চেয়ারম্যান কিছুক্ষণ নীরবে সিগারকেসটা পরীক্ষা করলেন তারপর সেটা দিলেন সেক্রেটারি মি. হান্টারের হাতে। সেক্রেটারি কেসটা কয়েকবার উল্টেপাল্টে দেখে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, না, এটা কেবল নিছক সাদৃশ্যের ব্যাপার নয়। এটা যে মি. ডুয়েরিং হাউসের সিগারকেস তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমি বহুবার দেখেছি এটা। কেসটার কথা আমার ভালোভাবেই মনে আছে।
আমিও বোধহয় একই কথা বলব। কিন্তু কীভাবে সিগারকেসটা মি. ল্যাংফোর্ডের হাতে এলো? এ প্রশ্নের উত্তর কী দেবেন? গম্ভীর গলায় চেয়ারম্যান সেক্রেটারিকে প্রশ্ন করলেন।
এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, সেক্রেটারি জবাব দিলেন।
উত্তরটা আমিই দিচ্ছি। অবশ্য আমি আগে যা বলেছি সে কথাই আবার বলছি। মি. ডুয়েরিং হাউস নেমে যাবার পর কামরার মেঝেতে আমি ওটা কুড়িয়ে পেয়েছি। তাকে দেখার জন্য আমি জানালা দিয়ে ঝুঁকেছিলাম তখন। আমি কেসটা পা দিয়ে মাড়িয়ে ফেলি। মি. ডুয়েরিং হাউসকে ওটা দেবার জন্য আমি প্লাটফরম দিয়ে ছুটছিলাম আর তখনই দেখি–বলতে পারেন আমার বিশ্বাস আমি দেখেছি যে তিনি গ্যাস লাইট পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে মি. রাইকসের সঙ্গে নিবিষ্টভাবে কথা বলছেন।
আমার বন্ধু আমার জামার হাতায় টান দিল।
দেখো, মি. রাইকসের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ, ও ফিসফিস করে বলল।
একটু আগে রাইকস যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে তাকালাম। তার মুখ মরার মতো ফ্যাকাসে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে, চোখের কোণে আতঙ্ক। চোরের মতো দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাইকস।
আমার মনে হঠাৎ একটা অদ্ভুত এবং অস্পষ্ট সন্দেহ জেগে উঠল। এক লাফে এগিয়ে গিয়ে আমি রাইকসের কাঁধ দুটো চেপে ধরলাম। তারপর ওর আতঙ্কে পাণ্ডুর মুখখানা ঘুরিয়ে দিলাম চেয়ারম্যান এবং বোর্ডের সদস্যদের দিকে।
তাকান ওর দিকে, একবার দেখুন ওর চেহারা। আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য এর থেকে ভালো সাক্ষ্য আর নেই, উত্তেজিতভাবে আমি বললাম।
চেয়ারম্যানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। আন্ডার সেক্রেটারির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি কঠোরভাবে বললেন, মি. রাইকস, যদি আপনি কিছু জানেন তবে তা খুলে বললেই ভালো হয়।
আমার হাত থেকে নিজেকে উদ্ধার করার জন্য রাইকস ধস্তাধস্তি করতে লাগল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। আমি ওকে সজোরে চেপে ধরেছি। আর আমার গায়ের জোরটাও কম নয়, দুর্বল রাইকস কী করে পারবে আমার সঙ্গে। হাঁপাতে হাঁপাতে ও অসংলগ্নভাবে বলতে লাগল, আমায় যেতে দিন। আমি জানি না… কিছু জানি না। আমাকে এভাবে আটকে রাখার কোনো অধিকার নেই আপনার… বেআইনি… এটা ঘোরতর বেআইনি… আমাকে ছেড়ে দিন.. যেতে দিন…।
গম্ভীর গলায় চেয়ারম্যান বললেন, মি. রাইকস, ঠিক করে বলুন ব্ল্যাকওয়াটার জংশনে মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল কিনা? আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা হয় সত্য না হয় মিথ্যা। যদি সত্য হয় তবে আপনি পরিচালক মণ্ডলির সভার কাছে সারেন্ডার করুন এবং যা জানেন কোনো কথা গোপন না করে তা স্বীকার করুন।
অসহায় আতঙ্কে –নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় রাইকস তার দুহাত মোচড়াতে লাগল। এবার সে ভেঙে পড়ার মুখে।
আমি ওখানে ছিলাম না, আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল রাইকস, আমি সে সময় দুশো মাইল দূরে ছিলাম! এ ব্যাপারে কিছু জানি না আমি…আমার স্বীকার করার মতো কিছু নেই। আমি নির্দোষ… ফর গডস শেক, আমি নির্দোষ!
দুশো মাইল দূরে! চেয়ারম্যান প্রতিধ্বনি করলেন, আপনার কথার অর্থ কী?
আমি… আমি ডেভনশায়ারে ছিলাম। তিন সপ্তাহের ছুটি নিয়েছিলাম আমি। মি. হান্টার জানেন সে কথা। বলুন স্যার, আমি সত্যি বলছি কিনা। গোটা ছুটিটাই আমি ডেভনশায়ারে কাটিয়েছি। আমি প্রমাণ করতে পারি, আমি সেখানে ছিলাম!
রাইকসকে ভীত এবং অসংলগ্নভাবে কথা বলতে দেখে বোর্ডের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গম্ভীরভাবে ফিসফিস করতে লাগলেন। একজন নিঃশব্দে উঠে গিয়ে বেয়ারাকে দরজায় পাহারা দেবার জন্য বলে এলেন।
আপনার ডেভনশায়ারে থাকার সঙ্গে এ ঘটনার কী সম্পর্ক? চেয়ারম্যান প্রশ্ন করলেন, আপনি কখন ডেভনশায়ারে ছিলেন?
মি. রাইকস ছুটি নিয়েছিলেন সেপ্টেম্বর মাসে আর সেই সময়েই মি. ডুয়েরিং হাউস নিখোঁজ হন, চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে সেক্রেটারি মি. হান্টার বললেন।
মি. ডুয়েরিং হাউস যে নিখোঁজ হয়েছেন এ কথা ছুটির পর অফিসে ফিরে আসার আগে আমি জানতে পারিনি, ভাঙা গলায় রাইকস বলল।
সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ, চেয়ারম্যান বললেন, আমি এক্ষুনি এ ব্যাপারটা পুলিশকে জানাব। আমি নিজেই ম্যাজিস্ট্রেটের পদমর্যাদাসম্পন্ন। কাজেই এ মামলা সম্পর্কে বিচার বিবেচনা করার আইনগত ক্ষমতা আমার আছে আর এ ধরনের মামলা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে আমি অভ্যস্ত। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি– কোন বাধা দেবেন না, কোনরকম গোপনীয়তার আশ্রয় না নিয়ে সব কথা অকপটে স্বীকার করুন। স্বীকারোক্তি হয়তো আপনার সহায়ক হবে হয়তো আপনার অপরাধের গুরুত্বটাও কিছু হ্রাস পাবে তাতে। এ কাজে কে বা কারা আপনার সঙ্গী ছিল?
আমার কোনো সঙ্গী ছিল না, নতজানু হয়ে আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল ভীত রাইকস, আমাকে দয়া করুন আমাকে বাঁচান। আমি সব কথা স্বীকার করব। আমি তাঁর কোনো ক্ষতি চাইনি। তাঁকে আঘাত করার ইচ্ছা আমার ছিল না। তার মাথার একগোছা চুলও আমি টানতে চাইনি। দয়া করুন… ছেড়ে দিন আমায়… আমাকে যেতে দিন… আমাকে যেতে দিন…।
