দুঃখিত ব্যস্ত থাকায় আপনাকে জানানো হয়নি।
এখন যদি সময় করতে পারেন ভালো হয়, চাপ দিল ক্যাপটেন ম্যাকাডো।
কফির কাপে ধীরে ধীরে চুমুক দিল সুলেমান আজিজ, মুখোশ পরে থাকায় তার মুখভাব বোঝা গেল না। তারপর ম্যাকাডোর দিকে তাকাল সে। এক্ষুনি জাহাজ ছাড়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমার নেতা ও আপনার নেতা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, লেডি ফ্ল্যামবোয়রাকে যতটা সম্ভব দেরি করে ধ্বংস করতে হবে, অন্তত যতক্ষণ না পরিস্থিতি থেকে ফায়দা তোলার সুযোগ তারা পান।
ধীরে ধীরে শিথিল হলো ম্যাকাডোর পেশি। মুখোশ পরা সুলেমান আজিজের স্থির চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সে। ভাবল, লোকটা ইস্পাতের মতো কঠিন। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই, বলল সে। আরও কফি দেব?
খালি কাপটা ট্রের ওপর রাখল সুলেমান আজিজ। জাহাজ ডোবানো ছাড়া আর কী করেন আপনি।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে হাত পাকিয়েছি, শান্ত সুরে বলল ম্যাকাডো। আমরা দু’জন একই পেশায় আছি, সুলেমান আজিজ। মুখোশের ভেতর ঐ জোড়া কুঁচকে উঠলেও তা দেখতে পেল না সে, তবে জানে কুঁচকে উঠেছে।
আমাকে খুন করার জন্য পাঠানো হয়েছে আপনাকে? জিজ্ঞেস করল সুলেমান আজিজ, সিগারেটের ছাই ঝাড়ার জন্য শান্তভাবে ঝুঁকল সে, পরমুহূর্তে তার হাতের তালুতে বেরিয়ে এল একটা অটোমেটিক পিস্তল।
মুচকি হেসে বুকে হাত বাঁধল ম্যাকাডো। শান্ত হোন। আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনার সাথে একমত হয়ে কাজ করার জন্য।
ডান আস্তিনের নিচে স্প্রিং-নিয়ন্ত্ৰিত একটা খারে ভেতর পিস্তলটা রেখে দিল সুলেমান আজিজ। আমাকে আপনি চেনেন কীভাবে?
আমাদের নেতারা নিজেদের মধ্যে প্রায় কিছুই গোপন করেন না।
আখমতের ওপর ভরসা রাখা যায় না, রাগের সাথে ভাবল সুলেমান আজিজ। তার পরিচয় ফাঁস করে দিয়ে বেঈমানি করেছে সে। ম্যাকাডো যে মিথ্যে কথা বলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পথের কাঁটা নাদাভ হাসান অস্তিত্ব হারাবার পর ভাড়াটে খুনিকে আর দরকার হবে না ইয়াজিদের। উঁহু, মেক্সিকান হিটম্যান ম্যাকাডোকে তার পালানোর প্ল্যান জানতে দেবে না সুলেমান আজিজ। এটা কথা ভেবে মনে মনে সন্তুষ্ট বোধ করল সে-ম্যাকাডোকে যখন খুশি খুন করতে পারে সে, কিন্তু তাকে খুন করতে হলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ম্যাকাডোকে।
সুলেমান আজিজ জানে কোথায় সে দাঁড়িয়ে আছে। কফির কাপটা ট্রে থেকে তুলে উঁচু করে ধরল সে, বলল, আখমত ইয়াজিদের সাফল্য কামনায়।
ম্যাকাডোও নিজের কাপটা উঁচু করল। টপিটজিনের সাফল্য কামনায়।
.
তালা মারা একটা স্যুইটের ভেতর প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানের সাথে আটকে রাখা হয়েছে হে’লা কামিল আর সিনেটর পিটকে। কেউই ঘুমাতে পারছেন না। ঘাড়, পিঠ, কাঁধ আর হাত ব্যথা করছে। খিদেতে চো চো করছে পেট।
লেডি ফ্ল্যামবোরো উরুগুয়ে ছাড়ার পর থেকে কাউকে কিছু খেতে দেয়া হয়নি। বারকয়েক উঠে গিয়ে বাথরুম থেকে পানি খেয়ে এসেছেন ওরা। তাপমাত্রা দ্রুত নামতে শুরু করায় কষ্ট আরও বেড়ে গেছে ওঁদের।
পরিত্যক্ত একটা বস্তার মতো বিছানার ওপর নেতিয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট হাসান। পিঠে একটা ব্যথা আগে থেকেই ছিল, একটানা দশ ঘণ্টা কায়িক পরিশ্রম করার পর সেটা অসহ্য রকম বেড়ে গেছে।
মাঝেমধ্যে নড়াচড়া না করলে হে’লা কামিল আর সিনেটর পিটকে কাঠের মূর্তি বলে ভুল হতে পারত। একটা টেবিলে বসে আছেন হে’লা কামিল, চিবুক ঠেকে আছে হাতের তালুতে। চোখে ক্লান্তি, এলোমলো চুল, কাপড় চোপড়ে ভাজ, তার পরও অদ্ভুত সুন্দর আর আশ্চর্য পবিত্র লাগছে তাকে।
একটা কাউচে আধশোয়া ভঙ্গিতে রয়েছেন সিনেটর পিট, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সিলিংয়ের দিকে। চোখের পাতা নড়ছে দেখে বোঝা যায় বেঁচে আছেন তিনি।
যদি কিছু একটা করতে পারতাম! হেলা ফিসফিস করে বললেন।
মুখোশ আঁটা শয়তানটাকে কী মনে করেন আপনি? পাল্টা প্রশ্ন করলেন সিনেটর। সব দিকে ওর কড়া নজর। আমাদের না খাইয়ে রেখেছে, যাতে দুর্বল হয়ে পড়ি। সবাইকে এক জায়গায় রাখা হয়নি, ফলে আমরা পরামর্শ করতে পারছি না। সে বা তার আতঙ্কবাদী গ্রুপের কোনো সদস্য দুদিন ধরে আমাদের সামনে আসেনি, তারমানে বোঝাতে চেষ্টা করছে আমরা কত অসহায়।
দরজা ভাঙার চেষ্টা করতে পারি, বললেন কামিল।
বাইরে অবশ্যই সশস্ত্র গার্ড আছে, চৌকাঠ মাড়ালেই গুলি খেতে হবে।
যদি একটা লাইফবোট চুরি করতে পারি?
মাথা নাড়লেন সিনেটর।
এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। শত্রুরা সংখ্যায় এখন দ্বিগুণ, মেক্সিকো কার্গো শিপের ক্রুরা হাত মিলিয়েছে আতঙ্কবাদীদের সাথে।
নতুন একটা বুদ্ধি দিলেন হেলা, যদি একটা জানালা ভাঙি, তারপর এক এক করে ফার্নিচারগুলো ফেলতে থাকি পানিতে?
ফার্নিচার কেন, বোতলে হাতে লেখা কাগজ ভরেও ফেলা যায়। কিন্তু স্রোত ওগুলোকে সকালের মধ্যে একশো কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেবে। মাথা নাড়লেন সিনেটর পিট। উদ্ধারকর্মীরা সময় মতো একটাও পাবে না।
কেউ আমাদেরকে খুঁজছে না। আমার মতো আপনিও স্বীকার করুন। দুনিয়া ভাবছে, লেডি ফ্ল্যামবোরো ডুবে গেছে, আমাদের সলিল সমাধি ঘটেছে। ইতিমধ্যে সম্ভবত খোঁজাখুঁজির পালা শেষ হয়েছে।
একজনের কথা জানি, যে হাল ছাড়বে না।
কে? জাতিসংঘ মহাসচিব ও মিসরীয় প্রেসিডেন্ট একযোগে জানতে চাইলেন।
