হর্ন বাজিয়ে সতর্ক করো ওদের, তাড়াতাড়ি অনুরোধ করলেন তিনি। সময় থাকতে ওদেরকে সরে যাবার একটা সুযোগ দাও।
অবজ্ঞার সাথে চুপ করে থাকল সুলেমান আজিজ।
দুঃসহ সেকেন্ডগুলো পেরিয়ে যেতে লাগল। একসময় সবাই উপলব্ধি করল, সংঘর্ষ অবধারিত। ইয়টের ডেকে যারা নাচানাচি করছে বা যে লোকটা হেলমের দায়িত্বে রয়েছে, কেউ তারা টের পায়নি অন্ধকারের ভেতর থেকে ইস্পাতের তৈরি প্রকাণ্ড একটা দানব তাদের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছে।
অমানবিক! হাঁপিয়ে উঠলেন কলিন্স। এ স্রেফ অমানবিক!
ইয়টের স্টারবোর্ড সাইডে সরাসরি বোর ধাক্কা মারল লেডি ফ্ল্যামবোরো। বড় কোনো ঝুঁকি লাগল না। লেডি ফ্ল্যামবোরোর চারতলা সমান উঁচু বোর নিচে চাপা পড়ে গেল ইয়ট। সামান্য একটু কাঁপুনি অনুভব করল ব্রিজে দাঁড়ানো লোকজন। বোর নিচে চাপা পড়ো ইয়ট পানির নিচে নেমে গেছে, মাঝখান থেকে দুটুকরো হয়ে গেছে আগেই।
ফরওয়ার্ড ব্রিজে রেইলিং ধরে থরথর করে কাঁপছেন ক্যাপটেন কলিন্স, ইয়টের ভাঙাচোরা অংশ লেডি ফ্ল্যামবোরোর পাশ দিয়ে ভেসে যেতে দেখছেন তিনি, নারীকণ্ঠের করুণ আর্তনাদ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন। কোনো একটা অংশও পঞ্চাশ মিটার যেতে পারল না, তার আগেই ডুবে গেল। লেডি ফ্ল্যামবোরোর পেছনে আলোড়িত পানিতে লাশ ভাসতে দেখলেন তিনি।
হতভাগা মাত্র কয়েকজন আরোহী ইয়ট থেকে ছিটকে পড়েছে দূরে, সাঁতার কেটে আরও দূরে সরে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে তারা। তাদের মধ্যে যারাহত, সাঁতার কাটতে পারবে না, কিছু একটা ধরার জন্য হাতড়াচ্ছে চারদিকে। হঠাৎ অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা।
ইউ খুনি হারামজাদা! চিৎকার করে উঠল মাইকেল ফিনি, এক দলা থুথু ছুঁড়ে দিল সুলেমান আজিজের দিকে।
ন্যায়-অন্যায় বিচার করার মালিক একা শুধু আল্লাহ, শান্তভাবে, নির্লিপ্ত সুরে বলল সুলেমান আজিজ। মাইকেল ফিনি-র খুলি থেকে অটোমেটিকটা সরিয়ে নিল সে। চ্যানেল থেকে বেরোবার পর হেডিং হবে ওয়ান-ফাইভ ডিগ্রি ম্যাগনেটিক। অটোমেটিক পাইলট এনগেজ করবে।
রেলিং ছেড়ে সুলেমান আজিজের দিকে ফিরলেন ক্যাপটেন। ফর গডস সেক, সি রেসকিউ সার্ভিসকে রেডিও মেসেজ পাঠাও। কয়েকজনক এখনও বাঁচানো যাবে।
না।
রেসকিউ সার্ভিসকে নিজের পরিচয় না দিলেও পারো তুমি।
মাথা নাড়ল সুলেমান আজিজ। আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? রেসকিউ সার্ভিস দুর্ঘটনার রিপোর্ট দেবে না সিকিউরিটি ফোর্সকে? আমাদের অনুপস্থিতি টের পেতে এক ঘণ্টাও লাগবে না তদন্ত টিমের। দুঃখিত, ক্যাপটেন, কোথাও কোনো খবর পাঠানো যাচ্ছে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পান্টা ডেল এসটে থেকে দূরে সরে যেতে চাই আমি।
কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে সুলেমান আজিজের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কলিন্স। তারপর তিনি জানতে চাইলেন, জাহাজ ফেরত পাবার আগে আর কী দেখতে হবে আমাদের?
আপনারা যদি আমার কথা শোনেন, আপনাদের কারও কোনো ক্ষতি হবে না।
আর প্যাসেঞ্জারদের? প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো আর প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান? তাদের স্টাফ? ওদের জন্য কী ভেবেছ তুমি?
শেষ পর্যন্ত ওরা মুক্তি পাবে, টাকার বিনিময়ে।
কিন্তু আমার তা মনে হচ্ছে না, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন ক্যাপটেন। তুমি টাকা। পাবার আশায় ওদেরকে কিডন্যাপ করোনি।
চোখে বিদ্রূপ নিয়ে হাসল সুলেমান আজিজ। জাহাজ চালাতে জানেন, আবার মানুষের মনও পড়তে পারেন?
দেখেই চেনা যায়, বললেন ক্যাপটেন, তোমার লোকজন সবাই মধ্যপ্রাচ্যের। আমার ধারণা, আমার মিসরীয় অতিথিদের তুমি খুন করতে চাও।
গলা ছেড়ে হেসে উঠল সুলেমান আজিজ। তারপর সে বলল, মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন একমাত্র আল্লাহ! আমি শুধু নির্দেশ পালন করি।
তোমার নির্দেশের উৎস কী?
সুলেমান আজিজ জবাব দেয়ার আগে ব্রিজ স্পিকার থেকে যান্ত্রিক একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, জিরো টু-থারটি-তে হন্দেভো, কমান্ডার।
পোর্টেবল ট্রান্সমিটারে মেসেজের প্রাপ্তির স্বীকার করল সুলেমান আজিজ। তারপর ক্যাপটেনের দিকে তাকাল। আলোচনা সময় নেই, ক্যাপটেন। সকালের মধ্যে অনেক কাজ সারতে হবে আমাদের।
কিন্তু আমার জাহাজের কি হবে? জেদের সুরে প্রশ্ন করলেন ক্যাপটেন। আমার জাহাজ আর ক্রুদের সম্পর্কে অবশ্যই জানতে হবে আমাকে।
হ্যাঁ, সে অধিকার আপনার আছে, আরেক দিকে ফিরে বিড়বিড় করল সুলেমান আজিজ, যেন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে সে। কাল সন্ধ্যায় এই সময়, আন্ত র্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো রিপোর্ট করবে, লেডি ফ্ল্যামবোরোকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবাই ধরে নিতে বাধ্য হবে, সমস্ত প্যাসেঞ্জার আর ক্রু নিয়ে জাহাজটা দুশো ফ্যাদম পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
.
৩৮.
কিছু শুনতে পেলে, কার্লোস? বুড়ো জেলে শক্ত হাতে ধরে আছে প্রাচীন ফিশিং বোটের মরচে ধরা হুইলটা, কোঁচকানো চেহারায় উদ্বেগ।
কানের পাশে হাত রেখে বোর সামনে অন্ধকারের ভেতর তাকাল ছেলে। একটু পর হেসে উঠে বলল সে, তোমার কান আমার চেয়ে ভালো, পাপা। আমি শুধু আমাদের ইঞ্জিনের আওয়াজ পাচ্ছি।
ভুল শুনলাম? বিড়বিড় করল বুড়ো। মনে হলো যেন একটা মেয়ের গলা। বাঁচাও! বাঁচাও!
মেয়ের গলা? মুখের হাসি নিভে গেল ছেলের। আরেকবার সামনে তাকাল সে। তারপর কাঁধ ঝাঁকালো৷ কউ, আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।
