আমি রেলিং ধরে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালাম৷ এখন বসে থাকলে চলবে না৷ প্রথমে গোটা বাড়িটা ভালো করে একবার খুঁজে দেখা দরকার৷ কে জানে, মার্ডারার হয়তো এখনও পালাতে পারেনি৷ হয়তো বাড়ির ভেতরেই কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে৷
শরীরের কাঁপুনিটা থিতিয়ে আসছিল৷ তার বদলে জায়গা করে নিচ্ছিল রাগ, রাগ এবং রাগ৷ টের পাইনি, কখন যেন মাথার ভেতরে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে৷
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম৷ সতর্ক চোখে এপাশ-ওপাশ দেখতে লাগলাম৷
ড্রয়িং-ডাইনিং স্পেসে কালার টিভির পাশে একটা সুন্দর ছোট্ট টেবিল৷ তার গায়ে বাটালির আলপনা৷ সেই শৌখিন টেবিলটার ওপরে বসানো একটা বড়সড় পেতলের ফুলদানি৷ ফুলদানিতে অনেকগুলো রঙিন ফুল৷ নকল৷
চট করে এগিয়ে গেলাম ফুলদানিটার কাছে৷ রঙিন ফুলগুলো বের করে টেবিলে রেখে দিলাম৷ তারপর ফুলদানিটা ডানহাতে মুগুরের মতো বাগিয়ে ধরলাম৷
টের পেলাম, ফুলদানিটা যথেষ্ট ভারী এবং অস্ত্র হিসেবে মারাত্মক৷ কিন্তু আমার নার্ভের যা দশা তাতে দরকারি মুহূর্তে আমি কি ওটা ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারব?
ওটা হাতে নিয়ে সতর্ক পা ফেলে গোটা বাড়িটা ট্যুর করে ফেললাম৷ খোঁজাখুঁজির সময় খাটের তলা বা আলমারির পেছনও বাদ দিলাম না৷
কিন্তু কোত্থাও কেউ নেই৷
তবে দুটো ব্যাপার লক্ষ করলাম৷ কিন্তু সেদিকে আমি আগে মন দিইনি৷ কারণ, স্বর্ণার খোঁজে আমি পাগল ছিলাম৷ আর…তারপর…ওর খুনির খোঁজে৷
প্রথম ব্যাপারটা হল, আমাদের বেডরুমের আলমারিটা হাট করে খোলা৷ তার কয়েকটা তাকের জিনিসপত্র বেশ ওলটপালট৷ কাছে গিয়ে চেক করতেই বুঝতে পারলাম ক্যাশ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা আর একটা সোনার চেন উধাও৷
টাকাটা পরশুদিন আমরা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনেছিলাম৷ প্ল্যান ছিল, আজ-কালের মধ্যেই আমরা একটা উঁচু মডেলের অটোমেটিক ওয়াশিং মেশিন কিনব৷ কারণ, কাচাকাচির পরিশ্রম আর মেসি ব্যাপারটা স্বর্ণমালা একেবারেই পছন্দ করত না৷
বাকি রইল সোনার চেন৷ ওটা স্বর্ণা সবসময় গলায় পরত, আর মাঝে-মাঝেই খেয়ালখুশি মতো ওটা গলা থেকে খুলে আলমারির বুকসমান তাকটায় ফেলে রাখত৷
আলমারিটায় চাবি দেওয়ার জন্যে বহুবার ওকে বলেছি, কিন্তু স্বর্ণা সে-পরামর্শ কখনও কানে তোলেনি৷ বরং হেসে বলেছে, ‘আলমারির দরজায় চাবি দিয়ে কোনও ফ্যামিলি কখনও চোর-ডাকাতের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে?’
কথাটা সাড়ে ষোলো আনা ঠিক৷
আমি ফুলদানিটা মুঠোয় ধরে আলমারির সামনে পাঁচ-দশ সেকেন্ড ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম৷ স্বর্ণা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল৷ আমার চোখে আবার জল এসে গেল৷
নিজেকে সামলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোলাম৷
রান্নাঘরের সব বাসনপত্র মেঝেতে ছড়ানো৷ ঠিকমতো পা রাখার জায়গা নেই৷ আর মেঝেটা ভিজে৷ কোণের একটা কল অল্প খোলা৷ ক্যাবিনেটের তাকে কাপ-প্লেট সাজানো থাকলেও সেগুলো খুনি ভাঙচুর করেনি৷
এটাই দ্বিতীয় ব্যাপার৷
খুনি কেন এমন পাগলামো করেছে জানি না৷ তবে যাকগে, ওসব পাগলামোর কারণ-টারণ পুলিশ খুঁজে বের করবে৷ সেইসঙ্গে খুনিকেও৷
ফুলদানিটা জায়গা মতো রেখে দিয়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ পুলিশ—পুলিশে খবর দিতে হবে৷ পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম৷ লোকাল থানার নম্বর কত? আমি তো জানি না৷ তা হলে কি ১০০ ডায়াল করব? সেই ফোনটা কোথায় লাগে? লালবাজারে?
আমি কনফিউজড অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ৷
আমার বাড়ির সামনেটায় একটুকরো ফাঁকা জমি৷ সেখানে তিন-চারটে ফুলগাছ৷ স্বর্ণাই ওদের যত্ন করত৷ ওদের খারাপ দিন শুরু হল এখন থেকে৷ সেই সঙ্গে আমারও৷
আমাদের বাড়ির লাগোয়া ব্যানার্জিদের দোতলা বাড়ি৷ রণেন ব্যানার্জি আর মিনতি ব্যানার্জি—দুই বুড়ো-বুড়ি৷ ওঁদের একটাই ছেলে—সায়ন৷ বিয়ে-টিয়ে করেনি৷ বিন্দাস আছে৷ ‘ম্যাগনাম’ নামের একটা এম. এন. সি.-তে চাকরি করে৷
রণেন ব্যানার্জি দিন-রাত দাবা খেলেন—একা-একাই৷ কখনও-কখনও আমাকে ডাকাডাকি করেন৷ আমি বহুবার ওঁর কাছে দাবায় হেরেছি৷ হারতে যে আমার খারাপ লাগে তা নয়৷ তবে হেরে যাওয়ার পরই রণেনবাবু আমাকে দাবা খেলার বিষয়ে আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট ‘শর্ট টার্ম কোর্স’ উপহার দেন৷ আমার হাল তখন সুকুমার রায়ের ‘শ্যামাদাস’-এর মতো৷ হাত-পা বাঁধা মুরগি—যার কান দিয়ে ক্রমাগত জ্ঞান ঢুকছে৷
এই সমস্যাটুকু বাদ দিলে রণেন ব্যানার্জি বেশ পরোপকারী ভদ্রলোক৷ ওঁকে ডেকে আমি খারাপ খবরটা জানিয়ে হেলপ চাইতে পারি৷ বয়স্ক মানুষ—নিশ্চয়ই থানা-পুলিশ সম্পর্কে আমার চেয়ে ঢের বেশি খোঁজখবর রাখবেন৷
হঠাৎ দোতলার দিকে চোখ গেল আমার৷ মিনতি ব্যানার্জি দোতলার বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আছেন৷ ধবধবে সাদা গায়ের রং৷ চুল কাঁচাপাকা৷ চোখ উজ্জ্বল, চকচকে৷ ভদ্রমহিলা ওই চেয়ারে বসে-বসেই অত্যন্ত উঁচুমানের নজরদারি চালান৷ তাছাড়া পাড়ার খোঁজখবরও কিছু কম রাখেন না৷ সব ব্যাপারে নাক গলানো ওঁর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে৷ তাই আমি ওঁর নাম রেখেছি শার্লক হোমস৷ এবং ওঁকে আমি একটু এড়িয়েই চলি৷
কিন্তু এখন, এই বিপদের সময়, ওসব ব্যাপার ভুলে গিয়ে আমি ‘মিসেস ব্যানার্জি—’ বলে চিৎকার করে ডেকে উঠলাম৷
মিনতি চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দার রেলিঙের কাছে চলে এলেন৷ রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকেঃ ‘কী হয়েছে? আপনি আজ অফিসে যাননি?’
