বিদায় জানিয়ে ভদ্রলোক নেমে পড়লেন প্লাটফরমে। তারপর মিশে গেলেন যাত্রীদের ভিড়ে।
আমি জানালা দিয়ে ঝুঁকে লক্ষ করছিলাম মি. ডুয়েরিং হাউসকে। হঠাৎ কীসের ওপর যেন আমার পা পড়ল। নিচু হয়ে দেখলাম একটা সিগারকেস। হয়তো আমার সহযাত্রী ফেলে গেছেন। ঠিক তাই। দেখলাম কেসটার এক কোনায় মি. ডুয়েরিং হাউসের নাম লেখা রয়েছে।
ট্রেন ছাড়তে এখনও দুমিনিট বাকি। ভাবলাম এক ছুটে ভদ্রলোককে কেসটা দিয়ে আসি। নেমে পড়লাম প্লাটফরমে। গার্ড বোধহয় আমার কামরার দরজা বন্ধ করতে আসছিলেন।
কোথায় যাচ্ছেন? আপনার তো এখানে নামার কথা নয়, বললেন তিনি।
আসছি এক্ষুনি। আমার সহযাত্রী ভদ্রলোকটি তাঁর সিগারকেসটি ফেলে গেছেন। দামী কেস… ভদ্রলোক বোধহয় এখনও স্টেশনের বাইরে যেতে পারেননি। দেখি তাঁকে কেসটা দিয়ে আসা যায় কিনা।
তাড়াতাড়ি আসবেন। আর মিনিট দেড়েকের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দেবে।
আর কথা না বাড়িয়ে ছুটতে লাগলাম। এটা একটা বড় জংশন। প্লাটফরমটাও বিরাট। ভদ্রলোক বোধহয় এতক্ষণে প্লাটফরমের অর্ধেকটা পেরিয়ে গেছেন।
কিছুটা ছুটে আসবার পরে সহযাত্রী ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। দেখলাম একজন লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি এগিয়ে চলেছেন। তারপর দুজনে ভিড় থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একান্তভাবে আলাপ করতে লাগলেন। ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন প্লাটফরমের একটা ল্যাম্প পোস্টের পাশে। ওঁদের ঠিক মাথার উপরে জুলছিল গ্যাস বাতি। সেই আলোয় দুজনকেই আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।
কুলি আর যাত্রীদের ভিড় ঠেলে যতদূর সম্ভব জোরে ছুটছিলাম। মনে ভয়, এই বুঝি আমাকে না নিয়েই ট্রেন ছেড়ে দিল। এরকম মানসিক অবস্থাতেও মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গীকে ভালভাবেই লক্ষ করছিলাম। ভদ্রলোকের রঙ ফর্সা, মাথার চুল ধূসর, লম্বায় তিনি আমার সহযাত্রীর থেকে ইঞ্চি দুয়েকের ছোটই হবেন। লোকটির মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফ।
যাক এসে গেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বিপদ! ঘাটে এসে তরী ডুবল । ভিড়ের ধাক্কায় পা পিছলে পড়ে গেলাম। সামলে নিয়ে উঠে পড়তে দুতিন সেকেন্ডের বেশি লাগেনি কিন্তু যখন সিধে হলাম তখন আমার সহযাত্রী বা তার সঙ্গী কাউকেই দেখতে পেলাম না। চারপাশে তাকালাম-নাঃ কোথাও ওঁদের কোন চিহ্ন নেই! ওঁরা দুজনেই কি কর্পূরের মতো উবে গেলেন!
ঢং ঢং ঢং… ট্রেন ছাড়বার ঘণ্টা পড়ল। বেজে উঠল ট্রেনের বাঁশি।
কাছেই স্টেশনের একজন পয়েন্টস ম্যান দাঁড়িয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই যে ভাই, একটু আগে গ্যাস পোস্টের তলায় যে দুজন। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা কোন্ দিকে গেলেন বলতে পার?
আমি লক্ষ করিনি, স্যার।
ট্রেনের বাঁশি আবার বেজে উঠল। দেখলাম হাত নেড়ে গার্ড সাহেব আমাকে গাড়িতে উঠবার ইঙ্গিত করছেন। ছুটলাম নিজের কামরার দিকে। গাড়ি নড়েচড়ে উঠল, চলতে শুরু করল ধীর গতিতে। এক লাফে নিজের কামরার ফুটবোর্ডে উঠে পড়লাম তারপর ঢুকে পড়লাম কামরায়।
আমি তখন হাঁপাচ্ছি। আমার হাতে সহযাত্রীর ফেলে যাওয়া সুদৃশ্য সিগারকেস। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তখনও তাকিয়ে আছি বিরাট প্লাটফরমটার দিকে।
গাড়ির গতি বাড়ল। পিছনে পড়ে রইল জংশন তার বিরাট প্লাটফরম নিয়ে।
বাকি পথটুকু আর সঙ্গে আনা কাগজপত্রে মন বসাতে পারলাম না। সহযাত্রী আর তার সিগারকেসটার কথাই বারবার মনে হানা দিতে লাগল। কেন যে মনে পড়ছিল জানি না। ব্যাপারটা এমন কিছু অসাধারণ নয়… ট্রেন থেকে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে লোকে কি অনেক সময় টুকটাক জিনিসপত্র ফেলে যায় না?
তিন
গন্তব্যে পৌঁছতে সাঁঝ ঘনাল। স্টেশন থেকে বন্ধুর বাড়ি যেতে কোন অসুবিধা হলো না। কারণ বন্ধুবর স্টেশনে তার মোটরগাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। স্টেশন থেকে বাড়ি আসতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগল না।
গিয়ে দেখলাম আরও কয়েকজন অতিথি এসেছেন। গোসল করে, পোশাক পাল্টে ড্রয়িংরুমে এলাম। বন্ধুবর তার অতিথিদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ নানা গল্প-গুজব চলল, তারপর আমরা গিয়ে বসলাম খাবার টেবিলে। আজকের অভিজ্ঞতাটা বলবার জন্য মনটা ছটফট করছিল, কিন্তু এতক্ষণ সে কথা বলার সুযোগ পাইনি। এবার সুযোগ মিলল। বন্ধুপত্নীর দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলো ট্রেনে, আমরা এক সঙ্গে অনেকটা পথ এলাম। গল্প-গুজবে সময়টা বেশ কেটে গেল।
তাই বুঝি? কার সঙ্গে দেখা হলো? বিস্মিত হেসে বললেন বন্ধুপত্নী।
আপনার মামা মি. ডুয়েরিং হাউসের সঙ্গে।
বন্ধুপত্নী চমকে উঠলেন, বন্ধুকেও কেমন যেন বিব্রত মনে হলো।
মি. ডুয়েরিং হাউস বলেছেন শীগগিরই হপ্তাখানেকের ছুটি নিয়ে তিনি এখানে আসবেন। তাকে যেন রু রুমটাই ছেড়ে দেয়া হয়। তবে গতবারের মত ফায়ার প্লেসে যেন অত আগুনের ব্যবস্থা করা না হয়। গতবার আগুনের তাপে অনেক কষ্ট পেয়েছেন তিনি।
কথা শেষ করার আগেই বুঝতে পারলাম ঘরের মধ্যে অস্বস্তির কালো একটা ছায়া নেমে এসেছে। ঘরের আনন্দময় পরিবেশটা যেন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেমন একটা থমথমে ভাব। খাবার ঘরে দুঃসহ স্তব্ধতা। আমি হয়তো এমন কোনো কথা বলে ফেলেছি যা না বললেই ভালো হত! অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। আমার জন্যই বুঝি আনন্দের সুর কেটে গেল। কিন্তু আমি কী এমন কথা বললাম যাতে ডিনার পার্টিটা নিরানন্দময় হয়ে গেল? কিছুই বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।
