কিন্তু তাকে যদি আমরা সশস্ত্র অবস্থায় দেখি?
সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলল কর্নেল। তাহলে তো জানতেই পারলে লোকটা সিকিউরিটি এজেন্ট। আন্তর্জাতিক যেকোনো ব্যাপার কূটনৈতিকদের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। পরিষ্কার?
আর কোনো হাত উঠল না।
অফিসারদের বিদায় করে দিয়ে বন্দর মাস্টারের বিল্ডিংয়ে চলে এল কর্নেল হোসে রোয়েস, এখানেই অস্থায়ী অফিস দেয়া হয়েছে তাকে। মেশিন থেকে কাপে কফি ঢালছে, পাশে এসে দাঁড়াল তার এইড।
ক্যাপটেন ফ্লোরেস, ন্যাভাল অ্যাফেয়ার্স, বলল সে। জানতে চাইছে আপনি তার সাথে দোতলায় দেখা করতে পারবেন কি না।
কেন, বলেছে?
বলল জরুরি।
হাতে কফির কাপ, সিঁড়ি না ধরে এলিভেটরে চড়ে নিচে নামল কর্নেল রোয়েস। তার জন্য দোতলায় অপেক্ষা করছে ক্যাপটেন ফোরেস, পরনে নেভির ধবধবে সাদা ইউনিফর্ম। কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে কর্নেলকে পথ দেখিয়ে রাস্তায় বের করে আনল সে, রাস্তা পেরিয়ে ঢুকল বড়সড় একটা দোচালার ভেতর। পানি থেকে উদ্ধার করা বোট ইত্যাদি রাখা হয় এখানে। ভেতরে ঢুকে কর্নেল দেখল, কয়েকজন লোক তোবড়ানো, ভাঙা কিছু টুকরো পরীক্ষা করছে। টুকরোগুলো কোনো বোটের অংশ হতে পারে বলে মনে হলো তার।
তার সাথে কার্লোস আর লুই শাভেজের পরিচয় করিয়ে দিল ক্যাপটেন ফোরেস। টুকরোগুলো একটা বিধ্বস্ত ইয়টের বলে সন্দেহ করছে ওরা। চ্যানেলে পেয়েছে। ওদের ধারণা, বড় কোনো জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবে গেছে ইয়টটা।
ইয়ট অ্যাক্সিডেন্টের ঘটনা, বলল কর্নেল, স্পেশাল সিকিউরিটি কেন মাথা ঘামাতে যাবে?
বন্দর মাস্টার ছোটখাটো মানুষটা, স্নান গলায় বলল, শীর্ষ সম্মেলন চলছে, দুর্ঘটনাটা শোকের ছায়া ফেলতে পারে। অকুস্থলে রেসকিউ বোট পাঠানো হয়েছে। এখনও জীবিত কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ইয়টের পরিচয় জানতে পেরেছেন?
উনি একটা টুকরো পেয়েছেন, বন্দর মাস্টার চোখ-ইশারায় লুই শাভেজকে দেখল। ইয়টের একটা নেমপ্লেট। তাতে লোলা লেখা রয়েছে।
মাথা নাড়ল কর্নেল রোয়েস। আমি সৈনিক। প্রমোদতরীর সাথে পরিচয় নেই। নামটার কি বিশেষ কোনো তাৎপর্য আছে?
লোলা হলো ভিক্টর রিভেরার স্ত্রীর নাম, ক্যাপটেন ফোরেস বিড়বিড় করে বলল। আপনি তাঁকে চেনেন, কর্নেল?
আড়ষ্ট হয়ে গেল কর্নেল। আইনসভার স্পিকারকে চিনব না! ইয়টটা কি তার?
তার নামে রেজিস্ট্রি করা, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ক্যাপটেন ফোরেস। ইতিমধ্যে আমরা তাঁর সেক্রেটারির সাথে বাড়িতে যোগাযোগ করেছি। কোনো তথ্য দিইনি। শুধু জানতে চেয়েছি মি. রিভেরার কোথায় আছেন বলতে পারবে কি না। মেয়েটা জানাল, সে শুধু জানে আর্জেন্টিনিয়ান, ও ব্রাজিলিয়ান ডিপ্লোম্যাটদের সম্মানে নিজের ইয়টে তিনি একটা পার্টি দিচ্ছেন।
কতজন? জানতে চাইল কর্নেল রোয়েস, বুকের ভেতর মাথাচাড়া দিচ্ছে একটা আতঙ্ক।
মি. রিভেরার আর তাঁর স্ত্রী, তেইশজন অতিথি, আট-দশজন সব মিলিয়ে ত্রিশ-বত্রিশজন।
নাম?
বাড়িতে সেক্রেটারি কোনো তালিকা রাখেনি। তাকে আমি স্পিকারের অফিসে খোঁজ করতে বলেছি।
একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে কর্নেল হোসে রোয়েস বলল, তদন্তের দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলে ভালো হয়।
সাথে সাথে ক্যাপটেন ফোরেস প্রস্তাব দিল, নেভি যেকোনো সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত।
বন্দর মাস্টারের দিকে ফিরল কর্নেল। জাহাজটার নাম কী?
সেটা একটা রহস্য। গত দশ ঘণ্টায় বন্দরে কোন জাহাজ আসা-যাওয়া করেনি।
আপনাকে না জানিয়ে কোনো জাহাজের পক্ষে আসা সম্ভব?
পাইলটকে না ডেকে সে চেষ্টা করা নেহাৎই বোকামি হবে ক্যাপটেনের।
সম্ভব কি না? আবার জিজ্ঞেস করল কর্নেল।
না, দৃঢ়কণ্ঠে জানাল বন্দর মাস্টার। আমি জানতে পারব না অথচ একটা জাহাজ নোঙর ফেলল, সম্ভব নয়।
মেনে নিল কর্নেল। আর নোঙর তুলে বেরিয়ে যাওয়া?
প্রশ্নটা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল বন্দর মাস্টার। তারপর মাথা ঝাঁকাল সে। আমাকে না জানিয়ে ভক থেকে কেউ যেতে পারবে না। তবে জাহাজটা যদি তীর থেকে দূরে নোঙর ফেলে থাকে, যদি জাহাজটার ত্রুর আর ক্যাপটেনের কছে চ্যানেলটা পরিচিত হয়, আর তারা যদি কোনো আলো না জ্বালে-হা, কারও চোখে ধরা না পড়ে খোলা সাগরে বেরিয়ে যেতে পারে।
নোঙর করা জাহাজের তালিকা, বলল কর্নেল, ক্যাপটেন ফোরেসের হাতে কতক্ষণের মধ্যে দিতে পারবেন?
দশ মিনিটের ভেতর।
ক্যাপটেন ফোরেস?
কর্নেল।
নিখোঁজ জাহাজ নেভির মাথাব্যথা, কাজেই আমার ধারণা, তদন্তের দায়িত্বটা আপনি নিলে ভালো হয়।
ধন্যবাদ, কর্নেল। কাজ দেখাবার সুযোগ পেয়ে খুশি হলো ক্যাপটেন ফোরেস। এক্ষুনি শুরু করছি আমি।
থমথমে চেহারা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল কর্নেল হোসে রোয়েস। জানে, আজ রাতে আকাশ ভেঙে পড়বে মাথায়
মাঝরাতের খানিক আগে কর্নেলকে রিপোর্ট দিল ক্যাপটেন। ইতোমধ্যে বন্দর ও চ্যানেলের বাইরের জলসীমায় তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালিয়েছে সে। রিপোর্টে বলা হলো, একটা মাত্র জাহাজকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেটার নাম লেডি ফ্ল্যামবোরো।
লেডি ফ্ল্যামবোরোর ভিআইপি প্যাসেঞ্জার লিস্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল কর্নেল যোয়েস। সাথে সাথে একটা ফলোআপ ইনভেস্টিগেশনের নির্দেশ দিল সে, মনে ক্ষীণ ভঙ্গুর আশা যে মেক্সিকো ও মিসরের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহাসচিব তীরে কোথাও রাত কাটানোর জন্য জাহাজ ত্যাগ করে থাকতে পারেন। গভীর রাতে নেতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া গেল। জাহাজের সাথে তারাও নিখোঁজ হয়েছেন। সেই সাথে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল, লেডি ফ্ল্যামবোরোকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসবাদীরা।
