হাহাকারের সুরে শেষ কথাগুলো যখন বলেছিল উইলসন তখন গলা চেপে, গলা ভেঙে ফিসফিস করার চেষ্টা করেনি এতটুকুও। একটা একটা শব্দ বলার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে শূন্যে বিলীন হচ্ছিল ওর প্রাণবায়ু। এবং চমকে চমকে উঠছিলাম আমি আমারই কণ্ঠস্বর ওর কণ্ঠে বর্ণে বর্ণে ধ্বনিত হচ্ছে শুনে। ও বলেছিল :
জিতে গেলে ঠিকই কিন্তু নিজের প্রাণ দিয়ে জিতলে। কারণ আমিই তোমার সব কিছু। আজ থেকে সমস্ত দুনিয়ার কাছে, সমগ্র স্বর্গলোকের কাছে, যাবতীয় আশার জগতের কাছে নিহত হয়ে রইলে তুমি! দেখছো কি? এত তোমারই ছায়া! ছায়াকে হত্যা করে ডেকে আনলে তোমার নিজেরই মৃত্যু!
–এডগার অ্যালান পো
একদিন ট্রেনে
এক কয়েকদিনের জন্য লন্ডনের বাইরে গিয়েছিলাম আমি। ভোরবেলা ইউস্টন স্টেশন থেকে ট্রেনে চাপলাম। সঙ্গে কিছু দরকারী কাগজপত্র রয়েছে। ঠিক করলাম ট্রেনে যেতে যেতে ডকুমেন্টগুলো পড়ে ফেলব।
ছোট একটি কামরা রিজার্ভ করা যায় কিনা খোঁজ করতেই গার্ড সাহেব একটি খালি কামরার ব্যবস্থা করে দিলেন। এ ব্যবস্থা করতে তেমন অসুবিধাও হলো না, কারণ ট্রেনটি বলতে গেলে একরকম ফাঁকাই যাচ্ছিল।
ট্রেন ছাড়বার সময় হলো। বাঁশি বাজল, ট্রেন নড়েচড়ে উঠল। আর ঠিক সেই সময় একজন বয়স্ক ভদ্রলোক একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে ছুটতে ছুটতে আমার কামরার সামনে চলে এলেন; তারপর দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন ভেতরে।
একটু বিরক্তই হলাম। একা বসে নিজের কাজ আর করা যাবে না। কিন্তু উপায় কী? এ কামরা তো আর আমার একার নয়।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের দুজনের আলাপ-পরিচয় হয়ে গেল। নিজের পরিচয় দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ভাই, আমি রেলওয়ে কোম্পানির একজন ডিরেক্টর। আমাদের কোম্পানি একটা ব্রাঞ্চ লাইন খুলেছে। তার ডিউটির অনেকটাই আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে। এ কাজটা নিয়ে আমি এখন খুবই ব্যস্ত। এই তো সত্তর হাজার পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছি। লোকাল ব্যাংকে জমা দেব। তাতে কাজ চালাতে খুব সুবিধা হবে। কোন খরচের জন্য হেড অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
কিন্তু এতগুলো টাকা নিয়ে চলাফেরা করছেন, ভয় লাগে না? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনো দুর্ঘটনাও তো ঘটতে পারে।
না, না! কে জানছে আমার ব্যাগে এত টাকা রয়েছে। তাছাড়া কে ছিনতাই করবে? আপনাকে বললাম বলে আপনি নিশ্চয়ই করবেন না, বলে ভদ্রলোক হাসলেন।
তবু, এভাবে…
কোন রকম দুর্ঘটনা ঘটবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া আমি খুব একটা ভিতু বা নার্ভাস টাইপের লোক নই। আমার মনোবল যথেষ্ট শক্ত।
কথাবার্তায় অনেকটা সময় কেটে গেল। ট্রেন ছুটে চলেছে। সঙ্গের কাগজগুলো পড়া হলো না। গন্তব্যে পৌঁছেও পড়া যাবে। ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতেও ভাল লাগছে। আগেকার বিরক্তির ভাবটা কেটে গেছে। কথা প্রসঙ্গে ভদ্রলোক আমার গন্তব্যস্থল কোথায় জেনে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, আরে, আপনার বন্ধু তো আমার খুবই পরিচিত।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আপনার বন্ধুর স্ত্রী আমার নিজের ভাগ্নী। ইস, আপনার সঙ্গে যেতে পারলে খুব ভালো হত। কটা দিন একটু বিশ্রাম মিলত। কিন্তু উপায় নেই, ব্রাঞ্চ লাইনের সব দায়দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। লাইনের পরিকল্পনাটা আমিই দিয়েছিলাম। কয়েকজন ডিরেক্টর আপত্তি জানালেও স্কিমটা শেষ পর্যন্ত ডিরেক্টর বোর্ডের মিটিংয়ে পাশ করিয়ে নিতে পেরেছি। এখন যত ঝক্কি-ঝামেলা আমার ওপর। কমাস ধরে যা খাটা-খাটনি যাচ্ছে! ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
বন্ধু আর বন্ধুপত্নীকে বলব আপনার কথা।
বলবেন, ম্লান হেসে ভদ্রলোক বললেন।
আপনার যদি কিছু বলার থাকে, তবে আমি তা ওদের বলতে পারি, আমি বললাম।
আমার! ভদ্রলোক যেন চমকে উঠলেন, তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, একটি কথা ওদের বলতে পারেন যে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি সপ্তাহখানেকের ছুটি নিয়ে ওদের ওখানে যাব। ভাগ্নীকে বলবেন ব্লু রুমের ফায়ার প্লেসে যে অত আগুন না জ্বালায় । আমি গেলে ওরা আমাকে ও ঘরটিই ছেড়ে দেয়। উঃ! গতবারে গিয়ে আগুনের তাপে একেবারে ঝলসে যাওয়ার দশা।
গাড়ির গতি মন্থর হয়ে এল। সামনে স্টেশন। আলো দেখা যাচ্ছে। সামনে আর একটি গাড়ি থামার জন্য আমাদের ট্রেন প্লাটফরমে ঢোকার সিগনাল পায়নি।
দুই
একজন টিকিট চেকার ঢুকলেন কামরায়। এ কামরার টিকিট চেক করতে তার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। মোটে তো দুজন আরোহী। সোজা আমার কাছে এসে তিনি বললেন, টিকিট?
পকেট থেকে টিকিট বের করে দেখালাম।
মনে হলো আমার সহযাত্রীর দিকে একবার তাকালেন চেকার সাহেব। তারপর নেমে গেলেন পাশের কামরার দিকে। ট্রেনও ততক্ষণে সিগনাল পেয়ে চলতে শুরু করেছে।
মি. ডুয়েরিং হাউসের দিকে তাকিয়ে আমি বিস্ময়ের সুরে বললাম, চেকার আপনার টিকিট দেখতে চাইলেন না তো?
বলতে ভুলে গিয়েছি আমার সহযাত্রী ভদ্রলোকের নাম ডি. ডুয়েরিং হাউস।
ওরা সবাই আমাকে চেনে, জানে আমি রেল কোম্পানির একজন ডিরেক্টর। প্রায়ই এ লাইনে যাতায়াত করি। আমার ফার্স্টক্লাস পাস আছে।
ট্রেন স্টেশনে ঢুকল। ভদ্রলোক চট করে উঠে পড়লেন, ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন, আমাকে এখানেই নামতে হবে। আপনি তো এ লাইনের শেষ স্টেশনে নামবেন। আপনার সঙ্গে গল্পগুজব করে সময়টা বেশ কাটল। চলি তাহলে।
