ফাইল বন্ধ করে অবশেষে চুরুটটা ধরালেন ডেইল নিকোলাস। কী যেন তার চোখে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েনি, সেজন্য অস্বস্তিবোধ করছেন। চিন্তা করতে গিয়ে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন! না, ধরা পড়েনি নয়, কী যেন একটা পরিচিত বলে মনে হয়েছে তাঁর। ফাইলটা আবার খুলে ইয়াজিদের ফটোগ্রাফ দেখলে। ক্যামেরার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে সে।
হঠাৎ করে ব্যাপারটা উপলব্ধি করলেন তিনি। খুবই সহজ একটা ব্যাপার, কিন্তু মহা বিস্ময়কর! তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে ফোনের রিসিভার তুলে নিলেন ডেইল নিকোলাস। সরাসরি একটা লাইন পাবার জন্য কোড় করা নম্বরে চাপ দিলেন। ডেস্কের গায়ে আঙুল নাচাচ্ছেন, অপরপ্রান্ত থেকে সাড়া পাওয়া গেল।
সিআইএ হেডকোয়ার্টার।
সিআইএ প্রধান, মার্টিন ব্রোগান-এর গলা চিনতে পারলেন ডেইল নিকোলাস। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তুমি এখনও অফিসে আছ।
মার্টিন ব্রোগান-ও ডেইল গলা চিনতে পারলেন। কী ব্যাপার, ডেইল? তোমাকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে? ইয়াজিদের ফাইলটা পেয়েছো?
হ্যাঁ, ধন্যবাদ, বলল ডেইল নিকোলাস। ফাইলটা পড়তে গিয়েই তো একটা সন্দেহ ঢুকল মনে। তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?
নিশ্চয়ই, কী ব্যাপার?
দু সেট ব্লাড টাইপ আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দরকার আমার।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট?
হ্যাঁ।
আজকাল আমরা জেনেটিক কোড আর ডিএনএ ট্রেসিং ব্যবহার করি, মার্টিন ব্রোগান জানালেন। নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে, ডেইল?
ভাবনাগুলো গুছিয়ে নেয়ার জন্য চুপ করে থাকলেন ডেইল নিকোলাস, তারপর বললেন, কারণটি যদি তোমাকে বলি, ঈশ্বরের দিব্যি, আমাকে তুমি বদ্ধ উন্মাদ ভাববে!
ভুলে যেয়ো না, রাগের সুরে বলল হিরাম ইয়েজার, আমরা মোলোশো বছরের পুরনো একটা ট্রেইল খুঁজছি। কম্পিউটর তো আর অতীতে গিয়ে দেখে আসতে পারে না কেমন ছিল সেটা।
শিল্পকর্মগুলো দেখলে ড. গ্রোনকুইস্ট হয়তো একটা ধারণা দিতে পারতেন, বলল লিলি।
পিট বলল, খানিক আগে তাঁর সাথে আমার রেডিওতে কথা হয়েছে। নুমার অ্যামফিথিয়েটারে বসে রয়েছে ওরা, পিট বসেছে ওদের দুসারি চেয়ে সিটে, বা দিক ঘেঁষে। তার ধারণা, ভূমধ্যসাগরের বাইরে কোথাও আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি থাকতে পারে না।
একটা চিত্রে ফুটে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর, তাতে তীরের উত্থান-পতন ও ভাজগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। স্টেজের ওপর একটা স্ক্রিন জুড়ে রয়েছে সাগরতলের বৈশিষ্ট্য। গভীর ধ্যানমগ্ন দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সবাই। সবাই, শুধু একজন বাদে।
অ্যাডমিরাল স্যানডেকার যখন ছোট্ট অ্যামফিথিয়েটারে ঢোকেন, অ্যাল জিওর্দিনো তাড়াতাড়ি চুরুটটা লুকিয়ে ফেলে। সেই থেকে বারবার তার হাতের দিকে চোরা চোখে তাকাচ্ছেন তিনি। একসময় আর থাকতে পারলেন না, ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ওটা কী?
আমাকে কিছু বলছেন, বস?
তোমার হাতে ওটা কি?
জ্বি? বিব্রত বোধ করল জিওদিনো। জ্বি, একটা চুরুট।
এত লম্বা? অবাক হলেন অ্যাডমিরাল। বেশ দামি সিগার।
জ্বি-না। নাম জানি না।
কোত্থেকে পেলে? রীতিমতো জেরা শুরু করলেন স্যানডেকার।
বাল্টিমোরের একটা দোকান থেকে কিনেছি।
আর কোনো সন্দেহ থাকল না অ্যাডমিরালের, জিওর্দিনোই তার চুরুট চুরি করছে। চুরিটা অনেক দিন থেকেই হচ্ছে, কিন্তু কে করছে বা কীভাবে করছে ধরা যাচ্ছিল না। বক্স থেকে প্রতি সপ্তাহয় দুটো করে চুরুট খোয়া যায়। ঠিক আছে, মনে মনে ভাবলেন অ্যাডমিরাল, কে চুরি করছে তা যখন জানা গেছে, কীভাবে চুরি করছে তাও সময়মতো জানা যাবে।
হ্যাঁ, কি যেন বলছলে তুমি? পিটকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
আমরা ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, বলল পিট।
তুমি বলতে চাও, আরও একটা দৃষ্টিকোণ থাকতে পারে? প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরে প্রশ্ন করল হিরাম ইয়েজার।
দিকনির্দেশনা না থাকায় কাজটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলল লিলি।
দুঃখজনক হলো রাফিনাস তার দৈনন্দিন পজিশন বা কতটা পথ পাড়ি দিল সে সম্পর্কে কিছু লেখেনি, অ্যাডমিরাল হতাশা ব্যক্ত করলেন।
তার ওপর কড়া নির্দেশ ছিল, কিছু রেকর্ড করা যাবে না।
তবে কি তখনকার দিনে পজিশন জানা থাকলে নির্দিষ্ট একটা জায়গা খুঁজে বের করতে পারত তারা? জিওর্দিনো জিজ্ঞেস করল।
মাথা ঝাঁকাল লিলি। গ্রিক হিপারচাস, খ্রিস্টের জন্মের একশো ত্রিশ বছর আগে, ল্যান্ডমার্ক-এর পজিশন নির্ধারণ করতেন ওগুলোর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর পেছনে ফেলে আসা ল্যান্ডমার্কের দূরত্ব আন্দাজ করে।
রিডিং গ্লাসটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে, ফ্রেমের ওপর দিয়ে পিটের দিকে তাকালেন অ্যাডমিরাল। তোমার চোখের উদভ্রান্ত দৃষ্টি আমি চিনি। কী যেন বিরক্ত করছে তোমাকে।
সীটের ওপর নড়েচড়ে বসল পিট। এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি আমরা, কিন্তু আসল লোকটার কথা ভুলে বসে আছি। স্মাগলিংয়ের প্ল্যানটা ছিল তার।
জুনিয়াস ভেনাটর?
তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, একজন বেপরোয়া আবিষ্কারক ও গবেষক। অন্যান্য পণ্ডিতরা যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে সাহস পেতেন না, তিনি বিশেষ করে সেসব বিষয়ে মাথা ঘামাতেন। সমস্যাটাকে এভাবে চিন্তা করতে হবে-আমরা যদি ভেনাটর হতাম, আমাদের সময়কার লাইব্রেরি সম্পদ কোথায় নিয়ে গিয়ে লুকাতাম আমরা?
এখনও আমি বলব আফ্রিকায়, দৃঢ়তার সাথে জানাল ইয়েজার। পূর্বতীরের কোথাও।
