অথচ তোমার কম্পিউটর কোনো মিল দেখাতে পারছে না।
সেটা কম্পিউটরের দোষ নয়, কারণ ষোলোশ বছরে জমিন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
আচ্ছা, ভেনাটর উত্তর-পূর্ব দিকে অর্থাৎ কৃষ্ণসাগরের দিকে যেতে পারেন না? প্রশ্নটা লিলির।
রাফিনাস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যেতে আটান্ন দিন লেগেছিল তাদের, বলল জিওর্দিনো।
চুরুট ধরিয়ে অ্যাডমিরাল বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু জাহাজ বহর যদি খারাপ আবহাওয়ায় পড়ে থাকে? ওই সময়ের মধ্যে হয়তো হাজার মাইলও পেরোতে পারেনি।
তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকল, কোনো সমাধান আসছে না। এমন সময় পিট বলল, এমন কি হতে পারে না, ভেনাটর তার জাহাজবহর নিয়ে পশ্চিমে, এই আমেরিকায় এসেছিলেন?
লিলি পিটের বিপক্ষে বলল, আমেরিকার সাথে কলম্বাসের আগে আর কেউ যোগাযোগ করেছিল, এমন আর্কিওলজিকাল রেকর্ড নেই, পিট।
প্রথম কথা, সেরাপিসকে দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়, দূরের পথ পাড়ি দেয়ার মতো করেই ওটাকে তৈরি করা হয়, বলল পিট। মায়ান আর্ট ও কালচারের কথাই ধরো, এশিয়া আর ইউরোপের আর্ট ও কালচারের সাথে এমন সব মিল আছে, এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার শুধু একার নয়, অনেকেরই ধারণা, কলম্বাসের আগে আমেরিকায় আরও অনেকেই এসেছিল।
আর্কিওলজিস্টরা তোমার কথায় কান দেবে না, পিট, বলল লিলি।
অ্যাডমিরাল প্রস্তাব দিলেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে-পিটের যুক্তিটাও পরীক্ষা করে দেখা যাক।
ইয়েজার জানতে চাইল, কোথাকার তীর তুমি দেখতে চাও হে?
গাল চুলকাল পিট। দুদিন দাড়ি কামানো হয়নি। গ্রিনল্যান্ড খড়ি থেকে শুরু করো, দক্ষিণ দিকে এগিয়ে পানামায় এসো। চার্ট প্রজেকশনের দিকে তাকিয়ে আছে ও। ওখানে কোথাও লাইব্রেরিটা থাকতেই হবে।
.
৩৭.
ব্রিজ ব্যারোমিটার আঙুলের একটা টোকা দিলেন ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স। তীর। থেকে আসা অস্পষ্ট আলোয় কাঁটাটা কোনোমতে দেখা গেল। মনে মনে হতাশ হলেন তিনি। আবহাওয়া শান্ত থাকবে। যদি ঝড় উঠত, ভাবলেন তিনি, জাহাজ নিয়ে বন্দর ত্যাগ করা সম্ভব হতো না। ক্যাপটেন কলিন্স প্রথমশ্রেণীর নাবিক হলেও, মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে তার ভালো ধারণা নেই।
নব্বই নট বেগে বাতাস বইলেও লেডি ফ্ল্যামবোরোকে নিয়ে খোলা সাগরে বেরোবে সুলেমান আজিজ। ব্রিজ উইন্ডোর পেছনে, ক্যাপটেনের সিটে বসে আছে সে, টান টান হয়ে আছে পেশিগুলো, জুলফি আর মাথার পেছনের চুল থেকে গড়িয়ে পড়া ঘামের ধারা মুছছে বার বার।
স্যাঁতসেঁতে ব্রিজে হেলম-এর দায়িত্ব নিয়েছে আতঙ্কবাদীদের একজন, চোখে প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দু’জন সশস্ত্র লোক ব্রিজের দরজা পাহারা দিচ্ছে, তাদের অস্ত্র ক্যাপটেন আর ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি-র দিকে তাক করা। দু’জনেই ওরা দাঁড়িয়ে আছে সুলেমান আজিজের হেলমসম্যানের পাশে।
জোয়ার আসার পর নোঙরের মাথায় ঘুরে গেছে লেডি ফ্ল্যামবোরো, বন্দর এন্ট্রান্সের দিকে মুখ করে রয়েছে জাহাজ। চোখে বাইনোকুলার তুলে শেষ একবার বন্দরের চারদিকটা দেখে নিল সুলেমান আজিজ, তারপর একটা হাত তুলে সঙ্কেত দিল মাইকেল ফিনিকে, কথা বলল পোর্টেবল রেডিওতে। তৈরি হও, এক্ষুনি, নির্দেশ দিল সে।
রাগে বিকৃত হয়ে আছে মাইকেল ফিনি-র চেহারা ঝট করে ক্যাপটেনের দিকে ফিরল সে। স্নান চেহারা নিয়ে ক্যাপটেনের শুধু মৃদু কাঁধ ঝাঁকালেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে নোঙর তোলার নির্দেশ দিল ফার্স্ট অফিসার।
দুমিনিট পর কালো পানি থেকে জাহাজে উঠে এল নোঙর। হুইলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও স্পোক ধরার কোনো চেষ্টা করল না হেলমসম্যান। আধুনিক জাহাজ সাধারণত শুধু খারাপ আবহাওয়ায় ম্যানুয়ালি চালানো হয়, কিংবা পাইলটের সাহায্যে কোনো বন্দর ত্যাগ করার সময় বা বন্দরে ঢোকার সময়। লেডি ফ্ল্যামবোরোয় রয়েছে অটোমেটিক কন্ট্রোল সিস্টেম, বোম টিপে সব কাজ সমাধা করা হয়। দায়িত্বে রয়েছে ফাস্ট অফিসার, রাডার স্ক্রিনের ওপরও তীক্ষ্ণ একটা চোখ রেখেছে সে।
হাইজ্যাক করা জাহাজটাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে সুলেমান আজিজ। সন্ধ্যার পর চারদিকে গাঢ় হয়ে নেমেছে অন্ধকার, প্রমোদতরীর কাঠামোটা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে শুধু অপর তীরের আলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে। কী ঘটে যাচ্ছে কেউ লক্ষ করল না। ধীরগতিতে এগোল ফ্ল্যামবোরো, সাবধানে অন্যান্য নোঙর করা জাহাজগুলোকে পাশ কাটিয়ে এল। চ্যানেলে বেরিয়ে এসে ঘুরে গেল খোলা সাগরের দিকে।
ব্রিজ ফোনের রিসিভার তুলে নিয়ে কমিউনিকেশন রুমের সাথে যোগাযোগ করল সুলেমান আজিজ। কিছু বলার আছে? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে।
এখনও কিছু ঘটছে না, তার একজন অনুচর জবাব দিল, উরুগুয়ে নেভির পেট্রল বোটগুলোর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি মনিটর করছে সে।
কোনো সঙ্কেত পেলেই ব্রিজ স্পিকারে রিলে করবে।
জি, জনাব।
ছোট একটা বোট আমাদের বো-র সামনে দিয়ে পার-হচ্ছে, জানাল মাইকেল ফিনি। আমাদের দিক বদলাতে হবে।
অটোমেটিক পিস্তলের মাজলটা মাইকেল ফিনি-র খুলির গোড়ায় চেপে ধরল সুলেমান আজিজ। কোর্স আর স্পিড় যা আছে, তাই থাকবে।
ধাক্কা লাগবে! প্রতিবাদ করল মাইকেল ফিনি। আমাদের আলো নেই, ওরা আমাদের দেখতে পাচ্ছে না!
উত্তরে মাজলটা আরও জোরে চেপে ধরল সুলেমান আজিজ।
ক্রমশ এগিয়ে আসছে বোটটা, লেডি ফ্ল্যামবোরো থেকে সবাই তারা পরিষ্কার দেখতে পেল ওটাকে। বেশ বড় একটা মোটর ইয়ট, লম্বায় চল্লিশ মিটারের কম হবে না, আন্দাজ করলেন ক্যাপটেন কলিন্স। চওড়া হবে আট মিটার। খুব সুন্দর দেখতে, উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে। ইয়টে সম্ভবত জমজমাট পার্টি চলছে, ডেকে প্রচুর লোকজন, বাজনার তালে তালে একদল নারী-পুরুষ নাচছে। রাডার অ্যান্টেনা ঘুরছে না দৈখে শিউরে উঠলেন কলিন্স।
