বৃদ্ধা ঠিকই বলেছেন আজ এলিজাবেথ অ্যানের এগারোতম জন্মদিন।
কিন্তু ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, এলিসিয়া, সোনা, বললেন তিনি। উঠে এসো। ঘরে এসো। তোমার সাথে কথা বলার জন্য কতদিন ধরে মুখিয়ে আছি আমি।
চিলেকোঠার ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না অ্যানের, ভয় লাগছে। মহিলার আচরণে কেমন অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার আছে। অ্যান ভাবল, মাকে এ মহিলার কথা জানাবে।
এসো! গোঁ ধরে রইলেন বৃদ্ধা। তোমাকে আমার এলিসিয়ার ছবি দেখাব। দেখবে এলিসিয়ার সাথে তোমার কত মিল।
ধন্যবাদ। কিন্তু ছবি দেখতে ইচ্ছে করছে না, বলল অ্যান।
আমি যাই, হঠাৎ মনে পড়ল কেন এখানে এসেছে সে। স্যন্ডি, এসো, ডাকল বটে, কিন্তু বেড়ালটা একটুও নড়ল না। আগের মতো বৃদ্ধার কোলে মুখ গুঁজে বসে রইল। মহিলা তার গাউনের নীল পকেটে গুঁজে রাখা ছোট একটা ছবি বের করে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন অ্যানকে।
এসো, এলিসিয়া। ছবি দেখ। তারপর সান্ডারফোর্ডকে যেতে দেব। এমনভাবে কথাটা বললেন যেন সান্ডারফোর্ডের যাওয়া না যাওয়া তার উপর নির্ভর করছে। সান্ডারফোর্ডকে ধরে রাখার তাঁর কী অধিকার আছে?
না, এলিজাবেথ অ্যান উপরে যাবে না। সে সিঁড়ির চার নম্বর ধাপে উঠল। এখান থেকে গলা বাড়িয়ে ছবিটা দেখা যাবে, তারপর সান্ডারফোর্ডকে নিয়ে নেমে যাবে নিচে। সে আরেক ধাপ সিঁড়ি উঠল।
হ্যাঁ, এসো সোনা। এসো।
ছবি না দেখলে অদ্ভুত মহিলা সান্ডারফোর্ডকে ছাড়বেন না বুঝতে পারল সময় বয়ে গেল এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া। ছবিটি মহিলার হাত থেকে যেন পিছলে গেল, পাখা মেলল শূন্যে। তারপর ল্যান্ড করল ধুলোভরা মেঝেয়।
অ্যান ঝুঁকল মেঝের উপর থেকে ছবিটি কুড়িয়ে নিতে, ঠিক তখন চেয়ার থেকে লাফিয়ে নামল সান্ডারফোর্ড, সিঁড়ির দিকে ছুটল।
ছবিটি হাতে নিয়ে সিধে হলো অ্যান। তাকাল শতাব্দী প্রাচীন রকিং চেয়ারটার দিকে। চেয়ার খালি। হঠাৎ করেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন বৃদ্ধা।
খোলা দরজাটা বন্ধ করে দিল অ্যান। অদ্ভুত, ভাবল ও, গোটা ব্যাপারটা আসলে অদ্ভুত একটা কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। নিজেকে প্রবোধ দিল ও। চিলেকোঠার ঘর নিয়ে নানা কথা ভেবেছি আমি তাই কল্পনায় ওই বুড়ি মহিলাকে দেখেছি।
কিন্তু পুরোটাই যদি কল্পনা হয়ে থাকে তাহলে এ ছবি এল কোত্থেকে!!
ছবিটি সাদা কালো, হলদেটে রঙ ধরেছে। ছোট একটি মেয়ের ফটোগ্রাফ। অবিকল এলিজাবেথ অ্যানের মতো দেখতে।
ছবিটা উল্টে দেখল অ্যান, পেছনে লেখা এলিসিয়া ফ্রস্ট, বয়স এগারো।
ছবি নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল অ্যান, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের উপর রেখে দিল।
আজ অ্যানের জন্মদিন। বাবা অবশ্য কাউকে দাওয়াত দেননি। শুধু বিশাল একটি কেক এনেছেন আর মা তার মেয়ের পছন্দের পায়েল্লা আর পুডিং বেঁধেছেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষে, বাবা ড্রইংরুমে বসে পাইপ কুঁকছেন, রান্নাঘরে মাকে বাসন ধোয়ার কাজে সাহায্য করছে অ্যান।
ন্যাকড়া দিয়ে একটা প্লেট মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল অ্যান, এলিসিয়া কে, মা?
ওর মা মাংসের বাটি ধুতে ব্যস্ত, মেয়ের প্রশ্ন তেমন খেয়াল করলেন না, হালকা গলায় বললেন, জানি না মা। কে সে?
আমিও জানি না, জবাব দিল অ্যান। তবে এ নামে কেউ বোধহয় ছিল। ওই মেয়েটার একটা ছবি পেয়েছি আমি চিলেকোঠার ঘরে …
মা ঝট করে ঘুরলেন মেয়ের দিকে। তোমাকে না ওখানে যেতে মানা করেছি?
যেতে চাইনি তো, মিনমিন করে বলল অ্যান। স্যান্ডিটা দৌড়ে গেল। আমাকেও তাই…
ঠিক আছে। আর যাবে না। হ্যাঁ, কী বলছিলে যেন?
বলছিলাম এলিসিয়া ফ্রস্ট, বয়স এগারো। মেয়েটার চেহারা অবিকল আমার মতো। বয়সও মিলে যায়।
এলিসিয়া ফ্রস্ট? মা এক মিনিট কী যেন ভাবলেন, চিলেকোঠার ঘরে? হুম…ওখানে অবশ্য অনেক পুরানো জিনিসপত্র আছে। তবে কোনো ছবি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।… ফ্রস্ট…দাঁড়াও! দাঁড়াও! মনে পড়েছে…ওটা তোমার গ্রেট-গ্রান্ডমাদারের নাম। এলিসিয়া ফ্রস্ট ছিলেন তোমার গ্রেট- গ্রান্ডমাদারের বোন। ছোট বেলায় মারা গেছেন তিনি।
অ্যান আরেকটা প্লেট মুছতে লাগল।
কিন্তু … বলে চললেন মা, ওনার কোনো ছবি দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। কোথায় পেলে, ট্রাঙ্কে?
মেঝেতে কুড়িয়ে পেয়েছি, বলল অ্যান।
কোথায় ছবিটা?
আমার ঘরে।
প্লেট মোছা হলে অ্যান ছবিটা দেখাল মাকে। মনে মনে আফসোস হচ্ছে এখন ওই বৃদ্ধার কথাও বলতে হবে। যদিও অ্যান মনে প্রাণে বিশ্বাস করে স্রেফ কল্পনায় সে বুড়িকে দেখেছে।
হ্যাঁ, বললেন মা। তোমার গ্রেট-গ্রান্ডমাদারের বোনই বটে। ওই সময়ে তোলা ছবি। এ ছবিটি তোলার পরেই নিশ্চয় তিনি মারা যান। লোকে বলে মেয়েটির মৃত্যুর পর তার মা মানে তোমার গ্রেট–গ্রেট গ্রান্ডমাদার, এলিজাবেথ অ্যান-পাগল হয়ে যান। বছরের পর বছর এ বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি আর শুধু এলিসিয়া নাম ধরে ডেকেছেন।
চিলেকোঠায় একটা রকিং চেয়ার দেখলাম–ওটা বোধহয় আমার গ্রেট-গ্রেট গ্রান্ডমাদারের, তাই না? জিজ্ঞেস করে অ্যান।
হ্যাঁ। ওটা আমি বিয়ের পর থেকে ওখানে দেখে আসছি।
আমার চেহারা কি এলিসিয়ার মতো?
অনেকটা তো বটেই, জবাব দিলেন মা। চোখে চশমা পরে খুঁটিয়ে দেখলেন ছবিটি। তারপর মেয়েকে ওটা ফেরত দিয়ে বললেন, ভুল বললাম। অনেকটা নয়, পুরোটাই। আদর করে মেয়ের রেশম কালো চুল নেড়ে দিলেন। তোমরা দুজনেই খুব সুন্দরী।
