একটা চেয়ার আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বসে আছেন ক্যাপটেন, হাত আর পা চেয়ারের সাথে বাঁধা, চোখে আগুন ঝরা দৃষ্টি। তুমি একটা নর্দমার কীট!
তোমরা ব্রিটিশরা, জুতসই গাল দিতেও জানো না! হেসে উঠল সুলেমান আজিজ। আমেরিকানরা এ ব্যাপারে ওস্তাদ। তারা চার অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করে যা বলে তারচেয়ে খারাপ খিস্তি আর হয় না।
তুমি আমার ক্রুদের কোনো সাহায্য পাবে না।
কিন্তু আমি যদি আমার লোকদের অর্ডার দিই, আপনার মহিলা ক্রুদের গলা কেটে সাগরে ফেলে দিতে? এদিকের পানিতে হাঙর আছে তা তো আপনি জানেনই।
হাত-পা বাঁধা থাকলেও, রাগের মাথায় সুলেমান আজিজের দিকে লাফিয়ে পড়তে চাইল মাইকেল ফিনি। তার তলপেটে রাইফেলের মাজল চেপে ধরে বাঁধা দিল গার্ড চেয়ারে পিছিয়ে গেল ওয়েট, ব্যথায় কুঁচকে উঠল তার চেহারা।
ক্যাপটেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সুলেমান আজিজের দিকে। যা খুশি করতে পারো তুমি, টেরোসিস্টদের সাথে কোনো সহযোগিতার প্রশ্ন ওঠে না, দৃঢ়কণ্ঠে বললেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদী বলুন আর যাই বলুন, প্রথম শ্রেণীর প্রফেশনাল আমরা, শান্তভাবে ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাউকে খুন করার কোনো ইচ্ছেই আমাদের নেই। টাকা চাই, আর তাই আমরা প্রেসিডেন্ট হাসান ও প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকে আটক করব। আপনারা যদি বাধা হয়ে না দাঁড়ান, দুই সরকারের সাথে একটা সমঝোতায় আসব আমরা, টাকা নিয়ে চলে যাব।
সুলেমান আজিজের মুখোশ আঁটা চেহারা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন ক্যাপটেন কলিন্স, লোকটা মিথ্যে বলছে কিনা বুঝতে চাইছেন। তার মনে হলো, লোকটা সত্যি কথাই বলছে। ভদ্রলোকের জানা নেই, সুলেমান আজিজের রয়েছে দুর্লভ অভিনয় প্রতিভা।
তা না হলে তুমি আমার ক্রুদের খুন করবে?
তাদের সাথে আপনাকেও।
কী চাও তুমি?
প্রায় কিছুই না। মি. পারকার আর মি. জোন্স আমাকে ক্যাপটেন কলিন্স বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। কিন্তু আমার দরকার ফাস্ট অফিসারের সার্ভিস। আপনি তাকে আমার নির্দেশ মানার হুকুম দিন।
কেন, মি, ফিনির সার্ভিস কেন দরকার তোমার?।
আপনার কেবিনে ডেস্ক ড্রয়ারটা খুলে অফিসারদের পার্সোনাল রেকর্ড পড়েছি আমি, বলল সুলেমান আজিজ। মি. মাইকেল ফিনি এদিকের পানি সম্পর্কে জানেন।
ঠিক কী চাইছ?
একজন পাইলটকে জাহাজে ডাকার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না, ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাল সন্ধের পর হেলম-এর দায়িত্ব ফিনিকে নিতে হবে, জাহাজটাকে চালিয়ে চ্যানেল থেকে বের করে নিয়ে যাবেন উনি খোলা সাগরে।
শান্তভাবে প্রস্তাবটি বিবেচনা করলেন ক্যাপটেন। খানিক পর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। বন্দর কর্তৃপক্ষ খবর পাওয়ামাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দেবে, ক্রুদের তোমরা খুন করার ভয় দেখাও আর নাই দেখাও।
টের পাবে না। কালো রং করা একটা জাহাজ কালো রাতে অনায়াসে কর্তৃপক্ষের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে।
কতদূর যেতে পারবে বলে মনে করো? দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে লেডি ফ্ল্যামবোরোর একশো মাইল ঘিরে চারদিকে গিজগিজ করবে পেট্রল বোট।
তারা আমাদের খুঁজে পাবে না, আশ্বস্ত করার সুরে বলল সুলেমান আজিজ।
সামান্য অস্থির দেখাল ক্যাপটেনকে। বললেই তো হবে না! লেডি ফ্ল্যামবোয়রার মতো একটা জাহাজকে কেউ লুকিয়ে ফেলতে পারে না।
সত্যি কথা, বলল সুলেমান আজিজ, সবজান্তর হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। অন্যের বেলায় সত্যি। কিন্তু আমি এটাকে গায়েব করে দিতে পারি।
কাল সকালে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান, নিজের কেবিনে বসে নোট লিখছে আইজ্যাক জোন্স। দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল হারবার্ট পারকার। ক্লান্ত সে, ইউনিফর্ম ঘামে ভিজে আছে।
ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল জোন্স। লোডিং ডিউটি শেষ হলো?
হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।
ঘুমোবার আগে এক ঢোক চলবে নাকি?
তোমার স্কটিশ মল্ট হুইস্কি?
ডেস্ক ছেড়ে উঠল আইজ্যাক জোন্স, ড্রেসারের দেরাজ থেকে একটা বোতল বের করল। দুটে গ্লাসে হুইস্কি ভরে ফিরে এল সে। ব্যাপারটাকে এভাবে দেখো-ভোররাতে নোঙর পাহারা দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছ।
কার্গো লোডিংয়ের চেয়ে সেটাই ভালো ছিল, ক্লান্ত সুরে বলল মার্টিন। তোমার কি খবর?
এই মাত্র ডিউটি শেষ হলো।
তোমার পোর্টে আলো না দেখলে ভেতরে ঢুকতাম না।
সকালের অনুষ্ঠানটা সুন্দর হওয়া চাই, তাই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো লিখে রাখছিলাম।
ফিনিকে কোথাও দেখতে পেলাম না, তাই ভাবলাম তোমার সাথেই কথা বলি।
এই প্রথম জোন্স লক্ষ করল পারকারের চেহারায় কেমন যেন একটা দিশেহারা ভাব। কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমার?
গলায় হুইস্কি ঢেলে খালি গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকল পারকার। এ ধরনের কার্গো আগে কখনও তুলিনি আমরা। এটা একটা প্রমোদতরী, তাই না?
এ ধরনের কার্গো মানে? কী তুলেছ তোমরা? কৌতূহলী হয়ে উঠল জোন্স। চুপচাপ বসে থাকল পারকার, শুধু এদিক ওদিক মাথা নাড়ল। তারপর মুখ তুলে তাকাল সে, বলল, পেইন্টিং গিয়ার। এয়ার কমপ্রেসার, ব্রাশ, রোলার আর পঞ্চাশটা ড্রাম-বোধ হয় রং ভর্তি।
রং? জোন্স দ্রুত জিজ্ঞেস করল। কী রং?
মাথা নাড়ল পারকার। তা বলতে পারব না। ড্রামের লেখাগুলো স্প্যানিশ।
এর মধ্যে আশ্চর্য হবার কী আছে? রিফিটের সময় লাগবে মনে করে কোম্পানি ওগুলো হাতের কাছে রাখতে চাইতে পারে।
