আহা, সবটুকু আগে শোনোই না। শুধু ওগুলো নয়, প্লাস্টিকের বিশাল আকারের অনেকগুলো রোলও আমরা তুলেছি।
প্লাস্টিক?
প্লাস্টিক আর প্রকাণ্ড আকারের অনেকগুলো ফাইবারবোর্ড, বলল পারকার। অন্ত ত কয়েক কিলোমিটার তো হবেই। লোডিং ডোর দিয়ে বহু কষ্টে ঢোকানো গেছে। ভেতরে গুজতেই বেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা।
জোন্স তার খালি গ্লাসের দিকে আধবোজা চোখে তাকিয়ে থাকল। তোমার কি ধারণা, কোম্পানি ওগুলো নিয়ে কী করবে?
চোখে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকাল পারকার, কপাল কুঁচকে উঠল। কী জানি! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
৩৫. সূর্য ওঠার খানিক পর
৩৫.
সূর্য ওঠার খানিক পরই পৌঁছে গেল মিসরীয় ও মেক্সিকোন সিকিউরিটি এজেন্টরা। জাহাজে ওঠার সাথে সাথে কাজ শুরু করল তারা। প্রথমে বিস্ফোরকের খোঁজে তল্লাশি চালালো জাহাজের প্রতিটি কোণে, তারপর সম্ভাব্য আততায়ীকে খুঁজে বের করার জন্য ক্রুদের রেকর্ড চেক করল। পাকিস্তানি ও ভারতীয় ক্রু অল্প কয়েকজন, বেশির ভাগই ব্রিটিশ, তাদের কারও মিসর বা মেক্সিকো সরকারের শত্রুতা নেই।
সুলেমান আজিজসহ আতঙ্কবাদী গ্রুপের সবাই অনর্গল স্প্যানিশ বলতে পারে, সিকিউরিটি এজেন্টদের প্রতি অত্যন্ত সহযোগিতার মনোভাব দেখল তারা। প্রত্যেকের কাছে ভুয়া ব্রিটিশ পাসপোর্ট আর ইনস্যুরেন্স-সিকিউরিটি ডকুমেন্ট রয়েছে, চাওয়ামাত্র দেখাতে ইতস্তত করল না।
প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো জাহাজে পৌঁছুলেন আরও খানিক পর। ছোটখাটো মানুষটার বয়স হয়েছে, পাকা চুল কটাও ঝরো ঝরো, চোখ জোড়া বেদনাকাতর, বুদ্ধিজীবীসুলভ তীক্ষ্ণ চেহারা।
প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জোকে অভ্যর্থনা জানাল সুলেমান আজিজ, মাইকেল কলিঙ্গের ভূমিকায় তার অভিনয় চমৎকার উতরে গেল। জাহাজের অর্কেস্ট্রা মেক্সিকোর জাতীয় সঙ্গীত বাজাল, তারপর মেক্সিকোর নেতা আর তাঁর স্টাফকে পথ দেখিয়ে পৌঁছে দেয়া হলো লেডি ফ্ল্যামবোয়রার স্টারবোর্ড সাইডে, যার যার আলাদা স্যুইটে।
দুপুরের খানিক পর জাহাজের গায়ে এসে ভিড়ল অদ্ভুত সুন্দর একটা ইয়ট। ইয়টের মালিক একজন মিসরীয় কোটিপতি, রফতানি তার প্রধান ব্যবসা। ইয়ট থেকে লেডি ফ্ল্যামবোরোয় পা রাখলেন প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান। ভদ্রলোকের বয়স যাই হোক, চুলে পাক ধরলেও, চেহারা আর স্বাস্থ্য দেখে মনে হবে এখনও তিনি যৌবনকে ধরে রাখতে পেরেছেন। তাঁর হাড়গুলো চওড়া, চামড়ার নিচে অতিরিক্ত মেদ জমতে দেননি, দাঁড়াবার ভঙ্গিটা টান টান।
মিসরের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলো। তারপর অতিথিদের পৌঁছে দেয়া হলো পোর্ট সাইডের স্যুইটে।
তৃতীয় বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশজন সরকারপ্রধান পান্টা ডেল এসট শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন। কেউ কেউ তাদের জাতীয় নাগরিকদের কেন প্রাসাদতুল্য অট্টালিকায় উঠেছেন, কেউ পাঁচতারা হোটেলে, আবার কেউ বা তীর থেকে দূরে নোঙর করা প্রমোদতরীতে।
রাস্তা ও রেস্তোরাঁগুলো আগন্তুক কূটনীতিক আর সাংবাদিকে ভরে উঠল। হঠাৎ করে চলে আসা বিদেশি ব্যক্তিত্বের এই ভিড় সামলাতে পারবে কি না ভেবে উরুগুয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। এমনিতেই এসময়টায় পান্টা ডেল এসটে-তে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য জাতীয় সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সাধ্যমতো সব কিছু করলেও, মানুষের বিরতিহীন মিছিলে তাদের উপস্থিতি নগণ্য হয়ে পড়ল। প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় যানজট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগল ছাড়াতে। সব দায়িত্ব কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে অবশেষে তারা শুধু সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তার দিকটা দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো।
স্টারবোর্ড ব্রিজ উইংয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুলেমান আজিজ, চোখে বাইনোকুলার, তাকিয়ে আছে শহরের দিকে। চোখ থেকে সেটা একবার নামিয়ে হাতঘড়ি দেখল সে।
পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্বস্ত ভক্ত ও বন্ধু ইবনে। আপনি কি রাত নামার অপেক্ষায় আছেন?
তেতাল্লিশ মিনিট পর সূর্য ডুববে, না তাকিয়েই বিড়বিড় করে বলল সুলেমান আজিজ।
পানিতে বড় বেশি ব্যস্ততা, বলল ইবনে। বন্দরের চারদিকে ছোটোছুটি করছে ছোট ছোট অসংখ্য বোট, একটা হাত তুলে দেখল সে। প্রায় প্রতিটি বোটে সাংবাদিকরা রয়েছে, ডেকে দাঁড়িয়ে হৈচৈ করছে তারা-সরকারপ্রধানদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে
মেক্সিকান বা মিসরীয় ডেলিগেট, যারা প্রেসিডেন্টদের স্টাফ, শুধু তাদেরকে জাহাজে উঠতে দেবে, ইবনেকে নির্দেশ দিল সুলেমান আজিজ। আর কেউ যেন উঠতে না পারে।
আমরা বন্দর ত্যাগ করার আগে কেউ যদি তীরে যেতে চায়?
অনুমতি দেবে, বলল সুলেমান আজিজ। জাহাজের রুটিন স্বাভাবিক থাকা চাই। শহরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আমাদের উপকারে আসবে। ওরা যখন খেয়াল করবে আমরা নেই, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষকে বোকা মনে করা ঠিক নয়। সন্ধ্যার পর আমাদের আলো না জ্বললে খোঁজ নেবে ওরা।
ওদের জানানো হবে আমাদের মেইন জেনারেটর মেরামত করা হচ্ছে। আরেকটা প্রমোদতরীর দিকে হাত তুলল সুলেমান আজিজ, তীর থেকে আরও খানিক দূরে লেডি মেরেয়েটা আর ধনুক আকৃতির পেনিনসুলার মাঝখানে নোঙর ফেলেছে সেটা। ওটার আলো তীর থেকে মনে হবে আমাদের আলো।
