জাহাজের খোল থেকে সাত মিটার দূরে ডিপ রোভারকে থামাল পিট। তারপর ধীরে ধীরে ফোরডেকের দিকে এগোল। আরে, একি! হঠাৎ বলল ও। রুডি, লেডি ফ্ল্যামবোঝোর রং কি?
দাঁড়াও। দশ সেকেন্ড পর জবাব দিল রুডি গান, খোল আর সুপার স্ট্রাকচার হালকা নীল।
এই জাহাজটার খোল লাল, ওপর দিকটা সাদা।
সাথে সাথে কিছু বলল না রুডি। তারপর তার ক্লান্ত গলার শোনা গেল, দুঃখিত, পিট। আমরা বোধহয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে বুদ্বুদ বেরোতে দেখছি।
না। জিওর্দিনো বলে, খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ আগে ডুবেছে, এটা এমন একটা জাহাজের লাশ।
নেগেটিভ, রেডিওতে ভেসে এল এবার স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্টের কণ্ঠস্বর। গত ছমাসে আটলান্টিকের এদকিটায় শুধু লেডি ফ্ল্যামবোরো নিখোঁজ হয়েছে।
কিন্তু এটা লেডি ফ্ল্যামবোরো নয়, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল জিওর্দিনো।
থামো একটু, বলল পিট। পেছন দিকে গিয়ে দেখি।
জাহাজটার পাশঘেঁষে পেছন দিকে চলে এল ওরা। জাহাজের গায়ে নাম লেখা রয়েছে।
ওহ, মাই গড। আঁতকে উঠল জিওর্দিনো। আমাদের বোকা বানানো হয়েছে।
অবিশ্বাসে স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকল না পিট। উন্মাদের মতো হাসতে শুরু করল সে। রহস্যটা যে ভেদ করা গেছে তা নয়, তবে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে। জাহাজের গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা নামটা লেডি ফ্ল্যামবোরো নয়।
নামটা হলো জেনারেল ব্রাভো।
.
৪৩.
যাদের হাতে তৈরি, চারশো মিটার দূর থেকে তারাও এখন আর চিনতে পারবে না লেডি ফ্ল্যামবোরোকে। চিমনিটাকে নতুন আকৃতি দেয়া হয়েছে, বদলে ফেলা হয়েছে প্রতিটি বর্গ ইঞ্চির রং। সামনের চেহারা বদলাবার জন্য মরিচের গুঁড়ো দিয়ে আঁকাবাঁকা দাগ টানা হয়েছে খোলের গায়ে। সুপার স্ট্রাকচার, স্টেটরুমের সবগুলো জানালা আর ডেকগুলো ফাইবার বোর্ড দিয়ে সম্পূর্ণ আড়াল করা, দূর থেকে দেখে মনে হবে ওটা একটা কার্গো কন্টেইনার।
প্রমোদতরীর ব্রিজ সরানো বা লুকানো সম্ভব হয়নি, কাঠের চৌকো কাঠামো দিয়ে আড়াল করা হয়েছে সেটাকে, কাঠামোর ওপর ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে মোটা ক্যানভাস। রং দিয়ে আঁকা হয়েছে নকল পোর্ট হোল আর হ্যাঁচ কাভার।
পাল্টা ডেল এসটের আলো পেছনে অদৃশ্য হবার সাথে সাথে সুলেমান আজিজের সশস্ত্র লোকজন বন্দি কু আর আরোহীদের কা করতে বাধ্য করে। সারা রাত ধরে চলে জাহাজটার চেহারা পাল্টানোর কাজ। প্রথমে বাধ্য করা হয় জাহাজের অফিসার, প্রকৌশলী, স্টুয়ার্ড, শেফ আর ওয়েটারদের। তরপর ভিআইপি প্যাসেঞ্জারদের ডাকা হয়। প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান আর প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকে দেয়া হয় কাঠমিস্ত্রীর কাজ, ব্যক্তিগত স্টাফ আর উপদেষ্টারা তাদেরকে সাহায্য করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আর সিনেটর জর্জ পিটকে দেয়া হয় রং লাগানোর দায়িত্ব।
নির্ধারিত সময়ে জেনারেল ব্রাভোর সাথে মিলিত হলো লেডি ফ্ল্যামবোরো, ইতোমধ্যে কার্গো কন্টেইনার জেনারেল ব্রাভোর প্রায় হুবহু চেহারা পেয়ে গেছে লেডি ফ্ল্যামবোরো। ওয়াটার লাইনের ওপরটা দেখে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে নিঃসন্দেহে। জেনারেল ব্রাভো বলে চালানো যাবে। আকাশ থেকে তাকালে দুএকটা ক্রটি বা অমিল চোখে পড়তে পারে।
আঠারোজন ক্রুসহ ক্যাপটেন হুয়ান ম্যাকাডো, জেনারেল ব্রাভো ছেড়ে চলে এসেছে লেডি ফ্ল্যামবোরোয়, আসার আগে জাহাজটার সবগুলো সিকক আর কার্গো ডোর খুলে দিয়েছে, বাছাই করা কয়েক জায়গায় ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গর্ত করা হয়েছে খোলের গায়ে। সাগরতলে তলিয়ে গেছে জেনারেল ভ্রাভো।
নতুন সূর্য নিয়ে পূর্ব আকাশ উজ্জ্বল হতে শুরু করল, নতুন চেহারা নিয়ে জেনারেল ব্রাভোর গন্তব্য অভিমুখে যাত্রা শুরু করল লেডি ফ্ল্যামবোরো। আর্জেন্টিনার সান পাবলো বন্দর যখন স্টারবোর্ড সাইডে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, বন্দরটাকে এড়িয়ে দক্ষিণ দিকেই যেতে থাকল জাহাজটা।
সাফল্যের মুখ দেখল সুলেমান আজিজের প্ল্যান। তিন দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, দুনিয়ার মানুষ এখনও বিশ্বাস করে লেডি ফ্ল্যামবোরো আটলান্টিকের অতল তলে তলিয়ে গেছে।
চার্ট টেবিলে বসে জাহাজের সর্বশেষ পজিশন চিহ্নিত করছে সুলেমান আজিজ। চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত লম্বা একটা রেখা টানল সে, ক্রস একে চিহ্নিত করল সেটাকে। সন্তুষ্টচিত্তে একটা সিগারেট ধরিয়ে সশব্দে ধোয়া টানল। আরও মোলো ঘণ্টা পর সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারবে সে। তখন জাহাজটাকে এমনভাবে লুকানো সম্ভব হবে যে কেউ আর সেটাকে খুঁজে বের করতে পারবে না।
নাচের ভঙ্গিতে ব্রিজ থেকে চার্টরুমে এসে ঢুকল ক্যাপটেন ম্যাকাডো, হাতে একটা ট্রে। কফি চলবে তো? বিশুদ্ধ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল সে।
ধন্যবাদ, ক্যাপটেন। তারপর তার মনে পড়ল। ইয়াল্লা, পান্টা ডেল এসটে ছাড়ার পর এখনও কিছু মুখে দিইনি আমি।
আমরা জাহাজে আসার পর থেকে আপনাকে ঘুমাতেও দেখিনি।
এখনও কত কাজ বাকি।
এবার বোধ হয় আমাদের মধ্যে খোলাখুলি আলাপ হওয়া দরকার, বলল ক্যাপটেন ম্যাকাডো। আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্বটা সেরে ফেললে মন্দ হয় না।
আপনি কে আমি জানি, অন্তত জানি কি নামে ডাকা হয় আপনাকে, নির্লিপ্ত, ঠাণ্ডা সুরে বলল সুলেমান আজিজ। তার বেশি কিছু জানার দরকার আছে কি?
আপনার প্ল্যানটা সম্পর্কে বলবেন আমাকে? জেনারেল ব্রাভোকে ডুবিয়ে দেয়ার পর লেডি ফ্ল্যামবোবোয় উঠতে হবে, এর বেশি কিছু জানানো হয়নি আমাকে। মিশনের পরবর্তী কাজ সম্পর্কে জানতে চাই আমি। বিশেষ করে জানতে চাই, আমাদের দুই জাহাজের কু কীভাবে লেডি ফ্ল্যামবোয়রা ত্যাগ করবে বা কীভাবে আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দেবে।
