নেতাদের গালগল্প নিশ্চয়ই তুমি শুনতে চাইবে, কৌতুক করে বললেন ক্যাপটেন।
চেহারায় অসন্তোষ নিয়ে মাইকেল ফিনি বলল, ভিআইপি প্যাসেঞ্জারদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। একই প্রশ্ন বারবার করা তাদের একটা বদঅভ্যেস।
কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আরোহী মাত্রেই শ্রদ্ধেয়, মাইক। আগামী কয়েকটা দিন নিজের আচরণের প্রতি লক্ষ রেখো, প্লিজ। অতিথি হিসেবে এবার আমরা বিদেশি নেতা আর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাচ্ছি।
জবাব দিল না মাইকেল ফিনি, সৈকতের দিকে তাকিয়ে আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দেখছে। পুরনো শহরটায় যখনই আসি, প্রতিবার নতুন একটা হোটেল দেখতে পাই।
হ্যাঁ, তুমি তো উরুগুয়েরই লোক।
মন্টিভিডিয়োর সামান্য পশ্চিমে জন্ম আমার।
বাড়ি ফেরার আনন্দটুকু উপভোগ করছো না?
এ শহরে, শুধু শহরে কেন, এ দেশে আপন বলতে কেউ নেই আমরা। ষোলো বছর বয়স থেকে জাহাজে চাকরি নিয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সাগরই আমার আসল ঠিকানা। মাইকেল ফিনি-র চেহারা হঠাৎ বিরূপ হয়ে উঠল। জানালার দিকে একটা হাত তুলে দেখল সে। ওই যে, ব্যাটারা আসছে-কাস্টমস আর ইমিগ্রেশন ইন্সপেক্টরের দল।
প্যাসেঞ্জার নেই, ক্রুরাও কেউ তীরে নামছে না, রাবার স্ট্যাম্প মেরেই চলে যাবে ওরা।
হেলথ ইন্সপেক্টরকে বিশ্বাস নেই, প্যাঁচ কষলেই হলো!
পারসারকে জানাও, মাইক। তারপর ওদেরকে নিয়ে আমার কেবিনে চলো এসো।
মাফ করবেন, স্যার, একটু বেশি খাতির করা হয়ে যাবে না? স্রেফ কাস্টমস ইন্সপেক্টরদের ক্যাপটেনের কেবিনে ডাকা কি উচিত?
হয়তো একটু বেশি হচ্ছে, তবে বন্দরে থাকার সময় বিশেষ করে ওদের সাথে সদ্ভাভ রাখতে চাই আমি, ক্যাপটেন বললেন। বলা তো যায় না কখন আমাদের উপকার দরকার হয়।
ইয়েস স্যার!
লেডি ফ্ল্যামবোয়রার গায়ে বোট ভিড়ল, মই বেয়ে উঠে এল অফিসাররা। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হঠাৎ করে জাহাজের আলো জ্বলে উঠে ঝলমলে করে তুলল আপার ডেক আর সুপারস্ট্রাকচার। শহর আর অন্যান্য জাহাজের আলোকমালার মাঝখানে নোঙর করা লেডি ফ্ল্যামবোরোকে গহনার বাক্সে হীরের একটা টুকরো মনে হলো।
উরুগুয়ের সরকারি অফিসারদের নিয়ে পাইলটের কেবিনের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনিকে। তাকে অনুসরণরত পাঁচজন লোককে খুঁটিয়ে লক্ষ করলেন ক্যাপটেন। অভিজ্ঞ মানুষ, তার চোখকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়। প্রায় সাথে সাথেই বুঝলেন তিনি, কোথায় কী যেন একটা মিলছে না। অন্তত পাঁচজনের মধ্যে একজনকে অদ্ভুত লাগল তাঁর। লোকটার মাথায় স্ট্র হ্যাট, এত চওড়া আর নিচে নেমে আছে যে তার চোখ দুটো দেখা গেল না। পরে আছে একটা জাম্পস্যুট। বাকি সবার পরনে স্বাভাবিক ইউনিফর্ম। ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোর বেশির ভাগ অফিসারই এই ইউনিফর্ম পরে।
অদ্ভুত লোকটা তার সঙ্গীদের পিছু পিছু আসছে মাথা নিচু করে। সবাইকে নিয়ে দোরগোড়ায় পৌঁছল মাইকেল ফিনি, একপাশে সরে দাঁড়িয়ে অফিসারদের আগে ঢোকার সুযোগ করে দিল।
সামনে বাড়লেন ক্যাপটেন কলিন্স। গুড ইভনিং, জেন্টলমেন। লেডি ফ্ল্যামবোরোয় আপনাদের স্বাগত জানাই। আমি ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স।
কি ব্যাপার, অফিসাররা কেউ নড়ছে না বা কথা বলছে না কেন? মাইকেল ফিনির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন ক্যাপটেন। এই সময় জাম্পস্যুট পরা লোকটা এক পা সামনে বাড়লো। পা থেকে ধীরে ধীরে জাম্পস্যুটটা খুলে ফেলল সে, ভেতরে দেখা গেল সোনার কাজ করা সাদা ইউনিফর্ম, হুবহু ক্যাপটেন কলিন্স যেমন পরে আছেন মাথা থেকে স্ট্র হ্যাটটা নামাল সে, পরল একটা ক্যাপ, ইউনিফর্মের সাথে মানানসই।
সাধারণত কোনো ব্যাপারেই দিশেহারা হন না ক্যাপটেন, কিন্তু আজ চোখের সামনে এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি যেন একটা আয়নায় তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছেন। আগন্তুককে তার যমজ ভাই বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।
কে আপনি? বাকশক্তি ফিরে পেয়ে কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করলেন ক্যাপটেন। কী ঘটছে এখানে?
নাম জেনে আপনার কাজ নেই, সবিনয় হাসির সাথে বলল সুলেমান আজিজ। আপনার জাহাজের দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলাম।
.
৩৪.
চোরাগোপ্তা হামলার সাফল্য নির্ভর করে হতচকিত করে দেয়ার ওপর। সুলেমান আজিজ আর তার অনুচররা কাজটা এমন নিখুঁতভাবে সারল যে ক্যাপটেন, ফাস্ট অফিসার আর পারসার ছাড়া জাহাজের আর কেউ জানতেই পারল না তাদের জাহাজে বেদখল হয়ে গেছে। ওদের তিনজনকে ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি-র কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো, বাঁধা হলো হাত-পা, মুখে টেপ লাগানো হলো, বন্ধ দরজার ভেতর পাহারায় থাকল সশস্ত্র একজন লোক।
সুলেমান আজিজের সময়ের হিসাবটাও নিখুঁত। উরুগুয়ের নির্ভেজাল কাস্টমস অফিসাররা মাত্র বারো মিনিট পর হাজির হলো জাহাজে। মাইকেল কলিগের প্রায় নিখুঁত ছদ্মবেশ নিয়েছে সে, অফিসারদের অভ্যর্থনা জানাল এমনভাবে যেন তাদের সাথে তার কতকালের পরিচয়। মাইকেল ফিনি আর পারসারের ভূমিকায় যে দু’জনকে বেছে নিয়েছে, বেশির ভাগ সময় ছায়ায় ভেতর থাকল তারা। দু’জনেই তারা অভিজ্ঞ নাবিক, যাদের ভূমিকায় নামানো হয়েছে তাদের সাথে চেহারার মিলও যথেষ্ট। তিন মিটারের বেশি দূর থেকে খুব কম লোকই তাদের চেহারার পার্থক্য ধরতে পারবে।
