.
জমাট বাঁধা শক্ত বরফের ওপর দিয়ে তীরবেগে নামছে কর্ড, প্রতি মুহূর্তে আরও বাড়ছে গতি। হুইলটা আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে পিট, প্রায় ঘোরাচ্ছেই না। ব্রেকের ওপরও কোনো চাপ দিচ্ছে না। একটু এদিক-ওদিক হলেই চরকির মতো ঘুরতে শুরু করবে কর্ড। যদি আড়াআড়িভাবে পিছলাতে শুরু করে, অবধারিত পরিণতি হবে ঘন ঘন ডিগবাজি খাওয়া, পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছবে কিছু ভাঙা হাড় আর লোহালক্কড়।
সিট বেল্টের প্রশ্ন তোলার জন্য এটা কি আদর্শ সময় নয়? জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।
মাথা নাড়ল পিট। উনিশশো ত্রিশে সে ধরনের কিছু ছিল না।
বুলেটে ঝাঁঝরা পেছনের চাকার রাবার খসে যাওয়ায় ভাগ্যকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দিল ও। চুপসে যাওয়া টায়ার থেকে মুক্ত হয়ে কাঠামোর জোড়া কিনারা বরফের গায়ে ভালোভাবে কামড় বসাতে পারছে, ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য পাচ্ছে পিট।
স্পিডমিটারের কাঁটা ষাটের ঘরে উঠে গেল, এই সময় এক ঝাঁক মুঘলকে ছুটে আসতে দেখল ও তুষারের অতিকায় স্তূপ, দক্ষ স্কিয়াররা এ ধরনের বাধা পেরোতে ভালোবাসে। স্কি নিয়ে ঢাল পেরোবার সময় বাধাগুলো পিটেরও খুব প্রিয়। কিন্তু দুহাজার একশো বিশ কিলোগ্রাম ওজনের গাড়ি নিয়ে মুঘলদের মাঝখান দিয়ে পথ করে নেয়ার কথা ভাবতে পারে শুধু পাগলরা। অ্যাল ধারণা, পিট বর্তমানে তাদের ভূমিকাতেই অভিনয় করছে।
আলতো স্পর্শে ট্রেইল থেকে সামান্য সরিয়ে দিল পিট গাড়িটাকে, চলে এল মসৃণ বরফে। সামনের পরীক্ষাটা সূচের ফুটোয় অলিম্পিক মশাল ঢোকানোর সাথে তুলনা করা যায়। আপনা থেকেই শরীরের পেশি শক্ত হয়ে গেল, ঝাঁকি খাবার জন্য তৈরি। এক চুল এদিক ওদিক হলে ছাতু হয়ে যাবে সবাই ওরা।
একপাশে অনেকগুলো তুষার স্তূপ, আরেক পাশে সারি সারি গাছ, মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। কোনোটার সাথে ঘষা লাগল না, সরু পথ ধরে পরিষ্কার বেরিয়ে এল কর্ড। চওড়া, বাধাহীন ঢালে বেরিয়ে এসেই ঝট করে পেছন দিকে তাকাল পিট।
প্রথম মার্সিডিজের ড্রাইভার কাণ্ডজ্ঞানের চমৎকার পরিচয় দিল। মুঘলদের এড়াবার জন্য কর্ডের ফেলে আসা চাকার দাগ অনুসরণ করল সে। দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার হয় মুঘলদের দেখেনি বা বিপজ্জনক বলে মনে করেনি। নিজের ভুল বুঝতে পারল অনেক দেরিতে, ব্যস্ততার সাথে সংশোধনের জন্য গাড়িটাকে ঘন ঘন ডানে বায়ে ঘোরাল সে। এভাবে তিন কী চারটে মুঘলকে এড়াতে সফল হলো লোকা, তারপর একটার সাথে মুখোমুখি ধাক্কা খেল। গাড়ির সামনের অংশ তুষারের ভেতরে ঢুকে গেল, উঁচু হলো পেছনটা। নব্বই ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে বুঝলে থাকল সেটা। তারপর শুরু হলো ডিগবাজি খাওয়া। নিরেট বরফে পড়ল, খাড়া হলো, আবার পড়ল, আবার খাড়া হলো-প্রতিবার গাড়ি থেকে কিছু না কিছু ছিটকে পড়ছে, শুধু আরোহীরা বাদে, কারণ ডিগবাজি খাওয়ায় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে বডি, জ্যাম হয়ে গেছে দরজা। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়লে আরোহীরা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত।
মাউন্টিং থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল ইঞ্জিন, ছিটকে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। চাকা, ফ্রন্ট সাসপেনশন, রিয়ার-ড্রাইভ ট্রেন, এক এক সবগুলো চেসিস থেকে বেরিয়ে ঢাল বেয়ে সবেগে নামতে শুরু করল।
যদি বলি একটা খতম, ব্যাকরণ সম্মত হবে কি? প্রশ্ন করল জিওর্দিনো।
খুশি হবার কিছু নেই, দাঁতে দাঁত চেপে বলল পিট। সামনে তাকাও।
সামনে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল জিওর্দিনো। সামনে নতুন একটা ট্রেইল শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে উজ্জ্বল রঙের স্কি সুট পরা অনেক লোকের ভিড়। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের কিনারা ধরে সটান খাড়া হলো সে, উন্মত্তের মতো হাত নেড়ে চিৎকার জুড়ে দিল। কর্ডের জোড়া হর্ন বাজাচ্ছে পিট।
চমকে উঠে ওদের দিকে ফিরল স্কিয়াররা। দেখল, দুটো ছুটন্ত গাড়ি প্রায় তাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় আছে, ছিটকে একপাশে সরে গেল সবাই, কর্ডটাকে পাশ কাটাতে দেখল, দেখল তীরবেগে সেটাকে ধাওয়া করছে একটা মার্সিডিজ।
ট্রেইলে উঁচু হয়েছে একটা স্কি জাম্প, নেমেছে একশো মিটার দূরে। তুষার ঢাকা র্যাম্প ঠিক কোথায় পাহাড়ের গায়ে মিশেছে, দেখার অবসর নেই পিটের। কোনো রকম ইতস্তত না করে স্টাটিং ড্রপ-অফ-এর দিকের র্যাডিয়েটর অর্নামেন্ট তাক করল
লাফ দেবে, না? তাজ্জব জিওর্দিনো প্রশ্ন করল।
চার নম্বর প্ল্যান, তাকে আশ্বস্ত করল পিট। শক্ত হও। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারি।
আছে নাকি যে হারাবে?
অলিম্পিক কমপিটিশনের জন্য যে ধরনের কাঠামো তৈরি করা হয়, এটা তার চেয়ে অনেক ছোট। এটা শুধু অ্যাবেটিক আর হটডগ প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে র্যাম্পটা কর্ডকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট চওড়া, খানিকটা জায়গা পড়েও থাকবে। ক্রমশ উঁচু হয়েছে ঢালটা, তারপর সমতল খানিকটা বিস্তৃতি, সবশেষে দেবে গেছে র্যাম্প, ত্রিশ মিটার এগিয়ে গ্রাউন্ড-এর বিশ মিটার ওপরে হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে।
স্টার্টিং গেটের দিকে গাড়ি তাক করল পিট, কর্ডের চওড়া বডির আড়ালে লুকিয়ে রাখল স্কি জাম্প। সাফল্য নির্ভর করছে সময়জ্ঞান আর প্রয়োজনমতো স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোনার ওপর।
একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোর ওপর।
