ছয়
মি. রাইকস এলেন। ভদ্রলোক বেঁটে, রোগা, মাথার চুল ধূসর, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রঙ ফর্সা, মুখে হালকা দাড়ি গোঁফ। লোকটি মিটিং রুমের দোরগোড়ায় আসতে না আসতেই সেক্রেটারি তাঁকে, যেদিন মি. ডুয়েরিং হাউস আমার সহযাত্রী ছিলেন বলে দাবি করেছি, সেই দিনকার ডে বুকটি নিয়ে আসবার জন্য বললেন।
মাথা ঝাঁকিয়ে মি. রাইকস চলে গেলেন।
মি. রাইকস বোধহয় মুহূর্তকাল দোরগোড়ায় ছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেখে আমি এমন চমকে উঠলাম যে কিছুক্ষণ কোন কথাই বলতে পারলাম না। তারপর বেয়ারা দরজা ভেজিয়ে দিতেই আমি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম।
ওই ভদ্রলোক… হ্যাঁ, ওই ভদ্রলোকই সেদিন ব্ল্যাক ওয়াটার জংশনের প্লাটফরমে মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে কথা বলছিলেন। উত্তেজিতভাবে আমি বললাম।
সবাই স্তম্ভিত।
আপনি বোধহয় ভুল করছেন, উনি হেড অফিসের একজন আন্ডার সেক্রেটারি, ওঁর তো ব্ল্যাক ওয়াটার জংশনে যাবার কথা নয়, সেক্রেটারি বললেন।
না, আমি মোটেই ভুল করিনি। আমি জোর দিয়ে বললাম। ওঁরা দুজনে একটি লাইটপোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আলো পড়ছিল ওদের গায়ে। দুজনকেই আমি স্পষ্ট দেখেছি। না না, আমি মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে এই ভদ্রলোককেই দেখেছিলাম।
চেয়ারম্যান একটু বিব্রতভাবেই বললেন।
মি. ল্যাংফোর্ড (আমার নাম), একটু ভেবেচিন্তে কথা বলবেন। আপনার কথার তাৎপর্যটা কি ঠিক বুঝতে পারছেন?
আমি নিজেকে যেমন চিনি, ওই ভদ্রলোককে ঠিক তেমনি নিশ্চিতভাবে চিনতে পারছি।
আপনার কথার ফলাফল কী হতে পারে তা কি ভেবে দেখেছেন? আপনি কিন্তু কোম্পানির একজন পদস্থ কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে মারাত্মক অভিযোগ আনছেন?
আমি শপথ করে বলতে পারি একটু আগে যে ভদ্রলোক দোরগোড়ায় এসেছিলন, তাকেই ব্ল্যাকওয়াটার জংশনের প্লাটফরমে মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি।
চেয়ারম্যান চেকার-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি সেদিন ট্রেনে মি. রাইকসকে দেখেছিলেন?
না, মি. রাইকস ট্রেনে ছিলেন না।
প্লাটফরমে? গার্ড সাহেবের দিকে তাকিয়ে চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেন।
ওঁকে প্লাটফরমে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।
মি. হান্টার, আপনার অফিসে কাজ করেন মি. রাইকস। তিনি কি এ মাসের চার তারিখে অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন?
মনে হয় না। তবে এই মুহূর্তে আমি সঠিকভাবে বলতে পারব না। কেন না ঐ সময়ে কয়েকদিন আমি বেশিক্ষণ হেড অফিসে থাকতে পারিনি, আমাকে বেরোতে হয়েছে নানা তদারকিতে। সেই সুযোগে মি. রাইকস অফিস কামাই করতেও পারেন। অবশ্য ডে বুকটা দেখলে সেটাও বোঝা যাবে।
আর ঠিক তখনই ডে বুক বগলে করে মিটিং রুমে ঢুকলেন মি. রাইকস।
বসুন।
মি. রাইকস বসবার পর চেয়ারম্যান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এই গার্ড সাহেব আর চেকার সাহেবকে চেনেন?
চিনি স্যার। ওঁরা আমাদের কোম্পানিতেই কাজ করেন।
অনুগ্রহ করে ডে বুকে এ মাসের চার তারিখের এন্ট্রিগুলো দেখুন। দেখুন ওঁদের দুজনের ডিউটি কোন গাড়িতে কতক্ষণ পর্যন্ত ছিল ।
এক্ষুনি দেখে দিচ্ছি, স্যার। মি. রাইকস ডে বুকটা খুললেন।
পরপর কয়েকটি পাতায় অভ্যস্ত চোখ বুলিয়ে একটি পাতার নিচে আঙুল রেখে মি. রাইকস বললেন, পেয়েছি, স্যার। ওঁদের দুজনেরই ডিউটি ছিল ভোর চারটে পনেরোর এক্সপ্রেস ট্রেনে। ট্রেন ইউস্টন থেকে ছেড়ে ক্রম্পটন স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিল।
চেয়ারম্যান সামনের দিকে ঝুঁকে পূর্ণ দৃষ্টিতে মি. রাইকসের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তীক্ষ্ণস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ঐদিন বিকেলবেলা আপনি কোথায় ছিলেন, মি. রাইকস?
আমি? আমি স্যার?
জ্বি, আপনি, রাইকস। এ মাসের চার তারিখে বিকেলে এবং সন্ধ্যায় আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি তো এখানেই ছিলাম, স্যার। মি. হান্টারের অফিসেই ছিলাম আমি। আর কোথায় থাকব?
মি. রাইকসের গলার স্বরে কাঁপুনি থাকলেও তাঁর চোখের দৃষ্টিতে যে অবাক ভাবটা ছিল তার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা ছিল না।
মি. রাইকস, গম্ভীরভাবে চেয়ারম্যান বললেন, আমাদের বিশ্বাস করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে গত চার তারিখে বিকেলে আপনি ছুটি না নিয়ে অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন, ঠিক?
না, স্যার, তা নয়। মোটেই তা নয়। আমি অফিসেই ছিলাম। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে আমি একদিনের জন্যও ছুটি নিইনি। আমার বস মি. হান্টার নিশ্চয়ই আমার বক্তব্যকে সমর্থন করবেন।
সেক্রেটারির দিকে প্রশ্নভরা চোখে তাকালেন চেয়ারম্যান।
মি. রাইকস বোধহয় ঠিক কথাই বলেছেন। চার তারিখে ওঁর ছুটি নেবার কোন কথা আমার জানা নেই। এ সম্পর্কে অফিসের কেরানিরা হয়তো সঠিক খবর দিতে পারবে। আমি হেডক্লার্ককে ডাকছি, স্যার।
ডাকুন।
সেক্রেটারি কলিং বেল টিপলেন। বেয়ারা ঘরে ঢুকলে তাকে বললেন, হেড ক্লার্ক সাহেবকে এখানে আসতে বলো।
একটু পরেই হেড ক্লার্ক এলেন। ভদ্রলোক মাঝ বয়সী, চোখে চশমা, মুখের ভাব গম্ভীর। তিনি ঘরে ঢুকতেই কোন ভণিতা না করে চেয়ারম্যান তাঁকে জেরা করতে শুরু করলেন।
আপনি গত চার তারিখে অফিসে এসেছিলেন?
জ্বি।
কতক্ষণ অফিসে ছিলেন?
কাজকর্ম সেরে বেরোতে প্রায় ছটা বেজে গিয়েছিল।
মি. রাইকস সেদিন অফিসে এসেছিলেন?
জ্বি।
বিকেলের দিকে তিনি অফিসে ছিলেন?
ছিলেন।
কী করে এ কথা বলছেন? তাঁকে বিকেলের দিকে দেখেছিলেন? দেখেছিলাম। কিছু কাগজপত্রে সই করবার জন্য আমাকে তার ঘরে যেতে হয়েছিল। আর তাছাড়া…
