চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ ফ্যাকাসে। চাপা মানসিক উত্তেজনায় তিনি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন, ওহ্ গড! এ কী ভয়ঙ্কর রহস্য! এ সবের অর্থ কী?
অর্থটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, আমার বন্ধু জোনাথন জেলফ বলল, এর অর্থ হলো একটা খুন। হ্যাঁ, আমার ধারণা মি, ডুয়েরিং হাউসকে খুন করা হয়েছে।
না! না! না! মার খাওয়া কুকুরের মতো রাইকস আর্তনাদ করে উঠল। না, না, খুন নয়…খুন নয়। কোনো জুরী একে খুন বলবে না। ভেবেছিলাম আমি তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলেছি। তার বেশি আমি কিছু করতে চাইনি। খুন? নরহত্যা? না, না, আমি তা করতে চাইনি… করতে চাইনি।
দারুণ আতঙ্কে এবং উত্তেজনায় রাইকসের কণ্ঠ থরথর করে কাঁপতে লাগল।
ঘটনাটা প্রকাশিত হয়ে গেল অপ্রত্যাশিতভাবে। দারুণ আতংকে দুহাতে মুখ ঢেকে চেয়ারম্যান কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তিনি ভাবতেও পারেননি যে মি. ডুয়েরিং হাউসকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে।
মিনিট তিন-চার পরে তিনি বললেন, হতভাগা নিজেই নিজেকে ধরিয়ে দিল! মি. রাইকস আপনি যে অপরাধ করেছেন তার শাস্তি জানেন?
স্যার, আপনি সব কথা স্বীকার করার আদেশ করলেন তাই স্বীকার করলাম। আপনার নির্দেশ মতোই আমি বোর্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছি, ভাঙা গলায় বলল রাইকস।
আপনি এমন একটা অপরাধ সম্পর্কে স্বীকারোক্তি করছেন, যা আপনার দ্বারা করা সম্ভব বলে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি, চেয়ারম্যান বললেন, এ অপরাধের শাস্তি দেয়া বা এ অপরাধের ক্ষমা করার ক্ষমতা এই বোর্ডের নেই। আপনাকে কেবল এটুকু উপদেশ দিতে পারি যে আপনি আইনের কাছে সারেন্ডার করুন। কোনো কথা গোপন না করে নিজের অপরাধ স্বীকার করুন। এবার বলুন কবে এ অপকর্মটা করেছিলেন?
অপরাধী উঠল ধীরে ধীরে। থরথর করে কাঁপছে। টেবিলে ভর দিয়ে নিজেকে সামলে নিল একটু। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বপ্নের ঘোরে বলল, বাইশে সেপ্টেম্বর।
বাইশে সেপ্টেম্বর! আমি জোনাথনের দিকে তাকালাম, সেও চমকে তাকাল আমার দিকে। আমার মনে একই সঙ্গে বিস্ময় এবং আতঙ্ক।
জোনাথনের মুখখানা মরার মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল থরথর করে। ফিসফিসিয়ে কাঁপা গলায় বলল ও, তাহলে.. তাহলে সেদিন ট্রেনে তুমি কাকে দেখেছিলে!
এলিসিয়া
সান্ডারফোর্ডের চোখের রঙ ওর গায়ের মতোই–হলুদ। এলিজাবেথ অ্যানকে কঠোরভাবে বলা আছে সান্ডারফোর্ড কিংবা সে যেন কখনোই চিলেকোঠার ঘরে না যায়।
এলিজাবেথ অ্যান বাবা-মার সাথে এই প্রথম ওদের গ্রামের বাড়িতে এসেছে। ওরা থাকে আমেরিকার বোস্টনে।
গ্রামের বিশাল বাড়িটি ওদের কেয়ারটেকার দেখাশোনা করে। সে-ই। আসলে বলেছে চিলেকোঠার ঘরে যেন অ্যান জীবনেও না যায়।
কেন, প্রশ্ন করেছিল অ্যান। জবাবে রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে চুপ করে থেকেছে কেয়ারটেকার।
মা মেয়েকে নিষেধ করে দিয়েছেন চিলেকোঠার ঘরে না ঢুকতে। ব্যাখ্যা দিয়েছেন শতাব্দী প্রাচীন অন্ধকার ও ঘর চামচিকা আর ধুলো-ময়লায় বোঝাই। ভয় পেতে পারে অ্যান। অসুখ বাধিয়ে বসাও বিচিত্র নয়।
চিলেকোঠার ঘর দেখার প্রচুর আগ্রহ এলিজাবেথ অ্যানের। তবে বাবা মার খুবই বাধ্য মেয়ে সে। ওঁরা কিছু নিষেধ করলে সে কাজ জীবনেও করবে না অ্যান।
কিন্তু আজ নেহায়েত ঠেকায় পড়ে চিলেকোঠার ঘরে আসতে হয়েছে। অ্যানকে। সান্ডারফোর্ডের কারণে।
সান্ডারফোর্ড ওরফে স্যান্ডি ভীষণ ছটফটে, দুষ্ট। কোথাও একদণ্ড স্থির থাকতে জানে না। ফুড়ুৎ করে অ্যানের কোল থেকে নেমে ছুটেছে চিলেকোঠার ঘরের দিকে। অ্যানকেও বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে পেছন পেছন। চিলেকোঠার ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়াল অ্যান। ব্যস্ত চোখ খুঁজছে সান্ডারফোর্ডকে। সিঁড়ির মাথায় কতগুলো বাক্সের মধ্যে হলদে লেজটাকে দেখতে পেল সে। সান্ডি, এদিকে আসো, নরম গলায় ডাকল অ্যান।
চিলেকোঠার ঘরের দরজায় তালা নেই। সামান্য ফাঁক হয়ে আছে কবাট। একটা হলুদ ঝিলিক দেখল অ্যান ফাঁকটার আড়ালে, অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল সান্ডারফোর্ড।
সান্ডারফোর্ড, চলে আয় বলছি, এবার গলা চড়ল অ্যানের। তোর ও ঘরে যাওয়া নিষেধ, জানিস না?
কোনো সাড়া নেই সান্ডারফোর্ডের।
এদিকে এসো, এলিসিয়া। সান্ডারফোর্ড আমার কাছে। মিষ্টি, নরম একটা কণ্ঠ ভেসে এল চিলেকোঠার ঘর থেকে। জমে গেল অ্যান। বড় বড় হয়ে গেল চোখ, ঘুরে তাকাল কণ্ঠের উৎসের দিকে।
একটা আরাম কেদারা। দেখলেই বোঝা যায় বহু পুরানো। ওতে বসে মৃদু দুলছেন এক বৃদ্ধা। তার মাথার চুল ধবধবে সাদা, চেহারা ভারী বিষণ্ণ। তাঁর কোলে সান্ডারফোর্ড, লেজ গুটিয়ে বসে আছে। দুজনেই তাকিয়ে আছে। অ্যানের দিকে। অতি প্রাচীন চেহারার বৃদ্ধার গায়ে নীল একটা গাউন।
এদিকে এসো, বৃদ্ধা আস্তে আস্তে হাত বোলাচ্ছেন সান্ডারফোর্ডের মাথায়। তোমার বেড়াল আমার কাছে। দেখতেই পাচ্ছ। ও আমার বন্ধু হয়ে গেছে, এলিসিয়া। হাসলেন তিনি। তবে তাঁর চোখ হাসছে না। আধো অন্ধকারে মনে হলো জ্বলছে চোখ জোড়া, চাউনিটাও কেমন কঠিন।
আমার নাম এলিসিয়া নয়, ঢোক গিলল অ্যান।
জানি, জানি সে কথা, সোনা, দ্রুত বলে উঠলেন তিনি। তবে তোমার চেহারা অবিকল এলিসিয়ার মতো। এত মিল তার সাথে তোমার যে তোমাকে এলিসিয়াই মনে হচ্ছে। তোমাকে এলিসিয়া ডাকলে তুমি কি খুব রাগ করবে? তোমাকে তো আমি এলিসিয়াই ভাবছি। তোমরা এ বাড়িতে আসার পর থেকে তোমাকে আমি দেখছি। তুমি যখন বাগানে খেলা করো তখন তোমাকে আমি দেখি। এ জানালা দিয়ে। ছোট একটা জানালার দিকে হাত তুলে দেখালেন বৃদ্ধা। এত স্বচ্ছ চামড়া, অ্যানের মনে হলো চামড়া ভেদ করে জানালার গরাদগুলোও দেখতে পাচ্ছে সে। আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছি তুমি আসবে। বিশেষ করে আজকের দিনটার জন্য। আজ যে তুমি এগারোতে পা দিয়েছ, সোনা, আবার হাসলেন তিনি মিষ্টি করে।
