বোর্ডের অন্য সদস্যরা উৎসুক হয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন, এবার তাঁদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ট্রেনে যার সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল তিনিই যে আসল মি. ডুয়েরিং হাউস তা কী করে বুঝলেন? অন্য কোন লোকও তো বিশেষ উদ্দেশ্যে নিজেকে মি. ডুয়েরিং হাউস বলে চালাতে পারেন।
তা পারেন, আমি স্বীকার করলাম, কিন্তু একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের কাছে ছদ্মপরিচয় দিয়ে কী লাভ? তাছাড়া এমন লোকের নামে পরিচয় দেয়া হলো তিনি একজন ফেরারি আসামী পুলিশ যাকে খুঁজছে।
আপনার সেদিনের সহযাত্রীর চেহারার বর্ণনা দিতে পারবেন? চেয়ারম্যান প্রশ্ন করলেন।
যতদূর মনে ছিল সহযাত্রীর চেহারা এবং ভাবভঙ্গির একটা বর্ণনা দিলাম।
চেয়ারম্যানের মুখ গম্ভীর হলো। বোর্ডের সদস্যদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার বর্ণনা শুনে ভদ্রলোককে তো মি. ডুয়েরিং হাউস বলেই মনে হচ্ছে।
এ দেখছি বড়ই অদ্ভুত রহস্যময় ব্যাপার! একজন প্রবীণ সদস্য মন্তব্য করলেন।
এবার আমি সিগার কেসটি বের করে টেবিলের উপর রেখে বললাম, আমার সহযাত্রী ভদ্রলোক এটা ফেলে গিয়েছিলেন।
চেয়ারম্যান সিগারকেসটি পরীক্ষা করে সেটা একজন সদস্যের হাতে দিলেন। তারপর বোর্ডের সদস্যদের হাতে হাতে ঘুরতে লাগল সিগারকেসটা।
তাঁদের পরীক্ষা শেষ হলে চেয়ারম্যান গম্ভীরভাবে বললেন, সিগারকেসটা যে মি. ডুয়েরিং হাউসের তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি নিজে এবং বোর্ডের মাননীয় সদস্যরা সবাই এই সিগারকেসটা তাঁকে বহুবার ব্যবহার করতে দেখেছি।
চেয়ারম্যান কলিংবেল টিপলেন, একজন বেয়ারা ঘরে ঢুকতে তিনি নিচু গলায় কী যেন আদেশ করলেন। একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন সেদিনের সেই টিকিট চেকার ।
বসুন, চেয়ারম্যান বললেন। আমার মতো চেকার সাহেবেরও জবানবন্দি নেওয়া হল।
আপনি মি. ডুয়েরিং হাউসকে চেনেন?
হ্যাঁ, বেশ ভালোভাবেই চিনি।
তাঁকে চিনতে ভুল হবার কোন সম্ভাবনা আছে?
মি. ডুয়েরিং হাউসকে এতবার দেখেছি যে তাঁকে দেখলে চিনতে পারব এমনটি হতেই পারে না, চেকার সাহেব বেশ জোর দিয়েই বললেন।
এই ভদ্রলোক বলছেন মি. ডুয়েরিং হাউস ইউস্টন থেকে জংশন স্টেশন পর্যন্ত ওঁর সঙ্গে একই কামরায় এসেছেন। আপনি তো সেদিন ওই ট্রেনের চেকার ছিলেন তাই না?
হ্যাঁ।
আচ্ছা, আপনি কি সেদিন মি. ডুয়েরিং হাউসকে দেখেছেন? চেয়ারম্যান যেন তীরের মতো কথাগুলো ছুঁড়ে দিলেন।
জ্বি না, আমি প্রতিটি যাত্রীর টিকিট পরীক্ষা করেছি। মি. ডুয়েরিং হাউস ট্রেনে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁকে দেখতে পেতাম, চিনতে পারতাম।
এই ভদ্রলোককে চেনেন? ওঁকে দেখেছেন কোনদিন?
উনি আমার পূর্ব পরিচিত নন, সেদিন ট্রেনের একটি কামরায় উনি ছিলেন।
আপনি কখন ওঁর কামরায় টিকিট চেক করতে যান?
ট্রেন জংশন স্টেশনে ঢুকবার ঠিক আগে! সিগনাল না পেয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
কিন্তু এ ভদ্রলোক তো বলছেন জংশন স্টেশন পর্যন্ত মি. ডুয়েরিং হাউস ওঁর কামরাতেই ছিলেন।
সেদিন আমি যখন ওঁর কামরায় চেক করতে গিয়েছিলাম তখন সেখানে উনি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না।
আমার দিকে তাকিয়ে চেয়ারম্যান বললেন, আপনার কথার সঙ্গে আমাদের চেকারের বক্তব্যের কোন সঙ্গতি নেই। একজন বলছেন মি. ডুয়েরিং হাউস কামরায় ছিলেন আর একজন বলছেন ছিলেন না।
একটু থেমে প্রতিটি শব্দ ধীর এবং স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলেন তিনি, তাহলে এই সিদ্ধান্তেই আসতে হয় যে আপনাদের দুজনের মধ্যে একজনের উক্তি সঠিক নয়। মাফ করবেন কিন্তু একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনাদের দুজনের একজন মিথ্যা কথা বলছেন।
আমি সত্যি কথাই বলছি, স্যার, টিকিট চেকারের দিকে একটু সদ্ধি দৃষ্টিতেই তাকালেন চেয়ারম্যান। চেকারের সঙ্গে পলাতক মি. ডুয়েরিং হাউসের একটা গোপন যোগাযোগ আছে–এ রকম একটা সন্দেহই কি চেয়ারম্যান সাহেবের মনে এসেছে?
টিকিট চেকারও বোধহয় এরকম কিছু একটা আশঙ্কা করে ভীরু গলায় বলল, আমি সত্যি কথাই বলছি, স্যার।
চেয়ারম্যান আমার দিকে সপ্রশ্ন চাউনি তুলতেই আমি বললাম, আমার বক্তব্য সম্বন্ধে নিজের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আমি আগে যা বলেছি এখনও তা-ই বললাম।
এরপর সেদিনের গার্ডের জবানবন্দি নেয়া হলো। কিন্তু রহস্য সমাধানের কোন ক্ল পাওয়া গেল না। গার্ড জানালেন ট্রেন ছাড়বার একটু আগে তিনি আমাকে প্লাটফরম দিয়ে ছুটতে দেখেছিলেন। আমার সহযাত্রী একটা সিগারকেস ফেলে গিয়েছিলেন। সেটা তাঁকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আমি ছুটেছিলাম–একথাটাও তিনি বললেন।
বোর্ডের বৈঠকে নেমে এল এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
.
নীরবতা ভেঙে চেয়ারম্যান বললেন, ব্যাপারটা মোটেই পরিষ্কার হলো না। আমরা যে তিমিরে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম। এবার তাহলে কাগজগুলো দেখা দরকার। সেদিন ঐ ট্রেনের গার্ড চেকার এদের ডিউটি বুক নিয়ে আসা হোক। ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করতে চাই।
ডিরেক্টররা সায় দিলেন তাঁর কথায়, সেক্রেটারির দিকে তাকিয়ে চেয়ারম্যান বললেন, এ ব্যাপারে ডে বুকটা একবার দেখা দরকার।
সেক্রেটারি কলিং বেল টিপল। বেয়ারা ঢুকল। তার দিকে তাকিয়ে সেক্রেটারি বলল, মি. রাইকস।
একজন ডিরেক্টরের কথা থেকে বুঝলাম যে মি. রাইকস কোম্পানির একজন আন্ডার সেক্রেটারি।
