লোকজন মারা যাবে উপলব্ধি করে মনে মনে প্রমাদ গুনলেন তিনি।
নিঃশব্দে একটা হাত বাড়িয়ে হে’লা কামিলের কাঁধে রাখলেন, চাপ দিলেন মৃদু, তারপর চরকির মতো আধপাক ঘুরে সুলেমান আজিজের দিকে ফিরলেন। খোদার নামে বলছি, কী করছো তুমি জানো?
অবশ্যই জানি। খুব ভালো করে জানি। সিনেটরের মুখের ওপর হাসল সুলেমান আজিজ। আল্লাহর আমার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ হেঁটেছেন। উপরি পাওনা হিসেবে পেয়েছি জাতিসংঘ মহাসচিবকে। সঙ্গে মার্কিন সিনেটর।
বিশাল কামরার ভেতর গমগম করে উঠল সিনেটরের ভারী গলা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসেছ, হে। নিজেদের ভালো চাইলে, এখনও সময় আছে, পালিয়ে যাও। তা না হলে পস্তানোরও সময় পাবে না।
তাই না কি? কিন্তু আমি সফল হবই!
অসম্ভব!
ধৈর্য ধরুন, নিজের চোখেই দেখতে পাবেন সব।
.
৩৬.
বিকেল পাঁচটার খানিক পর অফিস থেকে বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেইল নিকোলাস, এই সময় সিআইএ হেডকোয়ার্টার থেকে তার সাথে দেখা করতে এল এক লোক। কিথ ফার্কার কে তিনি চেনেন, সিআইএ চিফের বিশেষ প্রতিনিধি। বলার অপেক্ষায় না থেকে একটা চেয়ারে বসল সে, হাতের ব্রিফকেসটা কোলের ওপর ফেলে প্রথমে তারা খুলল, তারপর একটা বোম টিপে ভেতরে লুকানো বিস্ফোরক আপাতত অকেজো করল। কেস থেকে মোটা একটা ফাইল বের করে ডেইল সামনে ডেস্কের ওপর রাখল সে।
চিফ আপনাকে বলতে বলেছেন, আখমত ইয়াজিদ সম্পর্কে নিরেট তথ্য পাওয়া দুষ্কর জন্ম, পিতা-মাতা, পূর্ব-পুরুষ, লেখাপড়া, বিয়ে, বাচ্চাকাচ্চা, কিংবা আইনগত কোনো ব্যাপার, তা ক্রিমিনালই হোক বা সিভিল, বলতে গেলে এ-সবের প্রায় কোনো অস্তিত্বই নেই। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সূত্র থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাও লোকজনকে, মানে তাকে যারা একসময় চিনত বলে দাবি করে তাদের জিজ্ঞেস করে। দুর্ভাগ্য যে তারা সবাই, কোনো না কোনো কারণে ইয়াজিদের শক্ত হয়ে ওঠে। কাজেই তাদের বক্তব্য নিরপেক্ষ মনে করা যায় না।
আপনাদের সাইকোলজিকাল সেকশন কী বলছে? জিজ্ঞেস করলেন ডেইল নিকোলাস।
তারা আবছা একটা প্রোফাইল তৈরি করেছে। তাকে ঘিরে আছে সিকিউরিটির দুর্ভেদ্য দেয়াল। আখমত ইয়াজিদ মানেই একটা রহস্য। তার আশপাশের লোকজনের সাথে সাংবাদিকরা কথা বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর সবাই তারা শুধু কাঁধ ঝাঁকায়, মুখ খোলে না।
রহস্য আরও বাড়ে।
নিঃশব্দে হাসল কিথ ফার্কার। চিফ বলছেন, ছলনাময় মরীচিকা।
ফাইলটা নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ, বার্নস, ডেইল নিকোলাস বললেন। হ্যাভ আ নাইস ইভনিং।
ইউ টু, বলে বিদায় নিল কিথ ফার্কার।
ডেইলের সেক্রেটারি বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল দরজা। বাক্স থেকে একটা চুরুট বেছে নিয়ে দাঁতের ফাঁকে খুঁজলেন ভদ্রলোক, কিন্তু ধরালেন না। ফাইলটা খুলে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলেন।
কিথ ফার্কার কিছু বাড়িয়ে বলেনি। ফাইলটা যথেষ্ট মোটা হলেও তাতে শুধু হতো ছয় বছরের তথ্যই বেশি, আখমত ইয়াজিদ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার আগের দীর্ঘ সময় সম্পর্কে লেখা হয়েছে মাত্র ছোট্ট একটা প্যারাগ্রাফ। আখমত ইয়াজিদ প্রথম খবর হয়ে ওঠে ছোট্ট একটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে। কায়রোর একটা পাঁচতারা হোটেলের সামনে ভুখানাঙ্গা কিছু লোক অবস্থান ধর্মঘট শুরু করে, সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়, কারণ লোকগুলোকে সেই নেতৃত্ব দিচ্ছিল। কাগজে লেখা হয়, সে নাকি বেশ কিছুদিন থেকে নোংরা বস্তি এলাকায় নিয়মিত বক্তৃতা দিয়ে আসছিল।
আখমত ইয়াজিদের দাবি, কায়রো শহরের একপ্রান্তে, যেখানে দুনিয়ার আবর্জনা ফেলা হয়, তার পাশে ছোট্ট একটা মাটির ঘরে তার জন্ম। পরিবারের সদস্যরা কোনো দিন খেতে পেত, কোনো দিন পেত না। অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগে তার দুই বোন আর বাবা মারা যায়। ছেলেবেলায় তার স্কুলে যাওয়া হয়নি, কৈশোরে মৌলভীদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করে সে, যদিও কেউ তারা তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। আখমত ইয়াজিদ আরও দাবি করে, দুনিয়ার শেষ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ (স) তাকে দেখা দেন এবং তার সাথে কথা বলেন। তিনিই নাকি তাকে আদেশ দিয়ে বলেছেন, ঈমানদার লোকদের সাথে নিয়ে মিসরকে ইউরোপিয়ান ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা।
অদ্ভুত সুন্দর ভাষণ দিতে পারে সে। শ্রোতারা তার কথার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যায়। শ্রোতাদের ধর্মীয় আবেগ উসকে দিতেও তার জুড়ি নেই। তার দাবি, পশ্চিমা দর্শন মিসরের সামাজিক/অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
মুখে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করলেও, একাধিক ঘটনা থেকে আভাস পাওয়া যায় যে তার ধর্মীয় আন্দোলনের স্বার্থে সন্ত্রাসী তৎপরতার আশ্রয় প্রায়ই সে নিয়ে থাকে। একটা ঘটনায় এয়ারফোর্সে একজন জেনারেল খুন হন। আরেক ঘটনায় নিহত হন কায়রো ইউনিভার্সিটির চারজন অধ্যাপক, তারা ইসলামী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পক্ষে বক্তব্য রাখছিলেন। তৃতীয় ঘটনায় ভাগ্যক্রমে কেউ মারা যায়নি, সোভিয়েত দূতাবাসের সামনে বিস্ফোরিত হয় একটা ট্রাক। তদন্ত চালাতে গিয়ে দেখা গেছে প্রতিটি ঘটনার পেছনে গোপনে জড়িত ছিল আখমত ইয়াজিদ। নিশ্চিতভাবে কিছু প্রমাণ করা সম্ভব না হলেও, মুসলমান সূত্রের মাধ্যমে সিআইএ জানতে পেরেছে প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে খুন করার জন্য একটা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আখমত ইয়াজিদ। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য, জনতা তাকে চায়, এ কথা বলে সরকারকে উৎখাত করা।
