দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার ইসমাইলের ঠিক পেছনেই ছিল, সে দেখতেই পায়নি বাতাস চিরে একটা মিসাইল ছুটে আসছে। সামনের হেডলাইট হঠাৎ করে লাল হয়ে উঠতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। পেছনে থেকে প্রথম মার্সিডিজকে ধাক্কা দেয়ার সময় অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, দেখল ধাক্কা খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে গাড়িটা, চোখের পলকে উল্টো দিকে অর্থাৎ তার দিকে মুখ করল সেটা।
তুমি কি ঠিক এটাই চাইছিলে? ফুর্তির সাথে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।
অক্ষরে অক্ষরে। শক্ত হও, অ্যাল, বাঁকের কাছে এসে পড়েছি। স্পিড কমাল পিট, সরু একটা তুষার ঢাকা পথে ঘুরিয়ে নিল কর্ডকে। পথটা আঁকাবাঁকা, কোনো কোনো বাকের পর উল্টো দিকে বিস্তৃত হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে পাহাড়ের চূড়ায়।
পিচ্ছিল, অমসৃণ পথ। ভারী গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একশো পনেরো ঘোড়ার স্ট্রেইট-এইট ইঞ্জিনের ওপর খুব ধকল যাচ্ছে। স্প্রিংবহুল চেসিস সবাইকে নিয়ে টেনিস বলের মতো খেলতে লাগল।
মেঝে থেকে তুলে নিজেদেরকে সিটের ওপর বসিয়েছে মহিলা আরোহীরা, দুজোড়া পা ডিভাইডার পার্টিশনটাকে পেঁচিয়ে রেখেছে, সিলিংয়ের স্ট্র্যাপ ধরে ঝুলে আছে।
ছয় মিনিট পর জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে এল ওরা। রাস্তার দুধারে এখন বড়বড় বোল্ডার আর গভীর তুষার। পিটের প্রথম ইচ্ছে ছিল কর্ড ফেলে পালাবে ওরা, পাথর আর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে কেটে পড়বে। কিন্তু ইচ্ছেটা বাতিল করে দিতে হলো পাউডার-মিহি তুষার দেখে, পা ফেলামাত্র হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাবে। বিকল্প উপায় একটাই আছে, চূড়ায় উঠে যাওয়া, তারপর একটা চেয়ার লিফট নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে শহরে নামা, হারিয়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে।
আমরা ফুটছি, ঘোষণা করল জিওর্দিনো।
র্যাডিয়েটর ক্যাপের চারদিকে থেকে বাষ্প উঠছে, আগেই দেখেছে পিট। টেমপারেচার গজের কাঁটাও উঠে গেছে হট লেখা ঘরে। এভাবে দৌড় খাটানো হবে ভেবে তৈরি করা হয়নি গাড়িটা, বলল ও। এখনও যে ভেঙে চারখানা হয়ে যায়নি সেটাই আশ্চর্য।
রাস্তা শেষ হয়ে গেলে? কী করব আমরা?
দুনম্বর প্ল্যানটা কাজে লাগাব। চেয়ার লিফটে চড়ে ধীরেসুস্থে নেমে যাব কাছাকাছি একটা সেলুনে।
তোমার স্টাইলটা পছন্দ হলেও, না বলে পারছি না যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, পেছন দিকে ইঙ্গিত করল জিওর্দিনো। বন্ধুরা ফিরে এসেছে।
এত ব্যস্ত ছিল পিট, অনুসরণকারীদের খবর রাখার সময় পায়নি। দুর্ঘটনা সামলে নিয়ে দুটো মার্সিডিজই আবার নতুন উদ্যমে কর্ডটাকে ধাওয়া শুরু করেছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাবারও অবসর পেল না ও পেছনের জানালার কাঁচ, হে’লা কামিল আর লিলির মাথার মাঝখানে, এক ঝাঁক বুলেটের আঘাতে গুঁড়িয়ে গেল, সামনের উইন্ডশিল্ড ফুটো করে বেরিয়ে গেল ঝাকটা। চোখের সামনে তিনটে ফুটো দেখতে পেল পিট, কিনারাগুলো এবড়োখেবড়ো। মহিলা আরোহীদের কিছু বলতে হলো না, আবার তারা আশ্রয় নিল গাড়ির মেঝেতে। এবার তারা চেষ্টা করল মেঝে ফুটো করে ভেতরে সেঁধোবার।
আমরা সন্দেহ হচ্ছে, রেঞ্চটা ছুঁড়ে দেয়ায় ওদের খুব রাগ হয়েছে, আঁচ করল জিওর্দিনো।
আমরা গাড়িটাকে যেভাবে ঠেলছে ওরা, আমারও খুব রাগ হচ্ছে!
চুলের কাটার মতো তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিল পিট, গাড়ি সিধে করার সময় চুরি করে তাকাল ধাওয়ারত মার্সিডিজগুলোর দিকে। দৃশ্যটার মধ্যে বিপদের উপাদান যথেষ্ট পরিমাণেই রয়েছে।
সামনের মার্সিডিজ এঁকেবেঁকে ছুটে আসছে। কর্ডের চাকা তুষারের ওপর গভীর গর্ত তৈরি করেছে, সেই গর্তের ফাঁদে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই ড্রাইভারের, উন্মত্ততার সাথে সারাক্ষণ হুইল ঘোরাচ্ছে সে। প্রতিটি বাকে পিছলে রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছে না। প্রায়ই তুষারের স্তূপে আটকা পড়ছে চাকা। মার্সিডিজে স্লে টায়ার লাগানো নেই দেখে অবাক হলো পিট। ওর জানা নেই, নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য গাড়িগুলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে চালিয়ে এনেছে সন্ত্রাসবাদীরা। অস্তিত্বহীন একটা টেক্সাটাইল কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করা ওগুলো, হে’লা কামিলের জান কবচ করার পর দুটোকেই ফেলে যাওয়া হবে ব্রেকেনরিজ এয়ারপোর্টে।
যা দেখল, মোটেও, খুশি হতে পারল না পিট। মাঝখানের দূরত্ব দ্রুত কমছে। ওরা মাত্র পঞ্চাশ মিটার পেছনে। পছন্দ হলো না অটোমেটিক রাইফেল হাতে লোকটাকেও, সামনের মার্সিডিজের ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ফাঁক দিয়ে ব্যারেল বের করে ওদের দিকে লক্ষ্যস্থির করার চেষ্টা করছে সে।
ভগ্নদূতেরা আসছে! চেঁচাল পিট, হুইলের নিচে মাথা লুকাল, ড্যাশবোর্ডের কিনারা দিয়ে কোনো রকমে দেখতে পাচ্ছে সামনের রাস্তা। সবাই নিচু হও!
কথাগুলো মুখ থেকে বেরোতে যা দেরি, কর্ডের গায়ে আঘাত করল এক ঝাঁক বুলেট। প্রথম বিস্ফোরণে ডান দিকের ফেন্ডার মাউন্টিংয়ের ওপর শাখা স্পেয়ার টায়ার আর হুইল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। পরের ঝক ছাদটাকে ফুটো করল। নিজের অজান্তেই মাথাটা আরও নামিয়ে নিল পিট। পেছনের দরজা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল কজাগুলো, দরজাটাও উড়ে গেল বাতাসে ডানা মেলে। একটা গাছের সাথে ঘষা খেল কর্ড। বৃষ্টির মতো ঝরল কাঁচের টুকরো। মহিলা আরোহীদের একজন আর্তনাদ করে উঠল, দু’জনের মধ্যে কে বোঝা গেল না। ড্যাশবোর্ডে গাঢ় রক্তের পোচ দেখতে পেল পিট। পরমুহূর্তে উপলব্ধি করল, একটা কান এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে বুলেট। কী আশ্চর্য, কৌতুকপ্রবণ ইটালিয়ান যুবক টু-শব্দটিও করল না।
