনে খুন হয়ে যাচ্ছি, ভাবল অ্যালিস। ডাক্তার কিংবা নার্সরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারছেন না আমার শরীরে কী ভয়ঙ্কর একটা জিনিস ঘাপটি মেরে আছে। জানে না ডেভিডও। শুধু আমি জানি। আর জানে ওই খুনিটা–খুদে গুপ্তঘাতক।
মারা যাচ্ছি আমি। কিন্তু কাউকে কথাটা বলতে পারছি না। আমার সন্দেহের কথা শুনলে ওঁরা হাসবেন, বিদ্রূপ করে বলবেন–প্রলাপ বকছি। আমি। কিন্তু খুনিটাকে ওঁরা ঠিকই কোলে তুলে নেবেন, ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করবেন না আমার মৃত্যুর জন্য ওটাই দায়ী। শুধু সবাই শোক প্রকাশ করবে আর আমার খুনীর জন্য সবার দরদ উথলে পড়বে।
ডেভিড কোথায়? অবাক হলো অ্যালিস। নিশ্চয়ই ওয়েটিং রুমে। একটার পর একটা সিগারেট ফুকছে আর ঘড়ির দিকে একঠায় তাকিয়ে অপেক্ষা করছে কখন শুনবে সংবাদটা। অ্যালিসের শরীর হঠাৎ ঘেমে গোসল হয়ে গেল, প্রচন্ড ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল ও। এবার! আসছে। ওটা! আমাকে খুন করতে আসছে! চিৎকার শুরু করল সে। কিন্তু আমি মরব না। কিছুতেই মরব না!
বিশাল এক শূন্যতা গ্রাস করল অ্যালিসকে। খালি খালি লাগল পেট। ব্যথাটা হঠাই চলে গেছে। প্রচন্ড ক্লান্ত লাগল নিজেকে। অন্ধকারের একটা পর্দা দ্রুত নেমে আসছে চোখের ওপর। হে ঈশ্বর, আঁধারের রাজ্যে হারিয়ে যেতে যেতে ভাবল অ্যালিস, শেষ পর্যন্ত ঘটেছে তাহলে ব্যাপারটা…
পায়ের শব্দ শুনতে পেল অ্যালিস। আস্তে আস্তে কে যেন হেঁটে আসছে।
দূরে, একটা কণ্ঠ বলে উঠল, ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। ওকে এখন ডিস্টার্ব কোরো না।
পরিচিত শেভিং লোশনের সুঘ্রাণ স্বর্গের শান্তি বইয়ে দিল অ্যালিসের . শরীরে। ডেভিড । ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর কণ্ঠটা ডা. জেফারসের।
