ব্যাপারটির পরিসমাপ্তি ঘটল ওখানেই। ছবির কথা অ্যান ভুলে গেল বেমালুম। তবে, পরদিন বিকেলে সে নিজের ঘরে ঢুকছে, কে যেন দূর থেকে ডাক দিল। এলিসিয়া-আ! ঘুরল অ্যান, ওর ঘর থেকে চিলেকোঠার ঘরটা পরিষ্কার দেখা যায়। দরজা বন্ধ করে এসেছিল অ্যান। কিন্তু এখন ওটা হাট করে খোলা।
বুকের ভেতর যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল অ্যানের। আমি কিছু শুনিনি, নিজেকে প্রবোধ দিল ও। সব আমার কল্পনা। আমি যাব না। আমি আর চিলেকোঠার ঘরে যাব না।
এলিসিয়া-আ-আ! দূরাগত ডাকটি মৃদু, তবে নরম এবং পরিষ্কার।
যাব না আমি, নিজেকে বোঝাল অ্যান, ও ঘরে কেউ নেই। কারও অস্তিত্ব নেই। আমি স্রেফ কল্পনায় বুড়িকে দেখেছি। অ্যান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল, চিলেকোঠার দরজা আবার বন্ধ করে দিল। তারপর চলে এল নিজের ঘরে।
অ্যান জানত না এজন্য ওকে কী দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
.
গভীর ঘুমের স্তর থেকে অস্বস্তি নিয়ে জেগে গেল এলিজাবেথ অ্যান, দেখল তার পায়ের কাছে বসা সান্ডারফোর্ড, আঁধারে চোখ জ্বলছে। আর তার পেছনে নীল গাউন পরা চিলেকোঠার সেই বুড়ি। তবে হাসছেন না তিনি, শ্বাপদের মতো জ্বলছে চোখ।
তোমাকে আমি ডেকেছিলাম, বললেন তিনি কঠিন গলায়। তুমি আসনি। তুমি ভীষণ বেয়াদব। আমরা সারাটা বিকেল তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। আসনি কেন?
মহিলার গলার স্বর ভয় পাইয়ে দিল অ্যাকে। গায়ের কথাটা চিবুক পর্যন্ত টেনে নিল। আমতা আমতা করে বলল, আপনি মানে…।
মানে মানে করতে হবে না, হিসিয়ে উঠলেন বৃদ্ধা। যখনই ডাকব, চলে আসবে তুমি…
ভয়ে চোখে জল এসে গেল অ্যানের। মাকে ডাকার জন্য হাঁ করল, কিন্তু গলা থেকে আওয়াজই বেরুল না।
হঠাৎ মহিলার চেহারা বদলে গেল, মিষ্টি এবং বিমর্ষ লাগল তাঁকে। এলিসিয়া, আমার সোনা… আমি তোকে ভয় দেখাতে চাইনি রে, সোনা। তোর অভাব খুব অনুভব করছি আমি। অবশেষে তোর দেখা পেয়েছি। কথা দে, প্রতিদিন তুই আমার কাছে আসবি।
নিজের জায়গায় ফিরে যান, ফুঁপিয়ে উঠল অ্যান, আপনার ঘরে যান, প্লিজ…
যাব রে, মা। যাচ্ছি তো, শিরা ওঠা হাত বাড়িয়ে অ্যানের গাল ছুঁলেন তিনি আদর করে। শুধু আমাকে কথা দে, কাল আমার ওখানে আসবি। কথা বলবি এই নিঃসঙ্গ, অসহায় বুড়ির সাথে।
আচ্ছা, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল অ্যান।
সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে গেল মহিলা, আর সান্ডারফোর্ড চোখ বুজে পায়ের কাছে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গত রাতের কথা কিছুই মনে থাকল না অ্যানের। বাথরুমে ঢুকল মুখ হাত ধুতে। আয়নার দিকে তাকাল এবং চমকে উঠল।
ডানদিকের গালে লালচে তিলের মতো একটা দাগ। আঙুল দিয়ে ওখানে ঘষল অ্যান। উঠল না দাগটা। হঠাৎ গত রাতের কথা মনে পড়ে গেল। মহিলা ডান গালে হাত ছুঁইয়েছিল। কিন্তু … কিন্তু ওটা তো স্বপ্ন ছিল, তাই না? আসলে মশা কামড় দিয়েছে, তাই ফর্সা গালে লালচে দাগ ফুটে আছে। নিজের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে নাস্তার টেবিলে গেল অ্যান।
ওর মা মেয়ের গাল পরীক্ষা করে বললেন, মশা কামড়েছে। তোমার ঘরে অ্যারোসল স্প্রে করে দিচ্ছি। আর মশা ঢুকতে পারবে না।
তবে কাল রাতের স্বপ্নটা নিয়ে সারাটা দিন বিব্রত থাকল অ্যান। ঘুমাবার সময় যত এগিয়ে এল, অস্বস্তিটা বেড়ে চলল। একবার ভাবল মাকে বলবে ঘটনাটা। উঁহু, মা শুনলে এমন ঠাট্টা শুরু করে দেবেন, রীতিমতো লজ্জায় পড়ে যাবে অ্যান। বলবেন হরর গল্প পড়ে হরর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সে। থাক্, মাকে বলতে হবে না।
ঘুমাবার সময়, জীবনে এই প্রথম খাটের তলা, আলমারি ইত্যাদি দেখে নিল ও। তারপর দরজায় খিল দিল। টেনেটুনে দেখল ঠিকঠাক বন্ধ হয়েছে কিনা।
বিছানায় উঠে পড়ল অ্যান, হাত বাড়িয়ে বাতির সুইচ অফ করল।
আজ রাতে আমি ঘুমাব না, মনে মনে বলল অ্যান। তাই করল সে। এক ঘণ্টা আঁধারে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঘুমে চোখ বুজে আসছে, ঠিক তখন ঘটনাটা ঘটল। বাম পায়ে কীসের শক্ত পুঁতো খেয়ে লাফিয়ে উঠল অ্যান। ধড়মড় করে উঠে বসল।
বিছানার কিনারায় বসে আছেন সেই বৃদ্ধা। হাসছেন। চাঁদের আলোয় ঘরের ভিতরটা বেশ পরিষ্কার। মহিলার চোখ জ্বলছে সান্ডারফোর্ডর মতো, শক্ত করে ধরে আছেন অ্যানের পায়ের গোড়ালি।
সান্ডারফোর্ড তাঁর পাশেই, ভয়ানক লাগছে ওকে। শরীরটা ফুলে যেন দ্বিগুণ হয়েছে। হাঁ করা মুখ, ধবধবে সাদা দাঁত বের হয়ে আছে।
অ্যান শুনল মহিলা বলছেন ফিসফিস করে…এবার আমার সময়… এলিসিয়া…তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ…বলেছিলে আসবে… আসনি… আমাকে তাই আসতে হয়েছে…আমি তোমাকে আজ নিয়ে যাব আমার সাথে…
ধস্তাধস্তি করল অ্যান, কিন্তু বুড়ির গায়ে কী শক্তি, অবলীলায় ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন বিছানার প্রান্তে। আমি তোমাকে শিক্ষা দেব… তোমার কত বড় সাহস. . .কথা দিয়ে কথা রাখ না…
অ্যান গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে গোঙানি ছাড়া কিছুই বেরুল না। প্রাণপণ চেষ্টা করছে বুড়ির বজ্রমুষ্ঠি থেকে পা ছুটিয়ে নেয়ার।
আমরা এবার চলে যাব … আমরা তিনজন… সারাজীবনের জন্য… আমার এলিসিয়া…
হাত বাড়াল অ্যান কিছু একটা আঁকড়ে ধরার জন্য। কিন্তু হাতে কিছুই বাঁধল না, ওকে বুড়ি ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে চলেছেন…
এবার তিনি অ্যানের চুল ধরলেন মুঠো করে। ব্যথায় গায়ে আগুন ধরে গেল ওর। প্রাণপণ শক্তিতে বুড়ির বুকে দুহাত দিয়ে রাম ধাক্কা মারল অ্যান। ফুসফুস থেকে সমস্ত দম বেরিয়ে যাবার মতো হিস শব্দ শুনল ও। বন্ধন মুক্ত হয়ে গেল অ্যান।
