.
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে এই সময় এক পশলা ঝির ঝির বৃষ্টি ঝরিয়ে উত্তর দিকে সরে গেল এক টুকরো মেঘ। পান্টা ডেল এসটে শহর ও বন্দর নবরূপে সাজতে বসেছে, জ্বলে উঠেছে আলোগুলো। বন্দরের সবগুলো জাহাজ আলোকমালায় সাজানো। শুধু একটা বাদে।
তবে মাত্র একজনই ব্যাপারটা লক্ষ করলেন।
লেডি ফ্ল্যামবোহোর অস্পষ্ট কাঠামো ছাড়া আর কিছু দেখতে না পেয়ে বিস্মিত হলেন সিনেটর জর্জ পিট। লেডি ফ্ল্যামবোরোর পেছনে আরও একটা জাহাজ রয়েছে, উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত সেটা, সেই আলোর আভায় কোনো রকমে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে দেখতে পেলেন তিনি।
একটা লঞ্চে রয়েছেন সিনেটর পিট। লেডি ফ্ল্যামবোরোকে শুধু অন্ধকার নয়, পরিত্যক্ত বলে মনে হলো তার। জাহাজটার বো-র সামনে দিয়ে এগোল লঞ্চ, বোর্ডিং স্টেয়ার-এর পাশে এসে থামল।
হাতে শুধু একটা ব্রিফকেস, হালকা ছোট্ট লাফ দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামলেন তিনি। মাত্র দুটো ধাপ বেয়ে উঠেছেন, লঞ্চটা ঘুরে গিয়ে ডকের দিকে ফিরতি পথে রওনা হয়ে গেল। ডেকে পৌঁছে দেখলেন, তিনি একা। কোথাও মারাত্মক কিছু একটা ঘটেছে। প্রথমে তার ধারণা হলো, ভুল করে অন্য কোনো জাহাজে উঠে পড়েছেন।
শব্দ আসছে শুধু সুপাস্ট্রাকচারের দিক থেকে, সম্ভবত একটা স্পিকার সিস্টেম অন করা হয়েছে। খোলের গভীর থেকে জেনারেটরের গুঞ্জন শোনা গেল। তাছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঘুরলেন তিনি, গলা চড়িয়ে লঞ্চটাকে ডাকবেন, কিন্তু এরই মধ্যে বেশ অনেকটা দূরে চলে গেছে সেটা। এই সময় হঠাৎ করে কালো জাম্পস্যুট পরা একটা মূর্তি ঘনছায়া থেকে বেরিয়ে এল, হাতের অটোমেটিক রাইফেলটা সরাসরি সিনেটর পিটের তলপেট লক্ষ্য করে ধরা।
এটা কি লেডি ফ্ল্যামবোরো নয়? জিজ্ঞেস করলেন সিনেটর পিট।
কে আপনি? পাল্টা প্রশ্ন হলো কণ্ঠস্বর এত সতর্ক ও নিচু যে কোনো রকমে শুনতে পেলেন সিনেটর পিট। কী বললেন, সিনেটর পিট আপনি? আমেরিকান? কিন্তু আপনাকে আমরা আশা করছি না।
প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান জানেন আমি আসব, গম্ভীর সুরে বললেন সিনেটর পিট, রাইফেলটা যে তার দিকে তাক করা রয়েছে তা যেন তিনি দেখেও দেখছেন না। তবে এরই মধ্যে তিনি সতর্ক হয়ে গেছেন, রাইফেল ধরার ভঙ্গিটাই তাঁকে বলে দিয়েছে ওটার পেছনে দাঁড়ানো লোকটা প্রফেশনাল। আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন, বললেন তিনি, অনেকটা নির্দেশের সুরেই।
তীর থেকে আসা আলোয় চকচক করে উঠল গার্ডের চোখ, সন্দেহের দোলায় দুলছে সে। আপনার সাথে আর কেউ এসেছে?
না, আমি একা।
আপনাকে তীরে ফিরে যেতে হবে।
মাথা ঝাঁকিয়ে লঞ্চটাকে দেখিয়ে দিলেন সিনেটর পিট। আমার বাহন চলে গেছে।
মনে হলো ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করছে গার্ড। অবশেষে রাইফেলের ব্যারেল নিচু করল সে, কয়েক পা হেঁটে একটা দরজার সামনে থামল। খালি হাত লম্বা করে ব্রিফকেসটার দিকে ইঙ্গিত করল সে। এখানে, ফিসফিস করে বলল। হাতের কেসটা আমাকে দিন।
এতে সরকারি ডকুমেন্ট আছে, শান্তভাবে বললেন সিনেটর পিট, সেটা আরও শক্ত করে ধরে গার্ডকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে দরজার দিকে এগোলেন।
ভারী, কালো পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে সিনেটর পিট দেখলেন, বিশাল একটা ডাইনিং সেলুনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। কামরাটা চারকোনা, দুহাজার বর্গমিটারের কম হবে না। ভেতরে প্রচুর লোকজন, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে কারও পরনে বিজনেস স্যুট, কেউ পরে আছে ক্রু ইউনিফর্ম; সবাই তারা মুখ ফিরিয়ে একযোগে তাঁর দিকে তাকাল, টেনিস ম্যাচে তিনি যেন একটা বল।
চারদিকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে নজন লোক, মারমুখো থমথমে চেহারা সবার, প্রত্যেকের পরনে কালো জাম্পস্যুট, পায়ে কালো জিগং শু, প্রত্যেকে তার হাতের অটোমেটিক রাইফেল বন্দিদের দিকে অনবরত ঘোরাচ্ছে।
স্বাগতম, স্টেজের ওপর, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো লোকটা বলল, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল কামরার ভেতর। সশস্ত্র নজনের মতো একই কাপড় আর জুতো পরেছে সে, পার্থক্য শুধু আর কারও মুখে মুখোশ নেই। আপনার পরিচয় দিন প্লিজ।
কী ঘটছে এখানে? কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করলেন সিনেটর পিট।
আপনি কি দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন? ঠাণ্ডা ভদ্রতার সাথে জিজ্ঞেস করল সুলেমান আজিজ।
আমি সিনেটর জর্জ পিট, কংগ্রেস সদস্য। বললেন সিনেটর পিট, মিসরের প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানের সাথে কথা বলার জন্য এসেছি। আমাকে বলা হয়েছে, তিনি এই জাহাজে আছেন।
একটু কষ্ট করে তাকালে দেখতে পাবেন, সামনের সারিতেই বসে আছেন তিনি।
স্টেজে দাঁড়ানো সুলেমান আজিজের দিক থেকে সিনেটর পিট চোখ সরালেন না। সবার দিকে এই লোকগুলো রাইফেল তাক করে আছে কেন?
বুঝতে পারছেন না? বিস্ময় প্রকাশ করল সুলেমান আজিজ। লেডি ফ্ল্যামবোরোকে হাইজ্যাক করা হয়েছে।
প্রচণ্ড রাগে এক সেকেন্ডের জন্য দিশেহারা বোধ করলেন সিনেটর পিট। নিজেকে সামলে নিয়ে সুলেমান আজিজের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর এমন দৃঢ়তার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তাতে শুধু তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞাই প্রকাশ পেল। সামনের সারিতে বসা লোকগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। এগোলেন।
ক্যাপটেন কলিন্স আর তার অফিসারদের পাশ কাটিয়ে এলেন সিনেটর পিট, তাদের পাশে বসে থাকতে দেখলেন প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান ও প্রেসিডেন্ট দো। লরেঞ্জোকে। তারপর হে’লা কামিলকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
