আমি ওঁকে স্বর্ণমালার কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম৷ আমার শোরগোলে রণেন ব্যানার্জি সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন৷ তারপর একে-একে জড়ো হল আরও পাড়াপড়শি…জনগণ৷
আর একেবারে শেষে হসপিটালের অ্যাম্বুলেন্স এবং পুলিশ৷
এতক্ষণ ধরে যে-কথাগুলো বললাম, সেগুলো পুলিশকে আমি বারবার বলেছি৷ এতবার বলেছি যে, কথাগুলো আমার পরীক্ষার পড়ার মতো মুখস্থ হয়ে গেছে৷ কিন্তু উপায় কী! পুলিশ যতবার জানতে চাইবে ততবারই আমাকে বলতে হবে—বিরক্ত হলে চলবে না৷ পুলিশের ইনভেস্টিগেশানে আমার হান্ড্রেড পারসেন্ট কো-অপারেট করা উচিত৷ কারণ, আমি চাই, স্বর্ণমালার মার্ডারার ধরা পড়ুক৷
সেইজন্যেই আমার মুখোমুখি বসে থাকা প্লেন ড্রেসের ডিটেকটিভ ভদ্রলোক যখন আরও একবার সেই ‘গোল্ডেন স্টোরি’ শুনতে চাইলেন, আমি গড়গড় করে শুনিয়ে দিলাম৷
এই ভদ্রলোক সেই শুরু থেকেই আমার পেছনে পড়ে রয়েছেন৷ স্বর্ণা মারা গেছে প্রায় একমাস পেরিয়ে গেছে৷ পুলিশের ইনভেস্টিগেশান যে-স্পিডে শুরু হয়েছিল সেটা যথেষ্টই থিতিয়ে পড়েছে৷ এই নাছোড়বান্দা বৃদ্ধ ডিটেকটিভটি না থাকলে হয়তো সেই তদন্ত একেবারেই থেমে যেত৷ কিন্তু ইনি এখনও তদন্তের লেজ ধরে রয়েছেন৷ এরকম ঠ্যাঁটা ডিটেকটিভ সত্যি খুব রেয়ার৷
বেশ বুঝতে পারছি, স্বর্ণমালার খুনিকে আর কখনওই ধরা যাবে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ভদ্রলোকের মহা ধৈর্য আর নিষ্ঠার তারিফ করতে হয়৷ ওঁকে দেখে বোঝা যায় ‘লেগে থাকা’ কাকে বলে৷
ভদ্রলোকের নাম মোহনলাল পাল৷ বয়েস পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মাঝামাঝি কোনও একটা সংখ্যা হবে৷ মোটাসোটা লম্বা চেহারা৷ রং ময়লা৷ চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা৷ তাতে যে বেশ পাওয়ার আছে সেটা বোঝা যায় লেন্সের কৃপায় মোহনলালের বড়-বড় হয়ে যাওয়া চোখ দেখে৷
সেই চোখের ওপরে বেশ ঘন কাঁচা-পাকা ভুরু৷ মাথার চুলও একই ধরনের৷ দু-ভুরুর মাঝে বিরক্তির স্থায়ী ভাঁজ৷ কিন্তু একইসঙ্গে ওঁর মুখে সবসময় একটা হাসি-হাসি ভাব লেগে আছে৷ তাই ঠিক বোঝা যায় না উনি বিরক্ত, না খুশি৷
তবে মোহনলালের চেহারায় সবচেয়ে অ্যাট্রাকটিভ হল ওঁর ঝাঁটা গোঁফ৷ ঠিক যেন একটা শজারু লম্বা হয়ে নাকের নীচে শুয়ে আছে৷
আমার বাড়িতে ড্রয়িং-ডাইনিং স্পেসে আমরা বসেছিলাম৷ আমাদের মাঝে একটা শৌখিন টি-টেবল৷ টেবিলে দু-কাপ চা, আর তার পাশে একটা প্লেটে নোনতা বিস্কুট৷ আমরা মাঝে-মাঝে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম, আর তার সঙ্গে টুকটাক করে বিস্কুট চলছিল৷
আমি আড়চোখে দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকালাম৷ চারটে বাজে৷ মোহনলাল এসেছেন তিনটে নাগাদ৷ তবে ওঁর বসার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না খুব শিগগির গা তুলবেন৷
‘বুঝলেন, রীতেশবাবু…’ চায়ে চুমুক দিলেন মোহনলাল৷ ওঁর গলার কাছটা একটু ফোলা মতন৷ সেখানে বারদুয়েক আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘আপনার ওয়াইফের মার্ডারটা ঠিক যেন একটা পারফেক্ট মার্ডার৷ সুন্দরী তরুণী দিনদুপুরে খুন এবং খুনি হাওয়া—পুলিশ তার নাগাল পাওয়ার কোনও ক্লু-ই পাচ্ছে না৷’ মাথা নাড়লেন আক্ষেপে: ‘অথচ পারফেক্ট মার্ডার বলে কিছু হয় না৷ ওটা পুরোপুরি থিয়োরিটিক্যাল, ইম্যাজিনারি, রুট ওভার মাইনাস ওয়ান—বুঝলেন কি না?’ আমার চোখে তাকিয়ে হাসলেন মোহনলাল৷
আমি আর কী বলব! তাই বোকার মতো একটু হাসলাম৷
শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন মোহনলাল৷ একটু সময় নিলেন৷ তারপর সামান্য হেসে বললেন, ‘রীতেশবাবু, জানি, লাস্ট একমাস ধরে আমি আপনাকে যাকে বলে তিতিবিরক্ত করে চলেছি৷ আমি হলফ করে বলতে পারি, এরকম ঠ্যাঁটা ডিটেকটিভ আপনি আগে কখনও দেখেননি৷ আসলে আমার নেচারটাই এই টাইপের৷ ছোটবেলায় অঙ্ক আটকে গেলে তার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন লেগে থাকতাম৷ তারপর চাকরি-বাকরি করতে এসেও তাই৷ কেস সলভ করতে না পারলে তার পেছনে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর লেগে থাকি৷ তা আপনার ওয়াইফের কেসটা তো সবে একমাস হয়েছে! একটা ব্যাপার কী জানেন, আমার কোনও তাড়া নেই৷ শুধু অঙ্কটা আমার সলভ করা চাই…৷’
আমার ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল৷ আজ শনিবার—ছুটির দিন৷ তার মধ্যে বিনা নোটিশে ভদ্রলোক তিনটের সময় এসে হাজির৷ কী আর করা যাবে! স্বর্ণা চলে যাওয়ার পর যে-দু-একটা রান্না রপ্ত করেছি তার মধ্যে চা একটা৷ তো সেটাই করে ওঁকে আপ্যায়ন করেছি৷ তারপর থেকে চলছে মোহনলালের অ্যাকশান রিপ্লে৷ কতবার যে ওঁর মুখে এসব কথা শুনেছি! ঘুমের আর দোষ কী!
চা-বিস্কুট শেষ করে হাতে তালি দিয়ে হাত ঝাড়লেন ডিটেকটিভ৷ গোঁফে আঙুল ঘষলেন৷ তারপর ছোট্ট করে দু-তিনবার কেশে বলতে শুরু করলেন৷
‘দেখুন, কোনও হাজব্যান্ড মার্ডার হলে প্রাইম সাসপেক্ট হচ্ছে ওয়াইফ৷ আবার উলটোটা হলে, মানে, ওয়াইফ খুন হলে সন্দেহ করার এক নম্বর পাবলিক হল স্বামী৷ আর স্ট্যাটিসটিক্স বলছে, শতকরা চুরানব্বই দশমিক তিন ভাগ ক্ষেত্রে সন্দেহটা সত্যি হয়৷ তা আপনার কেসেও আমরা হেলপলেস৷ যেহেতু আপনার ওয়াইফ মার্ডার হয়েছে তাই—আপনিই হলেন আমাদের প্রাইম সাসপেক্ট…৷’
সে আমি ভালো করেই জানি৷ পুলিশ আমাকে যেভাবে প্রশ্নে-প্রশ্নে হ্যারাস করেছে সে আর বলার নয়৷ মাঝে-মাঝে আমার কান্না পেয়ে গেছে৷ স্বর্ণাকে হারানোর দুঃখের সঙ্গে নুনের ছিটের মতো মিশে গেছে পুলিশের জেরার যন্ত্রণা৷ মাঝে-মাঝে মনে হয়, স্বর্ণা যদি একটা নোট লিখে যেতে পারত যে, ‘রীতেশ আমাকে খুন করেনি,’ তা হলে হয়তো রেহাই পেতাম৷
