ট্রেন থেকে নেমে সোজা স্টেশন মাস্টারের ঘরে গেলাম। দেখলাম স্টেশন মাস্টার আমার বন্ধুকে বেশ ভালোভাবেই চেনেন। মামুলি দুচারটি কথাবার্তার পর বন্ধুবর জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, মি. ডুয়েরিং হাউস কি কাল এই স্টেশনে নেমেছিলেন?
দারুণ অবাক হয়ে স্টেশন মাস্টার তাকালেন আমাদের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, মি. ডুয়েরিং হাউস? কই এরকম খবর তো আমার কানে আসেনি।
আপনি মি. ডুয়েরিং হাউসকে চেনেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
কেন চিনব না? তিনি আমাদের রেল কোম্পানির একজন ডিরেক্টর। ব্রাঞ্চ লাইন পাতবার কাজে তাঁকে বহুবার এপথে যাতায়াত করতে হয়েছে। তিনি আমার এ ঘরে এসে বসতেন, চা খেতেন। ব্রাঞ্চ লাইনের কাজ কতদূর এগিয়েছে বা কাজকর্ম কেমন হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করতেন। মি. ডুয়েরিং হাউসকে আমি বেশ ভালোভাবেই চিনি।
কাল বিকেলে এই স্টেশনেই তিনি নেমেছিলেন। ইউস্টন স্টেশন। থেকে আমার সঙ্গে একই কামরায় তিনি এসেছিলেন।
আপনি ডুয়েরিং হাউসকে চেনেন তো? স্টেশন মাস্টার এবার আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন।
কালকের আগে তাঁকে কখনও দেখিনি।
তাহলে কী করে বুঝলেন যে আপনার সহযাত্রীই মি. ডুয়েরিং হাউস?
ন্দ্রলোক তো সেই পরিচয়ই দিয়েছিলেন।
তবে তিনি নিশ্চয়ই অন্য কেউ। যেকোন কারণেই হোক তিনি মি. ডুয়েরিং হাউস বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, স্টেশন মাস্টার গম্ভীরভাবে বললেন।
কিন্তু মি. ডুয়েরিং হাউস এটা ট্রেনের কামরায় ফেলে গেছেন।
ট্রেনের কামরায়?
হা, আগেই বলেছি গতকাল ইউস্টন স্টেশন থেকে এই জংশন পর্যন্ত তিনি আমার সহযাত্রী ছিলেন।
কিন্তু এ অবিশ্বাস্য। স্টেশন মাস্টার বললেন।
কেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
মি. ডুয়েরিং হাউস একজন ফেরারী আসামী। রেল কোম্পানির সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে তিনি উধাও হয়েছেন। এ লাইনে তিনি বহুবার যাতায়াত করেছেন। এ লাইনের স্টেশন মাস্টার, গার্ড, টিকিট-চেকার, পয়েন্টস ম্যান, খালাসী, ড্রাইভার, কুলি সবাই তাঁকে চেনে। তাঁর খোঁজ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশে খবর চলে যাবে। সুতরাং মি. ডুয়েরিং হাউস এ লাইনে অন্তত যাতায়াত করার সাহস করবেন বলে মনে হয় না।
টিকিট চেকার? আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, গতকাল আমাদের কামরায় একজন টিকিট চেকার এসেছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই আমার সহযাত্রীকে দেখেছেন। তাকে পাওয়া যাবে এখন?
না, সন্ধ্যার আগে তাকে পাবেন না। সে যে ট্রেনে আসবে সে ট্রেন এখানে পনের মিনিট থামবে। তখন তাকে আমার অফিসে তলব করতে পারি। কিন্তু আপনারা কি অতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?
না করে উপায় কী, বন্ধু বলল, অবশ্য সময় কাটানো খুব একটা সমস্যা হবে না। ব্রাঞ্চ লাইনের কাজকর্ম দেখব। লাইনের লোক জনের কাছে খোঁজখবর নেব গতকাল তাদের কেউ মি. ডুয়েরিং হাউসকে দেখেছে কিনা। আপনাদের এলাকাটা ঘুরে দেখব। কয়েক ঘণ্টা তো সময় তা দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
ব্রাঞ্চ লাইনের কাজকর্ম দেখে আর রেল কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ সেরে সন্ধ্যার একটু আগেই স্টেশনে ফিরে এলাম। আমাদের তদন্তের ফল মোটেই আশাপ্রদ হয়নি। মি. ডুয়েরিং হাউসকে গতকাল কেউ দেখেনি।
এক্সপ্রেস ট্রেন যথাসময়েই জংশন স্টেশনে এল। স্টেশন মাস্টার চেকার সাহেবকে নিজের কামরায় ডেকে পাঠালেন।
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই চেকার এসে গেলেন। চিনতে পারলাম। কালকের টিকেট চেকারই ইনি।
স্টেশন মাস্টার টিকিট চেকারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এই দুই ভদ্রলোক আপনাকে মি. ডুয়েরিং হাউস সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চান। আপনার তো তাড়া আছে– এক্ষুনি ট্রেনে ফিরে যেতে হবে…
না, আমার তেমন তাড়া নেই। আজকে আমার ডিউটি এখানেই শেষ । বাকি স্টেশনগুলোর জন্য আর একজন চেকারের উঠবার কথা আছে এই স্টেশন থেকে। বাকি পথটুকু আমি এমনিই চলে যেতাম। সে না হয় পরের লোকাল ট্রেনেই যাব।
বেশ।
এঁরা কি পুলিশের পক্ষ থেকে এসেছেন? চেকার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
না না সেসব কিছু নয় দ্রুত বললাম আমি। আমাদের প্রশ্ন শুনলেই বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা আসলে কী।
বেশ, বলুন কী প্রশ্ন। চেকার বললেন।
আপনি মি. ডুয়েরিং হাউসকে চেনেন? আমি প্রশ্ন করলাম। চিনি।
তাঁকে দেখলে চিনতে পারবেন?
নিশ্চয়ই পারব।
আচ্ছা, গতকাল যে ট্রেনে আপনি টিকিট চেক করেছিলেন তাতে মি. ডুয়েরিং হাউস ছিলেন?
না।
এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত?
অবশ্যই। চেকার বেশ জোরের সঙ্গেই বললেন।
কী করে এতটা নিশ্চিত হলেন?
আমি প্রতিটি কামরার প্রতিটি লোকের টিকিট চেক করেছি। আর গতকালকের যাত্রীদের মুখও আমার মোটামুটি মনে আছে। কিন্তু কোন কামরাতেই মি. ডুয়েরিং হাউস ছিলেন না। দেখুন আপনার চেহারা আমার মনে আছে, অথচ আপনাকে আমি কালকের আগে কখনও দেখিনি। কাজেই বুঝতেই পারছেন মি. ডুয়েরিং হাউস কোনো কামরায় থাকলে আমি তাঁকে দেখলেই চিনতে পারতাম।
কিন্তু মি. ডুয়েরিং হাউস তো আমার কামরাতেই ছিলেন।
আপনার কামরায়! বিস্মিতভাবে চেকার বললেন, যতদূর মনে পড়ছে সে কামরায় তো আপনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিলেন না।
মোটেই না, আমার কামরাতেই মি. ডুয়েরিং হাউস ছিলেন। তিনি এই স্টেশনে নেমে যান। তাঁর ফেলে যাওয়া সিগার কেসটি তাঁকে পৌঁছে দিতে গিয়ে আমি ট্রেন ফেল করতে বসেছিলাম।
