না, ভুল শুনিনে। বুড়ো লুই শাভেজ শার্টের আস্তিন দিয়ে দাঁড়ি মুছল, অলসভঙ্গিতে থ্রটল টেনে কমিয়ে আনল বোটের গতি। মন-মেজাজ আজ তার দারুণ ভালো। রোজ বেরোলেও, সব দিন মাছ পাওয়া যায় না। আজও অবশ্য হোল্ড মাত্র অর্ধেক ভরেছে, তবে জালে ধরা পড়েছে বিভিন্ন ধরনের সব দামি মাছ, হোটেল-রেস্তে ব্লার শেফ-রা যেকোনো দামে কিনতে রাজি হবে ওগুলো। আনন্দে এরই মধ্যে দু বোতল বিয়ার গিয়ে ফেলেছে বুড়ো।
পাপা, পানিতে কি যেন দেখতে পাচ্ছি!
কোথায়?
হাত তুলল কার্লোস। পোর্ট বো ছাড়িয়ে। ভাঙা বোটের অংশ হতে পারে।
রাতে আজকাল বুড়ো ভালো দেখতে পায় না। তারপর রানিং লাইটের ধরা পড়ল, ভাঙা টুকরোগুলো। তার মধ্যে অনেকগুলোই সাদা রং করা কাঠ। অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করল বুড়ো, ওগুলো শুধু একটা ভাঙা ইয়টের অংশ হতে পারে। বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত হয়েছে? নাকি সংঘর্ষে? পোর্টের সবচেয়ে কাছের আলোটাও দুকিলোমিটার দূরে, বিস্ফোরণ ঘটলে তীর থেকে শুনতে পাবার কথা। অথচ চ্যানেলে কোনো রেসকিউ বোটের আলো দেখা যাচ্ছে না।
ইয়টের ভাঙাচোরা টুকরোগুলো ভাসছে, সেগুলোর মাঝখানে ঢুকে পড়ছে ফিশিং বোট, এই সময় আবার সেই আওয়াজটা শুনতে পেল বুড়ো জেলে। প্রথমে যেটাকে চিৎকার বলে মনে হয়েছিল, এখন সেটাকে ফোঁপানোর শব্দ মনে হলো। এবার একেবারে কাছ থেকে ভেসে এল।
গ্যালি থেকে রাউল, জাস্টিরো আর ম্যানুয়ালকে ডেকে আনো। জলদি, বাপ, জলদি! ওদের বলো, উদ্ধার করার জন্য পানিতে নামতে হবে।
ছুটল কার্লোস। গিয়ার লিভার স্টপ-এ টেনে আনল বুড়ো লুই শাভেজ। হুইলহাউস থেকে বেরিয়ে এসে বোতাম টিপে স্পটলাইট জ্বালা সে, ধীরে ধীরে পানিতে ঘোরাল আলোটা।
বিশ মিটার দূরেও নয়, চওড়া কেটা তক্তা দেখল লুই শাভেজ, সন্দেহ নেই কোনো ইয়টেরই ভাঙা ডেক। টুকরোটার ওপর জড়াজড়ির করে রয়েছে দুটো দেহ। একজন পুরুষ, তার বোধ হয় জ্ঞান নেই। দ্বিতীয়জন নারী, পুরুষটাকে এক হাতে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, আলোর দিকে ফির অপর হাতটা ঘন ঘন নাড়ল সে, পা ছুড়ল পানিতে, উন্মাদিনীর মতো চিৎকার শুরু করল।
শান্ত হও! অভয় দিল বুড়ো লুই শাভেজ। ভয় পেয়ো না! আমরা আসছি! ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ পেয়ে পেছন ফিরল সে। ছুটে এসে দুপাশে ভিড় করল ত্রুরা।
কিছু দেখতে পাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করল লুইস।
একটা তক্তার ওপর দু’জন বেঁচে আছে। ওদেরকে ভোলার জন্য প্রস্তুতি নাও।
আজ কেউ আমরা পানিতে নামছি না। একজন মাল্লা বলল শান্ত স্বরে।
তার বলার সুরে এমন একটা কিছু ছিল, ঝট করে তক্তাটার দিকে ফিরল লুই শাভেজ। লম্বা ফি দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল তার বুক। মেয়েটা বুকের সাথে আরও জোরে চেপে ধরেছে পুরুষটাকে, আতঙ্কে বিস্ফোরিত চোখ জোড়া রাক্ষুসে হাঙরের কুৎসিত মাথার ওপর স্থির।
মস্ত চোয়ালটা খুলছে আর বন্ধ করছে হাঙর, তার কুতকুতে চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে পানিতে নেমে আসা মেয়েটার পায়ের ওপর। বুড়ো লুই শাভেজ শিউরে উঠল, ইচ্ছে হলো মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু পারল না। আর্তনাদ করে উঠল মেয়েটা, চোয়ালের মাঝখানে তার পা আটকে নিয়ে নিচের দিকে টানছে হাঙর। এরপর যে দৃশ্যটা বুড়ো দেখল, জীবনে কখনও ভুলবে না। তক্তা থেকে অর্ধেক নেমে গেছে মেয়েটা, বুঝতে পারছে বাঁচার কোনো আশা নেই। বুক থেকে পুরুষটাকে ফেলে দিল সে, দুহাত দিয়ে ঠেলে তক্তার কিনারা থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল অজ্ঞান দেহটাকে, হাঙর যাতে তার নাগাল না পায়। পরমুহূর্তে সরাৎ করে পানির নিচে তাকে টেনে নিল হাঙর। ভারসাম্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ায় তক্তাটা কাত হলো সামনের দিকে, গড়িয়ে পানিতে নেমে গেল অজ্ঞান দেহটাও। এক ঝাঁক হাঙর ঝাঁপিয়ে পড়ল দু’জনের ওপর।
.
এর প্রায় ঘণ্টাখানেক পর।
ব্যাটল ড্র পরা একদল অফিসারের সামনে কর্নেল হোসে রোয়েস দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন খাড়া একটা লোহার রড। উরুগুয়ের সামরিক স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট হবার পর ব্রিটেনে গিয়ে রণকৌশলের ওপর ট্রেনিং নিয়েছে সে, সেই থেকে হাতে একটা খাটো ছড়ি রাখা অভ্যাস পরিণত হয়েছে, এটা তার আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
একটা টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কর্নেল, টেবিলের ওপর পান্টা ডেল এসটে শহরের একটা মডেল, সাগর-সৈকতসহ। অফিসারদের উদ্দেশে কথা বলছে সে, ডক এলাকায় টহল দেব আমরা তিন দলে ভাগ হয়ে, প্রতি দলে চারজন করে লোক, প্রতি পালায় আট ঘণ্টা করে ডিউটি।
কথা বলার সময় নাটকীয় ভঙ্গিতে হাতের তালুতে ছড়ির বাড়িয়ে মারছে। মনে রাখতে হবে, ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করছি আমরা, সন্ত্রাসবাদীরা হামলা করেছে শুনলেই অকুস্থলে ছুটে যাবার জন্য প্রতি মুহূর্তে তৈরি থাকতে হবে। জানি, লোকের চোখে ধরা না পড়ে টহল দিয়ে বেড়ানো কঠিন, তবু চেষ্টা করে যাও। রাতের বেলা ছায়ার ভেতর থাকবে, দিনের বেলা ভিড়ের মধ্যে মিশে যাবে। ট্যুরিস্টদের আমরা ভয় পাওয়াতে চাই না, তারা যেন আবার ভেবে না বসে যে উরুগুয়ে একটা পুলিশি রাষ্ট্র। কোনো প্রশ্ন?
লেফটেন্যান্ট এডুরাডো ভেজকুইজ হাত তুলল। কর্নেল?
এডুরাড়ো?
কাউকে দেখে যদি সন্দেহ হয়, কি করব আমরা?
কিছুই করবে না, শুধু তার কথা রিপোর্ট করবে। হয়তো দেখা যাবে লোকটা ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্টদের একজন।
