বারটেন্ডার এখনও লুকিয়ে আছে, কাজেই পিয়ানো বাদকের দিকে ফিরল পিট। তিন পায়াওলা একটা টুলে হতভম্ব চেহারা নিয়ে বসে আছে সে। তার মাথায় কাত হয়ে রয়েছে ডার্বি হ্যাট, ঠোঁটের কোণে ঝুলে রয়েছে আধপোড়া সিগারেট, ছাইটুকু এখনও ঝরে পড়েনি। কি-র ওপর তাক করা রয়েছে তার হাত দুটো, গোটা শরীর আড়ষ্ট। রক্তাক্ত আগন্তুকের দিকে তাকাল সে, আগন্তুক হাসল।
ক্ষমা করবেন, ভাই, সবিনয়ে বলল পিট। একটু বাজিয়ে শোনাবেন নাকি–ফ্লাই মি টু দ্য মুন?
৩০. দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো
তৃতীয় পর্ব – দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো
১৯ অক্টোবর, ১৯৯১ উক্সমাল, ইউকাটান
৩০.
চারদিকে বহুবর্ণ ফ্লাডলাইটের ছড়াছড়ি। অতিকায় কাঠামোর প্রতিটি পাথর শিল্পকর্ম, সেগুলোয় প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বল আলো অতিপ্রাকৃত একটা আভা বিকিরণ করছে। প্রকাণ্ড পিরামিডের দেয়ালগুলো নীল করা হয়েছে, পিরামিডের মাথার ওপর জাদুকরের মন্দির গোলাপি আভায় উদ্ভাসিত। লাল স্পটলাইট দ্রুত ওঠানামা করছে সিঁড়ি বেয়ে, প্রতিবার রক্ত ঢেলে দেয়ার একটা ছবি ফুটে উঠছে ধাপগুলোর ওপর। উপরে, মন্দিরের ছাদে, সাদা কাপড়ে মোড়া একটা মূর্তি।
নিজের দুদিকে হাত দুটো মেলে দিল টপিটজিন, মুঠো খুলল- তার এই ভঙ্গি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনেক আগেই। সামনের দিকে সামান্য একটু ঝুঁকে নিচে তাকাল সে।
ইউকাটান পেনিনসুলায় প্রাচীন মায়ান শহর উক্সমাল, মন্দির আর পিরামিডের চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, হাজার হাজার ভক্ত মুখ তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। টপিটজিন তার ভাষণ শেষ করল প্রতিবারের মতোই কীর্তন গাওয়ার সুরে আযটেক গান গেয়ে। সুরটা ধরতে পারল বিশাল জনতা, একযোগে গেয়ে উঠল তারাও।
এই জাতির শক্তি, সাহস আর সাফল্য নিহিত রয়েছে আমাদের মধ্যে, আমরা যারা কখনোই অভিজাত বা ধনী হব না। আমরা অভুক্ত থাকি, মেহনত করি সেই সব নেতাদের জন্য যারা আমাদের চেয়ে কোনো অর্থেই বড় বা সৎ নয়। অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম মহত্ত্ব বা গৌরবের অস্তিত্ব মেক্সিকোয় থাকবে না। আর নয় দাসত্ব। আর নয় মুখ বুজে শোষণ আর অত্যাচার সহ্য করা। ভদ্রবেশী অভিজাত আর ধনীদের শায়েস্তা করার জন্য, তাদের দুর্নীতি থেকে জাতিকে চিরকালের জন্য উদ্ধার করার জন্য, আবার একজোট হয়েছেন দেবতারা। তারা আমাদের জন্য নতুন এক সভ্যতা উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন। সেটা আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে।
ভাষণ শেষ হবার সাথে সাথে বহুরঙা আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল, শুধু উজ্জ্বল সাদা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে থাকল একা টপিটজিন। তারপর অকস্মাৎ সাদা স্পটলাইটও নিভে গেল, সেই সাথে অদৃশ্য হলো মূর্তিটা।
খোলা প্রান্তরে বহূৎসব জ্বলে উঠল ট্রাক বহর থেকে হাজার হাজার কৃতজ্ঞ ভক্তদের মধ্যে বিলি করা হলো বক্স ভর্তি খাবার। প্রতিটি বাক্সে নরম, সুস্বাদু রুটি আর মাংস আছে, আর আছে একটা করে পুস্তিকা। পুস্তিকাটা কার্টুন পত্রিকার মতো, প্রচুর ছবি, ক্যাপশন কম। ছবিতে দেখানো হয়েছে দৈত্য-দানবের চেহারা নিয়ে মেক্সিকো ছেড়ে পালাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো আর তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা, সীমান্তের ওপারে শয়তানরূপী আংকল স্যাম দুবাহু বাড়িয়ে তাদেরকে আলিঙ্গন করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট আর তার সঙ্গীদের তাড়া করছে দেবতার চেহারা নিয়ে টপিটজিন, তার সাথে রয়েছে আরও চারজন আযটেক দেবতা।
পুস্তিকায় নির্দেশের একটা তালিকাও স্থান পেয়েছে, বুদ্ধি দেয়া হয়েছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কিন্তু কার্যকরীভাবে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করার।
খাবার বাক্স বিলি করার সময় স্বেচ্ছাসেবক যুবক-যুবতীরা টপিটজিনের নতুন শিষ্য সংগ্রহ ও তাদেরকে তালিকাভুক্ত করার দায়িত্বও পালন করল। গোটা ব্যাপারটার আয়োজন করা হয়েছে পেশাদারি দক্ষতার সাথে। মেক্সিকো সিটি দখল করে সরকারকে উৎখাত করার জন্য এক পা এক পা করে এগোচ্ছে টপিটজিন। শুধু উক্সমালে নয়, আরও বহু প্রাচীন আযটেক শহরে ভাষণ দিয়েছে সে। নিজের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তার প্রতিটি ভাষণ অবিশ্বাস্য অবদান রাখছে। তবে আজ পর্যন্ত আধুনিক কোনো শহরে সমাবেশের আয়োজন করেনি সে।
সন্ত্রষ্ট জনতা টপিটজিনের নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। কিন্তু তাদের সে জয়ধ্বনি তার কানে গেল না স্পটলাইট নেভার সাথে সাথে দেহরক্ষীরা তাকে নিয়ে পিরামিডের পেছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে বড়সড় একটা ট্রাক তথা সেমিট্রেইলর-এর পাশে। তাড়াহুড়ো করে ট্রাকে উঠে পড়ল টপিটজিন। স্টার্ট নিল ইঞ্জিন। ট্রাকের সামনে একটা প্রাইভেট কার থাকল, পেছনে থাকল আরেকটা। জনতার ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ধীরগতিতে এগোল গাড়িগুলো, উঠে এল হাইওয়েত, বাঁক নিয়ে রওনা হলো ইয়ুক্যাটান রাজ্যের রাজধানী মারিডার দিকে।
ট্রেইলরের ভেতরে দামি ফার্নিচার; একপাশে কনফারেন্স রুম, পার্টিশনের অপর দিকে টপিটজিনের লিভিং কোয়ার্টার।
ঘনিষ্ঠ ভক্তদের সাথে আগামীকালের শিডিউল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করল টপিটজিন। বৈঠক শেষ হলো, এই সময় দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রাক, শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল সবাই। প্রাইভেট কারে উঠে মারিডার একটা হোটেলে চলে গেল তারা।
