অনুসন্ধান শেষ করে কাস্টমস অফিসাররা বিদায় নিল। কলিন্সের সেকেন্ড আর থার্ড অফিসারকে ক্যাপটেনের কেবিনে ডেকে পাঠাল সুলেমান আজিজ। এটাই হবে তার প্রথম ও কঠিনতম পরীক্ষা। এই দুই অফিসারের চোখকে যদি ফাঁকি দিতে পারা যায়, নিরীহ ও অজ্ঞ সহযোগী হিসেবে তার স্বার্থে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা অমূল্য অবদান রাখবে তারা।
প্লেন হাইজ্যাক করার আগে, ক্যাপটেন ডেইল লেমকের ভূমিকা গ্রহণের সময়, ছদ্মবেশ নেয়ার পদ্ধতিটা ছিল অন্যরকম। ডেইল লেমকেকে খুন করার পর অনায়াসে তার মুখের একটা প্লাস্টিক ছাঁচ তৈরি করে নিয়েছিল সে। লেডি ফ্ল্যামবোরোর ক্যাপটেন অলিভার কলিন্সকে খুন করার সুযোগ হয়নি তার, কাজেই তার ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে মাইকেল কলিন্সের আটটা ফটো সংগ্রহ করে সে। কণ্ঠস্বর কলিন্সের সমান পর্দায় তোলার জন্য বিশেষ এক ধরনের মেডিসিন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে।
দক্ষ একজন শিল্পীকে ভাড়া করে সুলেমান আজিজ, কলিন্সের ফটোগুলো দেখে লোকটা তাকে বানিয়ে দেয় একটা মূর্তি। ভাস্কর্যটি থেকে নারী ও পুরুষ, দুধরনের ছাঁচ তৈরি করা হয়। সেই ছাঁচ মুখোশ হিসেবে কাজে লাগায় সুলেমান আজিজ। কলিন্সের মুখের রং আনার জন্য মুখোশে ব্যবহার করা হয় গাছের দুধসাদা নির্যাস। ফোমের তৈরি কান লাগিয়েছে সুলেমান আজিজ। কলিন্সের চোখের রং পাবার জন্য কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেছে। দাঁতে পরেছে টুথক্যাপ।
ক্ষমা করবেন, জেন্টলমেন, ঠাণ্ডা লেগে গলাটা বসে গেছে।
জাহাজের ডাক্তারকে খবর দেব? সেকেন্ড অফিসার হারবার্ট পারকার জিজ্ঞেস করল। দীর্ঘদেহী সে, রোদে পোড়া তামাটে রং গায়ের, শিশুসুলভ নিরীহ চেহারা।
ভুল হয়ে গেছে, ভাবল সুলেমান আজিজ। ক্যাপটেন কলিন্সকে চেনে ডাক্তার, কাছ থেকে পরীক্ষা করলেই মুখোশটা চিনে ফেলতে পারে। এর মধ্যে তিনি আমাকে এক গাদা ট্যাবলেট দিয়েছেন, এখন ভালোর দিকে।
থার্ড অফিসার, স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, নাম আইজ্যাক জোন্স, কপাল থেকে লাল চুল সরিযে গলাটা সামনের দিকে লম্বা করল। আমাদের কিছু করার আছে, স্যার?
হ্যাঁ, আছে বৈকি, মি. জোন্স! অফিসারদের ফটো দেখা আছে, নাম-ধামও জানা কাজেই আলাপ চালিয়ে যেতে সুলেমান আজিজের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমাদের ভিআইপি প্যাসেঞ্জাররা কাল বিকেলে আসছেন। অভ্যর্থনা কমিটির নেতৃত্ব দেবে তুমি। একসাথে দু’জন প্রেসিডেন্টকে অতিথি হিসেবে পাওয়া দুর্লভ একটা সম্মান, স্বভাবতই কোম্পানি আশা করবে প্রথম শ্রেণীর আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করব আমরা।
ইয়েস স্যার, দৃঢ়কণ্ঠে বলল জোন্স। ভরসা রাখতে পারেন।
মি. পারকার।
ক্যাপটেন।
এক ঘণ্টার মধ্যে একটা বোট আসছে, কোম্পানির কার্গো নিয়ে। তুমি লোডিং অপারেশনের চার্জে থাকবে। আজ সন্ধ্যায় সিকিউরিটি অফিসারদের একটা দলও আসছে। তাদের থাকার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করবে, প্লিজ।
কার্গো নিতে হবে? নোটিশটা আরও আগে পেলে ভালো হতো না, স্যার? আর, আমি ভেবেছিলাম, মিসরীয় ও মেক্সিকোর সিকিউরিটি অফিসাররা আসবেন কাল সকালে।
আমাদের কোম্পানির ডিরেক্টররা চিরকাল রহস্যময় আচরণ করেন, খানিকটা অভিযোগের সুরে বলল সুলেমান আজিজ। সশস্ত্র অতিথিদের কথা যদি বলেন, এ ক্ষেত্রেও কোম্পানির আদেশ কাজ করছে। সাবধানের মার নেই ভেবে তারা নিজেদের লোক রাখতে চাইছে।
তার মানে একদল সিকিউরিটি অফিসার আরেকদল সিকিউরিটি অফিসারের ওপর নজর রাখবে?
অনেকটা তাই। আমার ধারণা, লয়েডস ব্যাঙ্ক অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা দাবি জানিয়েছে, তা না হলে বীমার রেট বাড়িয়ে দেবে।
বুঝতে পারছি।
কোনো প্রশ্ন, জেন্টলমেন?
কারও কোনো প্রশ্ন নেই, অফিসাররা চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।
হারবার্ট, আরেকটা কথা, বলল সুলেমান আজিজ। কার্গো লোড করবে যতটা সম্ভব চুপচাপ আর তাড়াতাড়ি, প্লিজ।
ঠিক আছে, স্যার।
ডেকে বেরিয়ে গিয়ে হারবার্ট পারকার, আইজ্যাক জোন্সের দিকে তাকাল। শুনলে? উনি আমার নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকলেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?
জোন্স নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল। উনি বোধহয় সত্যি খুব অসুস্থ।
ঠিক এক ঘণ্টা পরই লেডি ফ্ল্যামবোরার পাশে এসে থামল লোডিং ক্রাফট, সাথে সাথে একটা সেতুবন্ধ রচনা করা হলো। কার্গো লোড করার সময় কোনো বিঘ্ন ঘটল না। সুলেমান আজিজের বাকি লোকরাও, সবার পরনে বিজনেস স্যুট, পৌঁছল জাহাজে। চারটে খালি স্যুইট ছেড়ে দেয়া হলো তাদেরকে
মাঝরাতের দিকে মাল খালাস করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ল্যান্ডিং ক্রাফট। লেডি ফ্ল্যামবোরোর সেতু তুলে নেয়া হলো। হোল্ডের ভেতর ঠাই পেয়েছে কার্গো, হোন্ডের বিশাল ডাবল ডোর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মাইকেল ফিনি-র দরজায় তিনবার টোকা দিল সুলেমান আজিজ। সামান্য ফাঁক হলো কবাট, ভেতর থেকে উঁকি দিল সশস্ত্র গার্ড। কার্পেট মোড়া প্যাসেজওয়ের দুদিকে চট করে একবার তাকাল সুলেমান আজিজ, কেউ কোথাও নেই। তাড়াতাড়ি কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল সে।
গার্ডের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল সে। নিঃশব্দে এগিয়ে গেল গার্ড। ক্যাপটেন মাইকেল কলিঙ্গের মুখ থেকে টেপটা খুলে দিল সে।
কষ্ট দিতে হচ্ছে, সেজন্য সত্যি আমি দুঃখিত, ক্যাপটেন, বলল সুলেমান আজিজ। কিন্তু ধরুন, যদি আপনাকে আটকে না রেখে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতাম, আপনি পালাতে চেষ্টা করতেন না? বা ক্রুদের সাবধান করতেন না?
