একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইলে মোচড় দিল পিট। কর্ডের পেছনটা ঘুরে গেল, চরকির মতো পাক খেতে শুরু করে র্যাম্পটাকে এড়িয়ে গেল গাড়ি। কর্ডের আকস্মিক অস্থিরতা লক্ষ করে ঘাবড়ে গেল ইসমাইলের ড্রাইভার, সংঘর্ষ এড়াবার জন্য সরলরেখা থেকে সরিয়ে নিল মার্সিডিজকে, স্টার্টিং গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল নিখুঁতুভাবে।
কর্ডকে সোজা পথে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে পিট, ঘাড় ফিরিয়ে মার্সিডিজের দিকে তাকিয়ে আছে জিওর্দিনো। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কিনারা থেকে নেমে গেল গাড়িটা। মুহূর্তের জন্য সেটাকে আকাশের গায়ে ডানাবিহীন মোটাসোটা একটা পাখির মতো লাগল। র্যাম্পের কিনারা ছাড়ার মুহূর্তে ঘণ্টায় একশো বিশ কিলোমিটার বেগে ছুটছিল ওটা। নিচে পড়ে প্রথমে ওটা চ্যাপ্টা হলো, তারপর গড়িয়ে নামার সময় খুলে খুলে পড়ল একেকটা পার্ট। পাইনগাছের সারিতে ধাক্কা খাওয়ার আগেই আরোহীরা সবাই দলা পাকিয়ে গেছে।
আরেকটু হলে আমরাও আকাশে উড়তাম! ঢাক গিলে পিটকে তিরস্কার করল জিওর্দিনো।
তার বদলে সম্ভবত পাতালে নামতে যাচ্ছি! সতর্ক করল পিট। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি পথ ধরতে গিয়ে সফল হলেও, কর্ডের চাকা ঢালে নেমে এসে পিছলাতে শুরু করেছিল। স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে পিছলানো সামলে নিয়েছে পিট, কিন্তু ঢাল বেয়ে পতনের গতি কমাতে পারছে না। ঢালের অর্ধেকটা পেরিয়ে আসতেই ব্রেকের শূন্য পুড়ে গেল, স্টিয়ারিং টাই রঙ বেঁকে গেছে, সেটাও একটা থ্রেড-এর মাথায় ঝুলছে। কর্ড ছুটে চলেছে তার অবধারিত পথে, সরাসরি একটা স্কি ফ্যাসিলিটি আর রেস্তোরাঁ বিল্ডিংয়ের দিকে, চেয়ার লিফটের গোড়ায়। একটা কাজই করার আছে রানর, করছেও তাই, বাচ্চাদের মতো অনবরত হর্ন বাজাচ্ছে।
মহিলা আরোহীরা দ্বিতীয় মার্সিডিজের ধ্বংস চাক্ষুষ করেছে নির্দয় কৌতুল আর বিশাল স্বস্তিকর অনুভূতি নিয়ে। স্বস্তিটুকু ক্ষণস্থায়ী। ভবনটা সবেগে ছুটে আসছে দেখে আঁতকে উঠল তারা।
মি. পিট, কিছুই কি আমাদের করার নেই? পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন হেলা কামিল। প্রশ্নটা প্রায় বুলেটের মতো ছুটে এল।
পরামর্শ দেয়ার অধিকার ইচ্ছে করলেই আপনি প্রয়োগ করতে পারেন, পাল্টা গুলি ছুড়ল পিট। পরমুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে উঠল বাচ্চাদের তৈরি খেলাঘর এড়বার জন্য, খেলাঘরের চারপাশে তারা স্কি নিয়ে ছোটাছুটি করছে।
স্কিয়ারদের প্রধান অংশটা মার্সিডিজের পতন দেখেছে, কর্ডের আওয়াজও তাদের কানে গেছে। ট্রেইলের একপাশে দ্রুত সরে গেল তারা, হাঁ করে পাশ কাটাতে দেখল গাড়িটাকে।
চেয়ার লিফটের উঁচু প্রান্তটা থেকে ফোনে একাধিক গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, বেস এরিয়া থেকে লোকজনকে সরিয়ে রয়েছে, স্কি ইনস্ট্রাকটররা। স্কি সেন্টারের ডান দিকে অগভীর একটা পুকুর রয়েছে, বরফে জমাট বাঁধা! পিটের ইচ্ছে, ওই পুকুরের ওপর পৌঁছানো। জমাট বাঁধা বরফ ভেঙে গেলে কর্ডের রানিং বোর্ড পর্যন্ত ডুবে যাবে, স্থির হবে গাড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো, লোকজন কি ঘটে দেখার লোভে এমনভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের মাঝখানে রেস্তোরাঁ ভবন পর্যন্ত একটা করিডর তৈরি হয়েছে, পুকুরের দিকে যাবার কোনো পথ খোলা রাখেনি।
আশা করতে পারি, গম্ভীর সুরে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো, এবার তুমি ঝোলা থেকে পাঁচ নম্বর প্ল্যানটা বের করবে?
প্ল্যান সব শেষ, বলল পিট। দুঃখিত।
হে’লা কামিল গলা লম্বা করে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। তাঁকে মিথ্যে অভয় দেবে, সে উৎসাহও পাচ্ছে না লিলি। সংঘর্ষ অনিবার্য, আর দেরিও নেই, বুঝতে পেরে পরস্পরকে তারা জড়িয়ে ধরল, তারপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রাইভিং সিটের পেছনে।
স্কি আর পোল রাখা হয় র্যাকগুলোয়, কয়েকটার সাথে ধাক্কা খেল কর্ড। টুথপিকের মতো চারদিকে উড়ে গেল স্কি আর পোলগুলো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো তুষারের ভেতর চাপা পড়েছে গাড়ি, তারপর বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে এসে আবার ছুটল সেটা, কংক্রিটের সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি উঠে পড়ল বারান্দায়, কাঠের দেয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ল ককটেল লাউঞ্জে।
রুমটা খালি করা হয়েছে, রয়ে গেছে শুধু পিয়ানো বাদক। সে তার কি-বোর্ডের সামনে বসে আছে, বিস্ময়ে পঙ্গু। এক সেকেন্ড পর দেখা গেল আরও একজন রয়ে গেছে। বার-এর নিচ থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলল বারটেন্ডার, কর্ডটা ভেতরে ঢুকছে দেখে আবার ঝপ করে বসে পড়ল সে। চেয়ার-টেবিল খুঁড়িয়ে উন্মত্ত হাতির মতো ছুটে এল কর্ড, উল্টোদিকের দেয়াল ভেঙে নিচে লাফ দেয়ার পাঁয়তারা করল। দেয়ালের বিশ ফুট নিচে শক্ত বরফ।
আশ্চর্যই বটে, দেয়াল ভাঙার পর গর্তের ভেতর খানিকটা নাক গলিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে গেল কর্ড, বোঝা গেল লাফ দেয়ার কোনো ইচ্ছে ওটার নেই।
র্যাডিয়েটরের হিসহিস শব্দ ছাড়া কামরার ভেতর ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এল। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের সাথে মাথাটা ঠুকে গেছে পিটের, চুলের আড়ালে সদ্য তৈরি ক্ষত থেকে গাল বেয়ে নেমে আসছে রক্ত। দেয়ালের দিকে ফিরল ও। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে এমন স্থিরভাবে বসে আছে সে, যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাল পিট। মহিলা আরোহীদের দু’জনের চেহারাতেই প্রশ্নসূচক এখনও আমরা বেঁচে আছি! ভাব।
