যাক সে কথা। এবার আসা যাক ঘটনাবহুল এই নাটকের শেষ পর্বে।
এতক্ষণ পর্যন্ত শুধু লিখে গেলাম আমার ওপর উইলিয়াম উইলসনের বাদশাহী প্রতাপের আঁকালো বর্ণনা। তার দাপটে ভয়ে কেঁচো হয়ে যেতাম প্রতিবার। তার শুভ্র সুন্দর চরিত্র, তার হিমালয় সম প্রজ্ঞা, তার সর্বত্র উপস্থিত হওয়ার ক্ষমতা এবং সর্ববিষয়ে তার অবিশ্বাস্য পারদর্শিতা আমাকে লৌহ-মুরের মতোই ঘা মেরে মেরে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে প্রতিবার। আমার অস্থিমজ্জায় অপরিসীম আতঙ্ক সঞ্চার করে দিয়ে গেছিল সে তার দুর্দম শক্তি দিয়ে আর সীমাহীন দুর্বলতা নিয়ে আমি কেবলই নুয়ে পড়েছি। তার উদ্ধত আকৃতির সামনে, হজম করেছি তার দর্পিত শাসানি।
বেশি সঙ্কুচিত হয়েছি ততই সে হামলে পড়েছে। তিল তিল করে পরিত্রাণের একটা ক্ষীণ সম্ভাবনাকে সযত্নে লালন করে গেছি মনের মধ্যে। এর ঠিক উল্টোটা ঘটালেই তো হয়! নিজেকে একটু একটু করে দাপুটে আর মরিয়া করে ফেললেই তো সে গুটিয়ে যাবে আমার সামনে ঠিক যে ভাবে। আমাকে তার ইচ্ছার গোলাম বানিয়ে রেখেছে– হুবহু সেই ভাবে আমিও তাকে বানিয়ে ফেলব আমার ইচ্ছার গোলাম।
মন শক্ত করলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম, এইবার তাকে গুঁড়িয়ে দেবই আমার সঙ্কল্পের দৃঢ়তা দিয়ে। ইদানীং বড্ড বেশি সুরা পান করছিলাম। ছেলেবেলা থেকেই আমি চড়া মেজাজী। সুরা তাতে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত। তরল আগুনের প্রকোপে পড়েই বলা যায় পৌঁছে গেলাম পথের কাঁটা তুলে ফেলার চরম সিদ্ধান্তে ।
সুযোগটা পেয়ে গেলাম রোম শহরে। ১৮০০-সালের সেই কার্নিভ্যালের কথা মনে পড়ে? আমি ছিলাম সেখানে। ডিউক ডি-ব্ৰগলিও একটা মস্ত মাসকারেড পার্টির আয়োজন করেছিলেন তাঁর প্রাসাদে। এ পার্টিতে ছদ্মবেশ পরে যেতে হয়। মুখে থাকে মুখোশ। পরনে অদ্ভুত বেশ। স্রেফ মজা করার জন্যে এই ধরনের আসরে ভিড়ও হয় খুব।
আমার যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়ো ডিউকের তরুণী ভার্যার সঙ্গে অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করা। মেয়েটি পরমাসুন্দরী, কিন্তু পতিভক্তি তেমন নেই। উড়ে উড়ে বেড়াতে চায়। পার্টিতে যেতেই চোখ নাচিয়ে গাঢ় সুরে আমাকে জানিয়ে দিল, একটু ফাঁক পেলেই তার এই বিচিত্র ছদ্মবেশের রহস্যকথা ফাঁস করবে শুধু আমার কাছেই। ইঙ্গিত তাৎপর্যপূর্ণ। মদ খেয়ে যখন চোখ লাল করে ফেলেছি, অদ্ভুত অদ্ভুত পোশাক আর মুখোশ পরা মেয়েপুরুষদের বিরামহীন গুঁতো খেয়ে মেজাজটাকেও ঠিক রাখতে পারছি না–ঠিক এইসময়ে ভিড়ের মধ্য দিয়ে দেখতে পেলাম বৃদ্ধ ওমরাহ-র তরুণী ভার্যাকে। মদির চোখের দারুণ কটাক্ষ আমাকে নিমেষে চুম্বকের মতো টান মারল সেদিকে। তোতির ঠেলায় আমি তখন অস্থির। তবু। অধীর ভাবে যেই পা বাড়িয়েছি মোহিনী অভিমুখে অমনি কে যেন আলতোভাবে হাত রাখল আমার কাঁধে–একই সঙ্গে কানের পর্দায় বর্ষিত হলো চাপা, ভাঙা গলায় সেই পৈশাচিক ফিসফিসানি।
প্রতিটি রক্তকণিকা তখন উত্তাল হয়ে উঠেছে আমার শিরায়, ধমনীতে, কামিনী-পিপাসা বন্য হস্তীর বল এনে দিয়েছে পেশীতে পেশীতে, ধাবমান শোণিতের সুগম্ভীর গর্জন ধ্বনিত হচ্ছে মাথার মধ্যে–ঠিক এই সময়ে ঘটল এই বিপত্তি।
বিদ্যুৎ বেগে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। খপাৎ করে আঁকড়ে ধরে ছিলাম মূর্তিমান উৎপাতটার কলার। পরণে তার নীল মখমলের স্পেনীয় আলখাল্লা– কোমরে রক্তবর্ণের বেল্ট। সারা মুখ ঢাকা কালো রেশমের মুখোশে। ঠিক এই বেশ আর এই মুখোশই দেখব এই আশা নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম সবেগে।
দারুণ ক্রোধে ফুঁসে উঠেছিলাম একই সঙ্গে। বিতৃষ্ণা আর বিদ্বেষ আগুনের ফুলকির মতোই ছিটকে ছিটকে এসেছিল দাঁতে দাঁত পিষে প্রতিটি অক্ষর উচ্চারণের সময়ে। আমি বলেছিলাম–স্কাউড্রেল! জালিয়াৎ! পিশাচ! কী চাও তুমি? আমার মৃত্যু? সেটি হতে দিচ্ছি না! বলেই, হিড় হিড় করে শয়তান শিরোমণিকে বলরুম থেকে টেনে এনেছিলাম পাশের ছোট্ট ঘরটায়।
ধাক্কা মেরে দেওয়ালের ওপর আছড়ে ফেলেছিলাম তৎক্ষণাৎ। কপাট টেনে বন্ধ করে দিয়েই কোষমুক্ত করেছিলাম তরবারি। বলেছিলাম সাপের মতোই হিসহিসিয়ে দেখি–এবার কার গায়ে জোর বেশি! বার করো তোমার হাতিয়ার।
ক্ষণিক দ্বিধা করেছিল সে। তারপর ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাপ থেকে টেনে বের করেছিল ইস্পাতের তলোয়ার।
শুরু হয়েছিল দ্বন্দ্বযুদ্ধ। শেষ হয়েছিল অচিরেই। রক্তের ধারা তখন প্রলয় নাচন নেচে চলেছে আমার শিরায় শিরায়। মত্ত ঐরাবতের শক্তি ভর করেছে শরীরে। স্রেফ দানবিক শক্তি দিয়ে মারের পর মার মেরে তাকে আমি কোণঠাসা করেছিলাম চক্ষের নিমেষে এবং কলজে ফুটো করবার এমন সুবর্ণ সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ছিলাম তৎক্ষণাৎ। একবার নয় বার বার, সর্ব শক্তি দিয়ে তরবারি প্রবেশ করিয়েছিলাম তার বুকের খাঁচায়।
ঠিক তখনই তুমুল চেঁচামেচি শুনেছিলাম বাইরে–ঘন ঘন ধাক্কায় থরথর করে কেঁপে উঠেছিল দরজার কপাট। মুহূর্তের জন্যে পেছন ফিরে চেয়েছিলাম আমি।
পরক্ষণেই সামনে চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, ওইটুকু সময়ের মধ্যেই যেন পট পালটে গেছে। আসলে কিছুই পালটায়নি কিন্তু আমার উদ্দাম অলীক কল্পনা দিয়ে আমি মনে করে নিলাম যেখানে দেওয়াল ছিল, সেখানে রয়েছে বিশাল একটা দর্পণ। সেই দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে রয়েছে আমারই অবয়ব। রক্তাক্ত দেহে বিহ্বল মুখে আমি টলতে টলতে এগিয়ে আসছি আমারই দিকে। মুখের মুখোশ আর হাতের তরবারি এখন মেঝেতে নিক্ষিপ্ত। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মুখের ভাঁজ, খজ, রেখা আর তিল। এ যে আমারই প্রতিচ্ছায়া –একই পরমাণু দিয়ে গড়া একই আমি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই আর তিলমাত্র। রক্তমাখা এই আশ্চর্য কায়াকে আমি উইলিয়াম উইলসন নামেই চিনে এসেছি এতগুলো বছর।
