ভোর রাত থেকে বিপুল আয়োজনের সাথে তল্লাশির কাজ শুরু হলো। উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বিমানবাহিনীর যতগুলো প্লেন হাতের কাছে পাওয়া গেল, সবগুলোকে তুলে দেয়া হলো আকাশে। দক্ষিণ আটলান্টিকের চার লক্ষ বর্গমাইল জুড়ে অনুসন্ধান চালাবার পরও লেডি ফ্ল্যামবোরোর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না।
যেন সাগর গিলে খেয়ে ফেলেছে জাহাজটাকে।
.
৩৯.
শার্টের ভেতর, বুকে আর পিঠে, একজোড়া হাত নড়াচাড়া করছে। গভীর ঘুম থেকে ধীরে ধীরে সজাগ হলো পিট, স্বপ্ন দেখছে পানির তলা থেকে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে ও, কিন্তু পারছে না। চোখ রগড়াল, দেখল নুমার হেডকোয়ার্টারে ওর জন্য বরাদ্দ করা কামরাতেই একটা কাউচে শুয়ে রয়েছে ও। পুরোপুরি চিৎ হলো, দেখতে পেল সুগঠিত একজোড়া মেয়েলি পা।
কাউচের ওপর উঠে বসল পিট, চোখ পিট পিট করে লিলি শার্পের দুষ্ট হাসিমাখা মুখের দিকে তাকাল। হাতঘড়ি দেখার জন্য কব্জিটা চোখের সামনে তুলল, তারপর মনে পড়ল হাতঘড়ি, মানিব্যাগ আর চাবি ডেস্কে রেখে চোখ বুজেছিল। কয়টা বাজে বলো তো?
সাড়ে পাঁচটা, ফিক করে অকারণ হাসির সাথে বলল লিলি, পিটের কাঁধের ওপর ঝুঁকে ওর ঘাড় আর পিঠের পেশি ডলছে দুই হাতে।
রাত নাকি দিন?
শেষ বিকেল। মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছ।
তোমার কি ঘুম বলে কিছু নেই?
প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় চার ঘণ্টা ঘুমালেই চলে আমার।
মুখের সামনে হাত রেখে হাই তুলল পিট। তোমার ভবিষ্যৎ স্বামীর প্রতি আমার গভীরতম সহানুভূতি রইল।
এখানে কফি দিলাম। পিটের নাগালের মধ্যে টেবিলের ওপর কাপে কফি ঢালল লিলি।
পায়ে জুতো গলিয়ে শার্টের কিনারা ট্রাউজারের ভেতর ঔজল পিট। কম্পিউটর জাদুকর ইয়েজার পেল কিছু?
বলছে তো।
স্থির হয়ে গেল পিটের হাত। নদীটা?
না, ঠিক তা নয়। ইয়েজার ভারি রহস্যময় আচরণ করছে, তবে বলছে তোমার কথাই নাকি ঠিক। কলম্বাস বা ভাইকিংদের আগে নাকি ভেনাটর আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকাল পিট। একি! এ তো নিরেট চিনি!
বিব্রত হলো লিলি। কিন্তু অ্যাল যে বলল, কফিতে তুমি চার চামচ চিনি নাও।
মিথ্যে বলেছে। এক চামচই বেশি হয়ে যায় আমার!
আমি দুঃখিত, মুচকি হেসে বলল লিলি। বোঝা যাচ্ছে, প্র্যাকটিকাল জোকারের পাল্লায় পড়েছিলাম।
তুমিই প্রথম নও, বলে দরজার দিকে পা বাড়াল পিট।
ইয়েজারের ডেস্কে পা তুলে দিয়ে চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে আল জিওর্দিনো। মুখভর্তি স্যান্ডইউ, একহাত দিয়ে নাকের কাছে ধরে আছে টোপোগ্রাফিক ম্যাপটা। ম্যাপে বিশদভাবে দেখানো হয়েছে একটা উপকূল রেখা।
কুঁজো হয়ে বসে আছে হিরাম ইয়েজার, চোখ দুটো লাল, নাকটা কম্পিউটর মনিটরের দিকে তাক করা, একটা প্যাডে খস করে নোট নিচ্ছে। পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ফেরাতে হলো না তাকে স্ক্রিনেই দেখতে পেল কারা ঢুকল কামরায়। বাধাটা টপকানো গেছে, বলার সুরে খানিকটা সন্তুষ্টি প্রকাশ পেল।
কী পেয়েছো? জিজ্ঞেস করল পিট।
সেরাপিসকে গ্রিনল্যান্ডে যেখানে পাওয়া গেছে, সেখান থেকে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে না এগিয়ে, ব্যাঙের মতো আমি একটা লাফ দিই দক্ষিণ দিকে, একেবারে মেইন এ। তার রাফিনাসের বর্ণনার সাথে মিল খুঁজতে শুরু করি।
অমনি কপাল খুলে গেল?
সত্যি গেল। তোমার মনে আছে, রাফিনাস লিখেছে, ভেনাটরকে ফেলে চলে আসার পর একত্রিশ দিন ঝড়ের কবলে পড়েছিল তারা। তারপর একটা নিরাপদ বে খুঁজে পায়, মেরামতের কাজ সারে সেখানে। পরের ঝড়ে তাদের পাল ছিঁড়ে যায়, ভেঙে যায় দাঁড়। দিনের কোনো হিসাব দেয়া হয়নি, ভাসতে ভাসতে একদিন গ্রিনল্যান্ডের খাড়িতে পৌঁছায় জাহাজ। থামল ইয়েজার, একটা বোতামে চাপ দিল, মনিটরে ফুটে উঠল আমেরিকাসহ উত্তর আটলান্টিকের চার্ট। এরপর তার আঙুলগুলো কোড নাম্বারের একটা সিরিজে চাপ দিল। মনিটর স্ক্রিনে ঘোট একটা রেখা ফুটে উঠল, গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূল থেকে ভাঙাচোরা, আঁকাবাঁকা পথ ধরে রওনা হলো সেটা দক্ষিণ দিকে, নিউ ফাউন্ডল্যান্ডকে ঘুরে, নোভা স্কটিয়া আর নিউ ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে, থামল গিয়ে আটলান্টিক সিটির সামান্য ওপরে।
নিউ জার্সি? বিড়বিড় করে উঠল পিট, চেহারায় হতচকিত ভাব।
সঠিকভাবে বললে, বার্নেগ্যাট বে, জানাল জিওর্দিনো। টোপোগ্রাফিক ম্যাপটা নিয়ে এসেছে সে, একটা টেবিলে ফেলে রেড মার্কার দিয়ে উপকূলের একটা অংশকে বৃত্তের মধ্যে আটকাল।
বার্নেগ্যাট বে, নিউ জার্সি? আবার প্রশ্ন করল পিট।
তিনশো একানব্বইয়ে উপকূল রেখা অন্য রকম ছিল, বলল ইয়েজার।
আরও এবড়োখেবড়ো ছিল তীরভূমি, বে ছিল আরও গভীর ও আড়াল পিট।
বে-র বর্ণনা দিতে গিয়ে রাফিনাস খর্বকায় পাইন বনের কথা বলেছে, সেখানে লাঠি দিয়ে খোঁচা দিলেই মিষ্টি পানি বেরিয়ে আসে, মনে আছে? সে রকম বেঁটে পাইন গাছের একটা বন নিউ জার্সিতে রয়েছে। বনভূমির নাম, পাইন ব্যারেন্স, পূর্ব উপকূল থেকে রাজ্যের দক্ষিণ মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃতি ওটার। মাটির ঠিক নিচেই পানি পাওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে লাঠি দিয়ে খোঁচা মারো, পানি পাবে।
আশার কথা, সতর্ক মন্তব্য করল পিট। কিন্তু রাফিনাস তো স্টোন ব্যালাস্ট-এর কথাও বলেছিল।
ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। তাই আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর-এর একজন আর্কিওলজিস্টকে ডাকি আমি। সে আমাকে পাথরের একটা খনি দেখিয়ে দেয়, ফলে ধরে নিতে পারি সেরাপিসের ক্রুরা ঠিক ওই জায়গাতেই নেমেছিল।
