হ্যাঁ, তার জানা দরকার। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে ব্যাপারটা তাকে জানান আপনি, সিনেটর।
কাঁধ ঝাঁকালেন সিনেটর পিট। সরকারি বিমান পেলে মঙ্গলবার আমেরিকা ছেড়ে মিসরে উড়ে যেতে পারি আমি। প্রেসিডেন্ট হাসানকে গোটা ব্যাপারটা জানিয়ে আবার ফিরে আসব ওইদিন বিকেলেই।
প্রেসিডেন্ট হাসানকে ব্যক্তিগতভাবে বলবেন, ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তিনি যদি কোনো অ্যাকশন নিতে চান, আমি তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করতে প্রস্তুত।
বাজে আইডিয়া, সিনেটর পিট বললেন, এই প্রস্তাব ফাস হলে আপনার সরকার টলে যাবে।
আপনার সতোর প্রতি আমার আস্থা আছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সিনেটর। লাইব্রেরির বই-পুস্তক, শিল্পকর্ম বিষয়ক কথাবার্তা আমি বলব। কিন্তু ইয়াজিদকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।
নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্ট। সিনেটরের সঙ্গে হাত মেলালেন।
আমি কৃতজ্ঞ, বন্ধু। বুধবার আপনার রিপোর্টের আশায় থাকব।
বিদায়, প্রেসিডেন্ট।
ওভাল অফিস ছেড়ে বেরোনোর সময় সিনেটর পিটের মনে হলো, বুধবার সন্ধ্যেয় নির্ঘাত একা একা ডিনার করবেন প্রেসিডেন্ট।
.
৩৩.
আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মূল ভূখণ্ডের পশ্চিমে ডুব দেবে সূর্য, এই সময় পাল্টা ডেল এসটের ছোট্ট বন্দরে সাবলীল ভঙ্গিতে ঢুকে পড়ল প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবোরো। মৃদুমন্দ দেখিনা বাতাসে উড়ছে ব্রিটেনের পতাকা।
সুশোভিত, সুদর্শন একটা জাহাজ, দেখামাত্র চোখ জুড়িয়ে যায়। কখনোই একশোর বেশি আরোহী ভোলা হয় না। তাদের সেবা করার জন্য রয়েছে সমান সংখ্যক ক্রু সদস্য। সান হুয়ান থেকে আসার সময় এবার অবশ্য কোনো আরোহী নিয়ে আসেনি লেডি ফ্ল্যামবোরো।
টু ডিগ্রিজ পোর্ট, কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট বলল।
টু ডিগ্রিজ পোর্ট, সাড়া দিল হেলমসম্যান।
খাকি শর্টস আর শার্ট পরে আঙুলের মতো লম্বা মাটির বাড়তি অংশটির ওপর হিসেবি চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল পাইলট, মাটির বাড়তি এই অংশটাই আড়াল করে রেখেছে বে-কে। ধীরে ধীরে সেটাকে ছাড়িয়ে এল লেডি ফ্ল্যামবোরো।
স্টারবোর্ডের দিকে ঘুরতে শুরু করো-হোল্ড স্টেডি অ্যাট জিরো এইট জিরো।
নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করল হেলমসম্যান, অত্যন্ত ধীরগতিতে নতুন কোর্স ধরল জাহাজ।
আরও অনেক রংচঙে প্রমোদতরী ও ইয়ট রয়েছে বন্দরে। অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষ্যে ভাড়া করা হয়েছে অনেক জাহাজ, বাকিগুলো তাদের আরোহীদের নামাচ্ছে।
নোঙর করার স্থান থেকে আধ কিলোমিটার দূরে থাকতে পাইলট নির্দেশ দিল ডেড স্টপ!
শান্ত পানি কেটে আপন গতিতে এগোল লেডি ফ্ল্যামবোরো, দূরত্ব কমিয়ে এনে ধীরে ধীরে থামছে। সন্তুষ্ট হয়ে পোর্টেবল ট্রান্সমিটারে পাইলট জানাল, পজিশনে পৌঁছেছি আমরা। হুক ফেলল।
নির্দেশটা বো-র দিকে পাঠানো হলো, সাথে সাথে পানিতে ফেলা হলো নোঙর। এতক্ষণে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিল পাইলট।
সাদা ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সহাস্য বদনে করমর্দনের জন্য পাইলটের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। প্রতিবারের মতই নিখুঁত, মি. ক্যাম্পোস। ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স বিশ বছর ধরে পাইলট হ্যারি ক্যাম্পোসকে চেনেন।
আর যদি ত্রিশ মিটার লম্বা হতে জাহাজটা, কোনোমতেই বন্দরে ঢোকাতে পারতাম না। তামাকের দাগে কালো দাঁত বের করে হাসল ক্যাম্পোস। তবে আমরা ওপর নির্দেশ আছে, বন্দরেই নোঙর ফেলতে হবে, জেটিতে ভিড়তে পারব না।
অবশ্যই নিরাপত্তার কারণে, আন্দাজ করা যায়, ক্যাপটেন বললেন।
আধপোড়া একটা চুরুট ধরাল পাইলট। শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি গোটা দ্বীপটাকে ওলটপালট করে ছেড়েছে। সিকিউরিটি পুলিশের হাবভাব দেখে মনে হয় প্রতিটি পাম গাছের আড়ালে একজন করে স্নাইপার লুকিয়ে আছে।
ব্রিজের জানালা দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় খেলার মাঠের দিকে তাকালেন ক্যাপটেন। আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সম্মেলন চলার সময় এই জাহাজে মেক্সিকো আর মিসরের প্রেসিডেন্ট থাকবেন।
তাই? বিড়বিড় করে বিস্ময় প্রকাশ করল পাইলট। তাহলে সেজন্যই তীর থেকে দূরে রাখতে বলা হয়েছে আপনাকে।
আসুন না, আমার কেবিনে বসে গলাটা ভিজিয়ে নেবেন, আমন্ত্রণ জানালেন ক্যাপটেন কলিন্স।
অসংখ্য ধন্যবাদ, মাথা নেড়ে বলল ক্যাম্পোস। বন্দরের জাহাজগুলোর দিকে একটা হাত তুলল সে। আজ অনেক কাজ, আরেক দিন হবে।
কাগজপত্র সেই করিয়ে নিয়ে বন্দর পাইলট ক্যাম্পোস নিজের বোটে নেমে গেল। হাত নাড়ল সে, তাকে নিয়ে চলে গেল বোট।
এত আনন্দ আর কখনও পাইনি, কলিন্সের ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি বলল। এরা সবাই হাজির, কিন্তু আরোহী বলতে কেউ নেই। ছয় দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে, মারা যাবার পর স্বর্গে পাঠানো হয়েছে আমাকে।
কোম্পানির নির্দেশ, ক্রুরা যতটা সময় জাহাজ চালানোয় ব্যয় করবে, সেই একই পরিমাণ সময় ব্যয় করতে হবে আরোহীদের মনোরঞ্জনের জন্য। এই দায়িত্ব পছন্দ নয় মাইকেল ফিনির। অত্যন্ত দক্ষ একজন নাবিক সে, মেইন ডাইনিং সেলুনের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে থাকে, খাওয়া-দাওয়া সারে সঙ্গী অফিসারদের সাথে, সারাক্ষণ জাহাজের খবরদারিতে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। শরীরটা তার প্রকাণ্ড, ড্রাম আকৃতির ধড়, আঁটসাট ইউনিফর্ম ছিঁড়ে সেটা যেন প্রতি মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে চাইছে।
