চেকার বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।
কালকে যে গার্ড সাহেবকে দেখেছিলাম, তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? স্টেশন মাস্টারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
এই ট্রেনেই আছেন তিনি।
ট্রেন ছাড়তে কতক্ষণ দেরি?
আর মিনিট পাঁচেক পরেই ছেড়ে দেবে।
আমি যে মি. ডুয়েরিং হাউসের সিগার কেসটা নিয়ে ছুটেছিলাম তা গার্ড সাহেব দেখেছেন। ইচ্ছে করলে তাকে এখানে ডেকে আমার কথার সত্যতা যাচাই করে নিতে পারেন, স্টেশন মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।
স্টেশন মাস্টারের জরুরি ডাকে গার্ড সাহেব ছুটতে ছুটতে এলেন। তিনি স্বীকার করলেন আমাকে প্লাটফরম ধরে ছুটে যেতে দেখেছেন। এটাও বললেন যে আমি যেন কার সিগার কেস ফেরত দেবার জন্য দৌড়ে যাচ্ছিলাম।
ট্রেন ছাড়ার সময় হলো। গার্ড সাহেব দৌড়ালেন ট্রেনের দিকে।
ট্রেন ছেড়ে দিল। আমরা বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম চলন্ত ট্রেনের দিকে।
নীরবতা ভেঙে বন্ধু বলল, তুমি বোধহয় স্বপ্ন দেখেছ।
স্বপ্ন? যে কথা কোনদিন শুনিনি তা নিয়ে স্বপ্ন দেখব কী করে? ব্রাঞ্চ লাইনের কথা আমি কোনদিন শুনিনি। মি. ডুয়েরিং হাউস ব্যাগে করে সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছেন, তাও আমি জানতাম না।
হয়তো কোথাও শুনেছিলে বা খবরের কাগজে পড়েছ কিন্তু খেয়াল করনি। তোমার মনের গহনে এসব কথা জমা ছিল। স্বপ্নে মনের অচেতন স্তর থেকে মুক্তি পেয়ে ব্যাপারটা তোমার মনে এসেছিল। জাগ্রত অবস্থায় যে ব্যাপারটাকে কোন গুরুত্ব দাওনি, স্বপ্নাতুর অবস্থায় সেটাই গুরুত্ব পেয়ে গেছে।
বেশ, তর্কের খাতিরে মানলাম তোমার কথা, কিন্তু তোমার বাড়ির ব্লু রুমের কথা আমি কী করে জানব? আমি তোমার এ বাড়িতে আগে কখনও আসিনি। মি. ডুয়েরিং হাউসকে যে রু রুমে থাকতে দেয়া হয়েছিল তা তো আমার জানার কথা নয়।
হুঁ, এটা ঠিকই বলেছ। হয় আমাদের না হয় মি. ডুয়েরিং হাউসের কাছে না শুনলে এটা তোমার জানার কথা নয়।
কিন্তু তোমাদের কাছ থেকে আমি একথা শুনিনি, তাহলে অনিবার্যভাবে এটাই প্রমাণ হচ্ছে যে কথাটা আমি শুনেছি আমার সহযাত্রী মি. ডুয়েরিং হাউসের কাছ থেকে।
ব্যাপারটা তো তা-ই দাঁড়াচ্ছে, বিমূঢ়ভাবে বন্ধুবর বলল।
তাছাড়া এই সিগার কেসটা, এটা আমার কাছে এল কী করে?
তাই তো! ওটা আপনার কাছে এল কী করে? স্টেশন মাস্টার এতক্ষণ আমাদের দুজনের কথা শুনছিলেন। এবার তিনি আমাকেই প্রশ্ন করলেন।
এ এক অদ্ভুত রহস্য, সবাই বলছে মি. ডুয়েরিং হাউস একজন ফেরারী আসামী। অথচ তুমি বলছ কাল এ লাইনে তিনি তোমার সহযাত্রী ছিলেন, বন্ধু বললেন।
হ্যাঁ, শুধু তাই নয় তাঁর মধ্যে কোন লুকোচুরির ভাবও ছিল না। কোন পলাতক আসামী কি এমনভাবে সহযাত্রীর কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে জনবহুল প্লাটফরমের মধ্য দিয়ে যায়? আর তাছাড়া এমন একটা স্টেশন যেখানে কর্মচারীরা সবাই তাঁকে চেনে? মি. ডুয়েরিং হাউসের কথাবার্তায় এবং আচরণে তাঁকে কিন্তু আমার একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে। আমারও ধারণা এর মধ্যে একটা রহস্য রয়েছে।
এ রহস্য ভেদ করা আমাদের কাজ নয়, আমি কালই কর্তৃপক্ষের কাছে সব কিছু জানিয়ে একটা রিপোর্ট পাঠাচ্ছি, স্টেশন মাস্টার বললেন। রিপোর্টে আমি এ ব্যাপারটা গোয়েন্দা দিয়ে তদন্ত করাবার সুপারিশ করব।
পাঁচ
কয়েকদিন পর রেল কোম্পানির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চিঠি পেলাম। ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমাকে অনুরোধ করেছেন ডিরেক্টর বোর্ডের এক বিশেষ সভায় উপস্থিত থাকার জন্য। বুঝলাম বোর্ডের সদস্যরা আমাকে মি. ডুয়েরিং হাউস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান।
সভার আগের দিনই লন্ডনগামী ট্রেনে চেপে বসলাম। কোম্পানির হেড অফিস লন্ডনে। সেখানেই বোর্ডের সভা। সভায় যাতে যথাসময়ে পৌঁছতে পারি সেজন্য কোন রকম ঝুঁকি না দিয়ে একদিন আগেই বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
যথাসময়ে বোর্ডের অফিসে পৌঁছে গেলাম। কোম্পানির একজন পদস্থ কর্মচারী আমাকে মিটিংরুম-এ নিয়ে গেলেন।
দেখলাম সুন্দর সাজানো গোছানো একটি ঘরে বড় টেবিলের চারপাশে কয়েকজন ভদ্রলোক বসে আছেন। বুঝলাম এঁরাই রেল কোম্পানির ডিরেক্টর। ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমাকে স্বাগত জানিয়ে বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
পরিচিতির পর শুরু হলো আসল কাজ। কোম্পানির চেয়ারম্যান বললেন, আমরা জংশন স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে একটা রিপোর্ট পেয়েছি। রিপোর্টটা আমাদের কোম্পানির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। রিপোর্টে বলা হয়েছে কদিন আগে আপনি নাকি আমাদের কোম্পানির নিরুদ্দিষ্ট ডিরেক্টর মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে একই কামরায় গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, ইউস্টন থেকে জংশন পর্যন্ত আমরা একই কামরায় ছিলাম।
আপনি কি মি. ডুয়েরিং হাউসকে চিনতেন?
না, সেদিনই ট্রেনের কামরায় তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়।
তাঁর সঙ্গে আপনার কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছিল?
নানা রকমের কথাবার্তা হয়েছিল।
আমাদের কোম্পানি সংক্রান্ত কোন কথা হয়েছিল?
জ্বি।
কী কথা?
মি. ডুয়েরিং হাউস নতুন ব্রাঞ্চ লাইনটা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। কাজের জন্য তিনি যে ব্যাগে করে সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছেন, সে কথাও বলেছেন।
তাই নাকি! চেয়ারম্যানের কণ্ঠস্বরে বিস্ময়ের সুরটা আর চাপা রইল না।
