ডিনার পার্টি আর জমল না। বন্ধু, বন্ধুপত্নী এবং অতিথিরা খুশির ভাব আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বেশ বোঝা গেল ভাবটা কৃত্রিম। যেটা স্বচ্ছন্দে গতিতে এগিয়ে চলছিল তাও যেন হঠাৎ মন্থর গতি হয়ে উঠল। কোথায় ঘটল ছন্দপতন?
কোন রকমে ভোজন পর্ব চুকল। অতিথিরাও কোন না কোন অজুহাতে চলে গেলেন যে যার বাড়ি। এরা সবাই স্থানীয়। বহিরাগত অতিথি কেবল আমি একা।
খাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে বসলাম আমি এবং বন্ধু। বন্ধুপত্নীও শরীর খারাপের কথা বলে শোবার ঘরে চলে গেলেন। দুজনে দুটো সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর নীরবতা ভেঙে আমিই বললাম, আনন্দের সুরটা হঠাৎ কেটে গেল। আমার কারণেই যে এটা ঘটেছে তা বুঝতে পারছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি আমার কোন্ কথায় বা আচরণে এমনটি ঘটল?
সুর কেটে গেল, তাই না? সিগারেটে টান দিয়ে বন্ধু বলল, তুমি আমার স্ত্রীকে যা বলেছ তাতে আমরা সবাই একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছি।
ঠিক বুঝলাম না, বিমূঢ়ভাবে বললাম আমি।
তুমি বুঝবে কী করে? ব্যাপারটা তো তুমি জানোই না, এক মুখ ধোয়া ছাড়ল বন্ধু।
দুঃখিত! আনন্দের আসরটা মাটি করে দিলাম।
আরে না না, তোমার কোন দোষ নেই। বিব্রতভাবে বন্ধু বলল। তুমি যা করেছ, সেটাই স্বাভাবিক। যে বাড়িতে যাচ্ছি সে বাড়ির একজন আত্মীয়ের সঙ্গে পথে দেখা হলো, গন্তব্যে পৌঁছে এ কথা বলাই স্বাভাবিক। আমরা হলেও বলতাম।
তাহলে? আমি আরও অবাক হয়ে বললাম।
আসলে আমার মামা শ্বশুর অর্থাৎ মি. ডুয়েরিং হাউসের প্রসঙ্গ উঠবার ফলেই গোটা পরিবেশটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
কেন কি হয়েছে মি. ডুয়েরিং হাউসের?
কী যে হয়েছে তাই তো কেউ জানে না। আচ্ছা তোমার কোন ভুল হয়নি তো, তুমি কি নিশ্চিত যে ট্রেনে যে ভদ্রলোক তোমার সহযাত্রী ছিলেন তিনি মি. ডুয়েরিং হাউস?
দেখ, মি. ডুয়েরিং হাউসকে আমি আগে কখনও দেখিনি। ভদ্রলোক নিজের যে পরিচয় দিলেন তাতে… আচ্ছা দাঁড়াও উনি একটা জিনিস ফেলে গিয়েছিলেন কামরায়, আপাতত আমার কাছে রয়েছে সেটা। দেখ তো এ সিগারকেসটা তোমার মামা শ্বশুরের কিনা..।
পকেট থেকে কেসটা বের করে বন্ধুর হাতে দিলাম।
কেসটা হাতে নিয়ে অবাক বন্ধুবর, বিস্মিত স্বরে বলল, হ্যাঁ, এটাই তো আমার মামা শ্বশুরের সিগার কেস। এটা বহুবার দেখেছি। তাছাড়া এই তো কোনায় তার নাম মনোগ্রাম করা রয়েছে। না, এটা তাঁরই জিনিস। তুমি বলছ এটা উনি ট্রেনের কামরায় ফেলে গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ।
কিন্তু আমার মামা শ্বশুরের সঙ্গে দেখা হওয়াটা, একটু ইতস্তত করে বন্ধু বলল খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার!
এর মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে? ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলো তো। তখন থেকে কেবলই রহস্যের জাল বুনে চলেছ।
ব্যাপারটা হলো, কণ্ঠস্বর নিচু করে বন্ধু বলল, আমার মামা শ্বশুর রেল কোম্পানির সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে পালিয়েছিলেন। কেউ জানে না এখন তিনি কোথায়, তিনি একজন ফেরারি। পুলিশ তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
কী বলছ তুমি!
ঠিকই বলছি, এটা আমাদের জন্যও একটা দারুণ লজ্জার কথা। মি. ডুয়েরিং হাউস আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কাজেই তার প্রসঙ্গ ওঠায় আমরা বেশ বিব্রত হয়ে যাই।
তিনি কতদিন ধরে নিরুদ্দেশ?
তা প্রায় মাস তিনেক।
অথচ আজকেই কয়েকঘণ্টা আগে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে।
তাই তো ভাবছি, এটা কী করে হল সেটাই বুঝতে পারছি না।
তুমি বলছ মি. ডুয়েরিং হাউস সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে ফেরার হয়েছেন। অথচ আমাকে বলেছেন টাকাটা তিনি স্থানীয় ব্যাংকে জমা দেবেন। ব্রাঞ্চ লাইনের কাজের জন্য যাতে সব সময় হেড অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়, সেজন্যই এ ব্যবস্থা। তাঁর সঙ্গে যে সত্তর হাজার পাউন্ড রয়েছে একথা তিনি নিজের থেকেই আমাকে বলেছেন। কোন অপরাধী কি এরকম বলে বেড়ায়?
হ্যাঁ, তোমার কথাটা একেবারে অযৌক্তিক নয়।
আচ্ছা, মি. ডুয়েরিং হাউস মানুষ হিসেবে কেমন?
তাকে অত্যন্ত সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ বলেই জানতাম। সাধারণ একজন কেরানির চাকরি নিয়ে তিনি রেল কোম্পানিতে ঢুকেছিলেন। কোন খুঁটির জোর ছাড়াই। তারপর নিজের সততা, নিষ্ঠা আর কর্মদক্ষতায় ধাপে ধাপে উন্নতি করে তিনি কোম্পানির ডিরেক্টর বোর্ডের একজন সদস্য পর্যন্ত হয়েছিলেন। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেন যে তাঁর দুর্মতি হল। সারা জীবনের সুনামটাকে তিনি ধ্বংস করে ফেলেছেন!
বন্ধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে আজ কিন্তু আমার সত্যিই দেখা হয়েছিল।
হ্যাঁ, সিগারকেসটা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।
ব্যাপারটার মধ্যে যেন রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।
হুঁ, চিন্তিতভাবে বন্ধু বলল।
চলো না কাল একবার জংশন স্টেশন থেকে ঘুরে আসি; দেখি নতুন কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায় নাকি।
বেশ।
কিন্তু আমাদের যাবার ব্যাপারটা গোপন রেখো, আমি তাকে সাবধান করে দিলাম।
রাখবো।
তোমার স্ত্রীকেও আপাতত কিছু বলো না।
বেশ বলব না।
চার
পরদিন তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা দুই বন্ধু জংশন স্টেশনে এলাম। এই স্টেশনেই মি. ডুয়েরিং হাউস নেমেছিলেন। আর এখান থেকেই নতুন ব্রাঞ্চ লাইন পাতা হচ্ছে। সুতরাং আমার নিরুদ্দেশ সহযাত্রীর কোন খবর আদৌ মিললে এখান থেকেই পাওয়া যাবে।
