তোমার কী ধারণা, হাইজ্যাকিংয়ের সাথেও আখমত জড়িত?
তার মোটিভ তো অবশ্যই আছে, সিআইএ প্রধান বললেন। পথের কাটা নাদাভ হাসানকে দূর হলে সরকারকে হটিয়ে গদিতে বসা তার জন্য পানির মতো সহজ হয়ে যাবে।
প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো, টপিটজিন আর মেক্সিকোর ব্যাপারেও একই কথা, শুকনো গলায় বললেন ডেইল নিকোলাস।
দুচারজন সি.আই.এ. এজেন্টকে উরুগুয়েতে পাঠানো ছাড়া আর কী কিছু করার নেই আমাদের? জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট। লেডি ফ্ল্যামবোরোকে খুঁজে বের করার কাজে আমরা সাহায্য করছি না কেন?
কারণটা ব্যাখ্যা করলেন মারটিন ব্রোগান। তারপর জানালেন, উরুগুয়ের সিকিউরিটি চিফরা হয় আমেরিকায় নয়তো ব্রিটেনে ট্রেনিং পেয়েছেন, তাদের তল্লাশিতে কোনো খুঁত থাকার কথা নয়। এরই মধ্যে রিপোর্ট পেয়েছেন তিনি, তারা আয়োজন ও চেষ্টা কোনো ত্রুটি করছে না। উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের আশিটার ওপর সামরিক ও বাণিজ্যিক প্লেন সেই ভোর রাত থেকে সাগরের ওপর তল্লাশি চালাচ্ছে, ওগুলোর সাথে কাজ করছে কম করেও চৌদ্দটা জাহাজ।
যা-ও বা ক্ষীণ একটু আশা ছিল, সেটা নিঃশেষে মুছে যেতে বসেছে দেখে এ রকম মুষড়েই পড়লেন প্রেসিডেন্ট। অথচ এখনও তারা জানতে পারেনি লেডি ফ্ল্যামবোলোর কপালে কী ঘটছে।
আরেকটু সময় নেবে ওরা, বললেন অ্যালান মারসিয়ার। তবে জানতে ঠিকই পারবে।
জাহাজের ভাঙা অংশ আর লাশ অবশ্যই পাওয়া যাবে, দৃঢ়তার সাথে বললেন মারটিন ব্রোগান! পেছনে কোনো চিহ্ন না রেখে অত বড় একটা জাহাজ স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে না।
প্রেস জানে? প্রেসিডেন্টের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।
আমাকে জানানো হয়েছে, ঘণ্টাখানেক হলো প্রচার করছে ওরা, ডেইল নিকোলাস বললেন।
কংগ্রেস, যদি জানে, শিকারের তালিকায় তাদের একজন সিনেটর রয়েছেন, নরক ভেঙে পড়বে। বললেন প্রেসিডেন্ট।
সিনেটর পিটের ওখানে উপস্থিতিই কানা-ঘুষা হওয়ার মতো ব্যাপার, নিকোলাস বললেন।
একটা কিছু তো বলতে হবে। কোন সিনেটর ওই জাহাজে গেলেন- এটা নিয়ে কথা উঠবেই, অ্যালান বলে উঠলেন।
আরে, মিসর আর মেক্সিকোর সমস্যার তুলনায় ওটা কিছুই নয়, ডেইল বলে উঠলেন। পশ্চিমা দুনিয়া মিসরকে হারাবে, কারণ ইয়াজিদের মৌলবাদী সরকার আরো ইরানে পরিণত করবে মিসরকে, বললেন ডেইল নিকোলাস তারপর, মেক্সিকো…ধরে নিতে পারি, আমাদের সীমান্তে একটা টাইম বোমা তৈরি হচ্ছে।
তুমি কী পরামর্শ দাও, কী করা উচিত আমাদের? জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট।
কিছু সময় চিন্তা করে ডেইল নিকোলাস বললেন, লেডি ফ্ল্যামবোরো আর তার প্যাসেঞ্জারদের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু না জানা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা।
কিন্তু যদি নিশ্চিতভাবে কিছু জানা না যায়? আমরা অপেক্ষা করলেও, প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করবে না। আখমত ইয়াজিদ আর টপিটজিন মিসর আর মেক্সিকোয় রক্তস্রাত বইয়ে দেবে, বসে বসে তাই দেখব আমরা? তাদেরকে থামানোর পথ কী?
আততায়ী পাঠিয়ে কিছু করার কথা আমরা ভাবতে পারি না, কারণটা সবার জানা দুনিয়ার মানুষ সেটা সমর্থন করবে না। মাথা চুলকালেন ডেইল নিকোলাস। তবে সবচেয়ে খারাপটার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি আমরা।
কী সেটা?
মিসরের আশা ছেড়ে দিতে পারি, বললেন ডেইল নিকোলাস। আর আক্রমণ করতে পারি মেক্সিকোকে।
.
৪১.
ঝম ঝম বৃষ্টিতে ভিজছে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টিভিডিও। মেঘ থেকে খসে পড়ল ছোটো একটা জেট প্লেন, ছুটে এসে সিধে হলো রানওয়ে বরাবর। টারমাক স্পর্শ করার পর কমার্শিয়াল টার্মিনালকে পেছনে ফেলে এক সার হ্যাঁঙ্গারের দিকে এগোল প্লেনটা, হ্যাঙ্গারগুলোর বাইরে অনেকগুলো ফাইটার জেট দাঁড়িয়ে রয়েছে। গায়ে সামরিক প্রতীক চিহ্ন নিয়ে উদয় হলো একটা ফোর্ড সিডান, প্লেনটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল পার্কিং এরিয়ায়, জায়গাটা ভিআইপি এয়ারক্রাফটের জন্য আলাদা করা।
একটা হ্যাঙ্গার অফিসের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে কর্নেল হোসে রোয়েস, ভিজে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। প্লেনটাকে থাকতে দেখল, ফিউজিলাজে লেখা রয়েছে নুমা। ইঞ্জিনের আওয়াজ থেকে গেল, এক মিনিট পর প্লেন থেকে নেমে এল তিনজন লোক। বৃষ্টি মথায় করে ছুটল তারা, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল সিডানে। তাদের নিয়ে হ্যাঁঙ্গারে ঢুকল গাড়ি।
অফিস কামরার দরজা থেকে ওদেরকে খুঁটিয়ে লক্ষ করল কর্নেল। তরুণ এক লেফটেন্যান্ট পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে। তিনজনের মধ্যে একজন তেমন লম্বা নয়, বুকটা ড্রামের মতো, মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, হাত পা যেন বুনো একটা ভাল্লুকের কাছ থেকে ধার করা। চোখজোড়া কুতকুতে, তবে ঠোঁট দুটোর মাঝখানটা চকচকে সাদা, অকারণ ব্যঙ্গের হাসি ফুটে আছে।
রোগা-পাতলা দ্বিতীয় লোকটা চশমা পরে আছে। কোমর সরু, কাঁধ সরু, দেখে মনে হয় একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার এক-হাতে একটা ব্রিফকেস, বগলে দুটো বই। সে-ও হাসছে, তবে হাসিটা যতটা না ব্যঙ্গাত্মক তার চেয়ে অনেক বেশি সকৌতুক। লোকটা সাদাসিধে এবং অত্যন্ত যোগ্য বলে মনে হলো কর্নেলের।
পেছনের দীর্ঘদেহী তরুণের চুল ঢেউ-খেলানো, লাল রঙের। রোদে পোড়া তামাটে চামড়া, চেহারায় পাথুরে মূর্তির মতো শীতল নির্লিপ্ত ভাব স্থির হয়ে আছে। কর্নেলকে বোকা বানানো সহজ নয়, তরুণের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিই তার পরিচয় ফাঁস করে দিল। হেঁটে আসার সময় বাকি দু’জন হ্যাঁঙ্গারের এদিক ওদিক তাকালেও, এই লোক সোজা চেয়ে রয়েছে কর্নেলের চোখের দিকে, যেন জোড়া ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ভেতর দিয়ে দুটো সুর্য কড়া নজর রাখছে তার ওপর।
