নির্লিপ্তভাবে ক্ষতটা স্পর্শ করল জিওর্দিনো, ভাবটা যেন ওটা অন্য কারও কান। তারপর মাথা কাত করে পিটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। আমার সন্দেহ হচ্ছে, কাল রাতে খাওয়া মদটুকু ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসছে।
সিরিয়াস?
দুহাজার ডলার লাগবে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে, ফুটো হয়েছিল কিনা টেরও পাবে না। মহিলাদের কোনো খবর জানো?
না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল পিট, লিলি, তোমরা ঠিক আছে তো?
কাঁচের টুকরো চামড়ায় দুএকটা দাগ কেটেছে, প্রায় সাথে সাথে, উঁচু গলায় জবাব দিল লিলি। তাছাড়া আমরা অক্ষতই আছি।
কর্ডের র্যাডিয়েটর থেকে বাষ্প এবার সশব্দ প্রতিবাদের সাথে বেরোচ্ছে। ইঞ্জিনের শক্তি কমছে, টের পেল পিট। সামনে শেষ বাক, তারপর চুড়া। গাড়িটাকে ঘোরানোয় মন দিল ও। পেছনের বাম্পারে প্রায় সেঁটে আছে প্রতিপক্ষরা।
অতিরিক্ত উত্তাপে ইঞ্জিনের বেয়ারিংগুলো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আরও এক ঝাঁক বুলেট বামদিকের পেছনের ফেন্ডার গুঁড়িয়ে দিল, চ্যাপ্টা করে দিল টায়ারটাকে। কর্ডের পেছনের অংশ রাস্তা থেকে নেমে যেতে চাইছে, ধরে রাখার জন্য হুইলের সাথে যুদ্ধ করছে পিট। রাস্তার পাশে অসংখ্য বোল্ডার, গাড়ি ধাক্কা খেলে ছাতু হয়ে যাবে আরোহীরা।
হুডের নিচ থেকে নীল ধোয়া বেরোতে দেখে পিট বুঝল, মারা যাচ্ছে কর্ড। রাস্তার কিনারায় পড়ে থাকা একটা পাথরকে এড়াতে পারেনি ও, অয়েল প্যানে খোঁচা লাগায় গর্ত তৈরি হয়েছে, ইঞ্জিনের নিচ থেকে ঝরে পড়ছে তেল। অয়েল প্রেশার গজ দ্রুত শূন্যের ঘরে নেমে এল। পাহাড় চূড়ায় পৌঁছানোর আশা ত্যাগ করাই ভালো।
পিছলানো চাকা নিয়ে সামনের মার্সিডিজ শেষ বাকটা ঘুরতে শুরু করল। কর্ডের হুইল শক্ত করে ধরে অনবরত ঘোরাচ্ছে পিট। ধাওয়ারত শত্রুদের চেহারায় উল্লাস কল্পনা করতে পারল ও, তারা বুঝে ফেলেছে পালানোর কোনো উপায় নেই শিকারের।
চারদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আশ্রয়ের কোনো সন্ধান দেখল না পিট। পা সম্বল কোথাও বেশিদূর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাস্তার একদিকে তুষার আর বোল্ডার, আরেকদিকে ঝপ করে নেমে গেছে গভীর খাদ, মাঝখানের সরু রাস্তায় আটকা পড়েছে ওরা। ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়েছে, একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ার আগেই ঘটে যাবে যা ঘটার।
মরিয়া হয়ে উঠল পিট, মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর-পেড়াল গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে, সেই সাথে বিধাতা সাহায্য চেয়ে আবেদন জানাল ওপর মহলে।
আশ্চর্যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাচীন বাহনের এখনও কিছু দেয়ার আছে। জ্যান্ত একটা প্রাণীর মতো, লোহা আর ইস্পাতসহ কুঁকড়ে গেল কর্ড। ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল, সামনের চাকাগুলো দেবে গেল তুষারের ভেতর, পরমুহূর্তে ছেড়ে দেয়া স্প্রিংয়ের মতো সামনে লাফ দিল কর্ড, একবারের চেষ্টাতেই উঠে এল চূড়ায়।
পেছনে নীল ধোয়া আর সাদা বাষ্পের মেঘ উঠল, খোলা স্কি রান-এর মাথায় পৌঁছে গেল ওরা। ট্রিপল-চেয়ার স্কি লিফট ওদের একশো মিটার দূরেও নয়। কর্ডের সরাসরি নিচের ঢালে কেউ স্কি করছে না দেখে প্রথমে ভারি অবাক হলো পিট। লোকজন চেয়ার থেকে নেমে পড়ছে, ঘুরে যাচ্ছে লিফটের উল্টোদিকে, তারপর ছুটছে সমান্তরাল স্কি ট্রেইল ধরে।
তারপর লক্ষ করল ও, ওর দিকের ঢালটা রশি দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। বিপজ্জনক বলে এদিকে কাউকে কি করতে নিষেধ করা হয়েছে, রশির সাথে ঝুলে থাকা রঙিন বোর্ডগুলোয় তাই লেখা।
রাস্তার এটাই শেষ মাথা, হতাশ কণ্ঠে বলল জিওনিনা।
তার সাথে একমত হয়ে পিট বলল, লিফটের দিকে যাব, তা সম্ভব নয়। দশ মিটার পেরোবার আগেই গুলি করে আমাদের সব কয়টাকে ফেলে দেবে ওরা।
তুষারের বল তৈরি করে ছুঁড়ে মারা যায়। নাকি আত্মসমর্পণ করার কথা ভাবছ?
তিন নম্বর প্ল্যানের কথাটা ভুলে গেছ? তিরস্কার করল পিট।
কৌতূহল নিয়ে পিটকে দেখল জিওর্দিনো। প্রথম দুটোর চেয়েও খারাপ হবে সেটা, এ আমি বিশ্বাস করি না। তার পরই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তুমি কী ভাবছ…ওহ, গড়, নো!
মার্সিডিজ দুটো পৌঁছে গেল, প্রতিপক্ষ থুথু ছুড়লেও ওদের গায়ে লাগবে। কর্ডের দুপাশে চলে এসেছে প্রায়। হুইল মোচড় দিল পিট, গাড়িটাকে নামিয়ে দিল স্কি রান এ, অর্থাৎ বিপজ্জনক ঢালে।
.
২৯.
আল্লাহ সহায় হোন! উন্মাদ! ওরা উন্মাদ! বিড়বিড় করে বলল ইসমাইলের ড্রাইভার। ওদেরকে ধরা সম্ভব নয়।
তাড়া করো! হুঙ্কার ছাড়ল ইসমাইল। যদি পালায়, তোমাকে আমি খুন করব!
পালিয়ে যাবে কোথায়! হিসহিস করে বলল ড্রাইভার। দেখছ না, আত্মহত্যা করছে ওরা? পাহাড়ের মাথা থেকে সচল গাড়ি নিয়ে নামতে চেষ্টা করলে কেউ বাঁচে?।
অটোমেটিক রাইফেলের ব্যারেলটা স্যাঁৎ করে ঘোরালো ইসমাইল, ড্রাইভারের কানে মাজল চেপে ধরল। বেজন্মা শুয়োর, ওদের ধর, নয়তো আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেব তোকে!
ইতস্তত করল ড্রাইভার, বুঝতে পারছে ধাওয়া করলেও, মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হবে, না করলেও। হাল ছেড়ে দিয়ে কর্ডের পিছু নিল সে, কিনারা থেকে ঢালে নামিয়ে আনল মার্সিডিজকে। আল্লাহ, অন্তত আমাকে তুমি রক্ষা করো!
ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ভেতর রাইফেলের ব্যারেল লম্বা করে ইসমাইল বলল, গাড়ি সিধে করে রাখো। দ্বিতীয় গাড়ির ড্রাইভার ইতস্তত করেনি, প্রথমটার পিছু পিছু নেমে এসেছে ঢালে।
