দরজা বন্ধ করে দিয়ে লিভিং কোয়ার্টার ঢুকল টপিটজিন। মাথা থেকে পালকের মুকুট খুলল সে, খুলল সাদা আলখেল্লা, পরনে থাকল একজোড়া স্ন্যাকস আর একটা স্পোর্টস শার্ট। কেবিনেট থেকে দামি এক বোতল হুইস্কি বের করল। প্রথম দুবার তাড়াতাড়ি গলায় ঢালল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, তারপর আয়েশ করে ছোট ঘোট চুমুক দিল গ্লাসে।
পেশিতে ঢিল পড়ার পর ছোট্ট একটা খুপরিতে ঢুকল টপিটজিন, ভেতরে নানা ধরনের কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট রয়েছে। একটা হোলোগ্রাফিক টেলিফোনের কোড করা নাম্বারে চাপ দিয়ে ঘুরল সে, খুপরির ঠিক মাঝখানে মুখ করল হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে অপেক্ষায় আছে। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট একটা ত্রিমাত্রিক মূর্তি ফুটে উঠতে শুরু করল। একই ভাবে হাজার মাইল দূরে টপিটজিনকেও দেখা যাচ্ছে।
একসময় পরিষ্কার হলো ছবিটা। আরেকজন তোক একটা আরাম কেদারায় বসে তাকিয়ে রয়েছে টপিটজিনের দিকে। তার গায়ের রং গাঢ়, ব্যাকব্রাশ করা চুলে চকচক করছে তেল। শক্ত, দামি পাথরের মতো ঝলমলে তার চোখ জোড়া। পাজামার ওপর আলখেল্লা পরেছে সে। টপিটজিনের স্ন্যাকস আর শার্ট প্রু কুঁচকে লক্ষ করল লোকটা, লক্ষ করল হাতে মদের গ্লাসটাও। বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছ তুমি। এতটা বেপরোয়া হওয়া কি উচিত? ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল সে, বাচনভঙ্গি আমেরিকান। এরপর মেয়েমানুষের দিকে ঝুঁকবে, কী বলো?
হেসে উঠল টপিটজিন। শোনো ভাই, আমাকে লোভ দেখিয়ে না! বিজাতীয় কাপড়ে চব্বিশ ঘণ্টা নিজেকে ঢেকে রাখা, পোপের মতো আচরণ করা, তার ওপর কৌমার্য অক্ষুণ্ণ রাখা, প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।
কেন, একই কাজ তো আমাকেও করতে হচ্ছে।
হ্যাঁ, তা হচ্ছে। কিন্তু আর যে পারি না!
সাফল্য নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, এখন তোমার অসতর্ক হওয়া সাজে না।
হতে চাই না, হচ্ছিও না। আমার প্রাইভেসিতে নাক গলাবে এমন সাহস কারও নেই। যখন একা থাকি, ভক্তরা ধরে নেয় ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ করছি আমি।
দ্বিতীয় লোকটা নিঃশব্দে হাসল। ব্যাপারটার সাথে আমিও পরিচিত।
কাজের কথা শুরু করবে? জিজ্ঞেস করল টপিটজিন।
ঠিক আছে। বলো কি ব্যবস্থা করেছ?
সংশ্লিষ্ট লোকজন ছাড়া কাকপক্ষীও আয়োজনটার কথা জানে না। নির্দিষ্ট সময়ে সবাই যে যার জায়গায় উপস্থিত থাকবে। সমাবেশের জায়গাটা কোথায় জানার জন্য দশ মিলিয়ন পেসো ঘুস দিয়েছি আমি। বোকার দল তাদের কাজ শেষ করবে, তারপর তাদের বলি দেওয়া হবে। শুধু যে তাদের মুখ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য তা নয়, আমাদের নির্দেশ পালনের জন্য যারা অপেক্ষা করছে তাদেরকে সতর্কও করা হবে।
আমার অভিনন্দন গ্রহণ করো। তোমার কাজ অত্যন্ত নিখুঁত।
কৌশল আর বুদ্ধিমত্তা দেখানোর সুযোগ তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি আমি।
টপিটজিনের মন্তব্যের পর কয়েকটা মুহূর্তে নিস্তব্ধতার ভেতর কাটল, দু’জনেই যে যার চিন্তায় মগ্ন। অবশেষে নড়ে উঠল দ্বিতীয় লোকটা, গাউনের ভেতর থেকে ব্র্যান্ডির একটা বোতল বের করল, উঁচু করে দেখল টপিটজিনকে। তোমার স্বাস্থ্য।
হেসে উঠে হুইস্কির গ্লাসটা টপিটজিনও উঁচু করল। যৌথ অভিযানের সাফল্য কামনায়।
আমি দেখার অপেক্ষায় আছি, আমাদের মেধা আর পরিশ্রমের ফল ভবিষ্যৎকে কীভাবে বদলে দেয়।
.
৩১.
ডেনভারের অদূরে বাকলি এয়ারফিল্ড থেকে আকাশে উঠে পড়ল চিহ্নবিহীন বিচক্রাফট জেট বিমানটা। ইঞ্জিনের গর্জন কমেছে কিছুটা। তুষার ঢাকা রকি পর্বতমালার চূড়াগুলো পিছিয়ে পড়ল, বিচক্রাফট জেট আকাশের আরও ওপরে উঠে এল।
প্রেসিডেন্ট শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, আপনি যাতে তাড়াতাড়ি সেরে ওঠেন, ডেইল নিকোলাস বললেন। ঘটনার বর্ণনা শোনার পর ভয়ানক অসন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি…
তিনি উপলব্ধি করেছেন আপনার ওপর দিয়ে কী রকম বিশ্রী একটা ধকল গেছে, মন্তব্য করলেন জুলিয়াস শিলার।
এবং তিনি আমাদের সবার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। বলেছেন, আপনার নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য যেকোনো ব্যবস্থা নিতে তৈরি আছে মার্কিন প্রশাসন।
তাঁকে বললেন, আমি কৃতজ্ঞ, হে’লা কামিল উত্তর দিলেন। আমার তরফ থেকে তাঁর প্রতি একটাই অনুরোধ, আমার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যারা মারা পড়েছে তাদের পরিবারকে যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
জুলিয়াস শিলার নিশ্চয়ই দিয়ে বললেন, সে ব্যাপারে অবহেলা করা হবে না।
একটা বিছানায় শুয়ে আছেন হে’লা কামিল, পরনে সাদা সুইট-স্যুট। তার ডান গোড়ালি প্লাস্টার করা হয়েছে। এক এক করে জুলিয়াস শিলার, ডেইল নিকোলাস ও সিনেটর পিটের দিকে তাকালেন তিনি। আমি সম্মানিত বোধ করছি, আপনাদের মতো ব্যক্তিত্ব নিউ ইয়র্কের পথে আমাকে সঙ্গদান করছেন।
আপনি কিন্তু বিড়ালকেও হার মানিয়েছেন, মুচকি হেসে এই প্রথম কথা বললেন সিনেটর।
হে’লা কামিলের ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক হলো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় জীবন দান করার জন্য আপনার ছেলের কাছে আমি ঋণী। অদ্ভুত সময়ে হাজির হওয়ার বিরল ক্ষমতা আছে ওর।
ডার্কের পুরনো গাড়িটার অবস্থা দেখেছি স্বচক্ষে। কেমন করে বেঁচেছেন সবাই, কে জানে। সিনেটর পিট বললেন।
অত্যন্ত সুন্দর একটা বাহন ছিল, আফসোসের সুর ধ্বনিত হলো হেলার কণ্ঠে। নষ্ট হয়ে গেল।
কাশি দিয়ে ডেইল নিকোলাস বললেন, জাতিসংঘে আপনার ভাষণ প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি, মিস কামিল?
