যদি না কেউ কাছ থেকে দেখে।
কাঁধ ঝাঁকাল সুলেমান আজিজ। খোলা সাগরে পৌঁছুতে মাত্র এক ঘণ্টা লাগবে আমাদের। দিনের আলো ফোঁটার আগে উরুগুয়ে সিকিউরিটি বন্দরের বাই সার্চ করবে না।
মেক্সিকান আর মিসরীয় সিকিউরিটি এজেন্টদের যদি সরাতেই হয়, এক্ষুনি আমাদের কাজ শুরু করা দরকার, বলল ইবনে।
তোমরা সবাই তোমাদের অস্ত্রে সাইলেন্সর লাগিয়েছো তো?
বুঝতেই পারবে না যে গুলি হয়েছে, মনে হবে হাততালির শব্দ।
কঠিন দৃষ্টিতে ইবনের দিকে তাকাল সুলেমান আজিজ। চুপিচুপি, নিঃশব্দে ইবনে। যেভাবেই হোক আলাদা করো ওদেরকে, প্রতি বার একজনকে শেষ করতে হবে। কোনো রকম চিৎকার বা ধস্তাধস্তি হওয়া চলবে না। জাহাজ থেকে পালিয়ে গিয়ে কেউ যদি তীরে উঠে পুলিশকে জানায়, আমরা মারা পড়ব। ব্যাপারটা তোমার লোকজন ভালোভাবে বুঝেছে কি না নিশ্চিত হও।
সবাইকে সব বলা আছে, জনাব। আরেকবার সাবধান করে দেব আমি।
আখমত ইয়াজিদের নুন খাচ্ছি আমরা, কথাটা যেন কেউ না ভোলে। তার ঋণ শোধ করার সময় হয়েছে। আমরা তাকে মিসরের শাসক হিসেবে দেখতে চাই।
.
প্রথমে মরতে হবে মিসরীয় সিকিউরিটি এজেন্টদের। সুলেমান আজিজের ভুয়া ইনস্যুরেন্স-সিকিউরিটি এজেন্টদের আতঙ্কবাদী হিসেবে সন্দেহ করার কোনো কারণ ঘটেনি, প্রতিপক্ষদের তারা সহজেই ভুলিয়া-ভালিয়ে খালি প্যাসেঞ্জার সুইটগুলোয় নিয়ে আসতে পারল। শুরু হলো নিমর্ম হত্যাযজ্ঞ।
একজন সিকিউরিটি এজেন্টকে বলা হলো, তাদের একজন কর্মকর্তা ফুড পয়জনিংয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, জাহাজের ক্যাপটেন ভাবছেন তার উপস্থিতি দরকার। খালি প্যাসেঞ্জার স্যুইটের দোরগোড়া পেরোনো মাত্র দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো, এক হাত দূর থেকে গুলি করা হলো তা হৃৎপিণ্ডে। এভাবে কোনো না কোনো বিশ্বাস্য অজুহাত দেখিয়ে কেবিন থেকে এক এক করে বের করে আনা হলো তাদের। কাজ ভাগ করা আছে, সাথে সাথে মেঝে থেকে মুছে ফেলা হলো সমস্ত রক্ত, এক এক করে পাশের কামরায় জমা হতে লাগল লাশগুলো।
এরপর মেক্সিকান সিকিউরিটি এজেন্টদের পালা। প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোর দু’জন গার্ডের মনে সন্দেহ দেখা দিল, প্যাসেঞ্জার স্যুইটে ঢুকতে অস্কীকৃতি জানাল তারা। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্যও তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা। তর্ক বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে চারজন লোক ঘিরে ধরল দু’জনকে, ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে ছোরা মারা হলো পেটে আর বুকে। খালি প্যাসেজওয়েতে লুটিয়ে পড়ল তারা, চিৎকার করার সুযোগ হলো না।
একজন দু’জন করে সিকিউরিটি এজেন্টদের সংখ্যা কমতে লাগল। একসময় লাশের সংখ্যা দাঁড়াল বারোয়। বাকি থাকল দু’জন মিসরীয় আর তিনজন মেক্সিকান গার্ড, সবাই তারা যার যার নেতার স্যুইটের বাইরে পাহারা দিচ্ছে।
চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে, ক্যাপটেনের সাদা ইউনিফর্ম খুলে ফেলে কালো উলের একটা জাম্পস্যুট পরল সুলেমান আজিজ। ক্যাপটেনের অবয়বও ত্যাগ করল সে, তার বদলে পরল ভাঁড়ের একটা মুখোশ। ভারী একটা বেল্ট জড়াল কোমরে, তাতে দুটো অটোমেটিক পিস্তল আর একটা পোর্টেবল রেডিও আটকানো রয়েছে। নক করে কেবিনে ঢুকল ইবনে।
দারুণ, তোমার ওপর আমি খুশি, বলল সুলেমান আজিজ। ইবনের দিকে একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল সে। এখন আর গোলযোগের ভয় করার দরকার নেই। চালাও হামলা, তবে তোমার লোকদের সতর্ক থাকতে বলো। আমি চাই প্রেসিডেন্ট হাসান বা প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জোর দুর্ঘটনায় মারা পড়ন।
মাথা ঝাঁকিয়ে দোরগোড়া পর্যন্ত হেঁটে গেল ইবনে, বাইরে দাঁড়ানো নিজের লোককে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল। তারপর আবার ফিরে এসে সুলেমান আজিজের সামনে দাঁড়াল সে। ধরে নিন, জাহাজ সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
ক্যাপটেন কলিসের ডেস্কের খানিকটা ওপরে একটা ক্রোনোমিটার রয়েছে, ইঙ্গিতে সেটা দেখল সুলেমান আজিজ। সাঁইত্রিশ মিনিটের মধ্যে রওনা হব আমরা। জাহাজের প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে সব কজন প্যাসেঞ্জার এক জায়গায় জড় করো! ইঞ্জিন-রুম ক্রুদের তৈরি থাকতে বলো, যাতে আমি নির্দেশ দিলেই জাহাজ রওনা হতে পারে। বাকি সবাইকে জড় করো মেইন ডাইনিং সেলুনে।
কথা না বলে দাঁড়িয়ে থাকল ইবনে, নিঃশব্দ হাসিতে ফলের মতো ফেটে পড়ল তার চেহারা, বেরিয়ে বত্রিশটা দাঁত। তারপর সে বলল, আল্লাহ আমাদেরকে সাত রাজার ধন দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন।
সত্যি আশীর্বাদ করেছেন কি না আজ থেকে পাঁচ দিন পর জানা যাবে।
আপনাকে আমি একশো ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, জনাব-সত্যি তিনি আমাদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। মেয়েলোকটাকে আমরা হাতে পেয়েছি।
মেয়েলোক? কার কথা বলছ তুমি?
হে’লা কামিল।
প্রথমে বুঝতে পারল না সুলেমান আজিজ। তারপর বিশ্বাস করতে পারল না। হে’লা কামিল? কী বলছ? সে এই জাহাজে?
দশ মিনিটও হয়নি জাহাজে পা রেখেছে, জনাব, ঘোষণা করল একলা, হাসতে হাসতে তার ফর্সা চেহারা লালচে হয়ে উঠল। মহিলা ক্রুদের কোয়ার্টার রেখেছি তাকে, কড়া পাহারায়।
আল্লাহ সত্যি পরম দয়ালু! কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ল সুলেমান আজিজের মাথা।
তিনি মাকড়সার কাছে পতঙ্গ পাঠিয়েছেন, জনাব, চাপা স্বরে বলল ইবনে। আখমত ইয়াজিদের নামে তাকে খুন করার আবার একটা সুযোগ পেয়ে গেছেন আপনি।
