আবার একবার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। ওদের চোখের সাদা অংশটুকুও আমি দেখতে পাচ্ছি।
.
হাতের অস্ত্র জ্যাম হতেই ভাগ্যকে গালি দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, মার্সিডিজ থেকে হাইওয়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সেটা। পেছনে বসা এক সঙ্গীর হাত থেকে আরেকটা অস্ত্র ছিনিয়ে নিল সে, জানালার দিকে ঝুঁকে এক ঝাঁক গুলি ছুড়ল কর্ড লক্ষ্য করে। মাজল থেকে মাত্র পাঁচটা শেল বেরোল, অ্যামুশিন ক্লিপ খালি হয়ে গেছে। আরেকটা ক্লিপের সন্ধানে পকেট হাতড়াতে শুরু করে আবার গাল দিল সে, ক্লিপটা বের করে স্লটে ঢোকাল।
উত্তেজিত হয়ো না, শান্তভাবে বলল ড্রাইভার। সামনের এক কিলোমিটারের মধ্যেই ওদেরকে ধরে ফেলব। কর্ডের বাঁ দিকে থাকব আমরা, দ্বিতীয় মার্সিডিজ নিয়ে সাদ্দাম থাকবে ডান দিকে। দুদিক থেকে গুলি করে সব কটাকে পাঠিয়ে দেব জাহান্নামে।
মাঝখানে যারা বাদ সেধেছে তাদের আমি নিজের হাতে মারতে চাই! গর্জে উঠল ইসমাইল।
সুযোগ তুমি পারে। ধৈর্য ধরো।
বলা যায়, বায়না ধরা শিশুর মতো, যার আবদার রক্ষা করা হয়নি, হাঁড়িপানা মুখ নিয়ে ধপাস করে সিটের ওপর বসে পড়ল ইসমাইল, চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে থাকল সামনের গাড়িটার দিকে।
মোহাম্মদ ইসমাইল নিকৃষ্টতম খুনিদের একজন। অপরাধবোধের সাথে তার পরিচয় নেই। হাসতে হাসতে একটা মাতৃসদন উড়িয়ে দিতেও তার বাধবে না। প্রথমশ্রেণীর খুনিরা তাদের কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে মাথা ঘামায়, কাজটা সারার পর ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে চিন্তা করে, আরও নিখুঁত হবার চেষ্টা করে পরবর্তী কাজটায়। মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে এ সবের কোনো গুরুত্ব নেই। যথেষ্ট সময় আর মেধা খরচ না করায় তার প্ল্যানে স্কুল সব ভুল থেকে যায়, সেজন্য অঘটনও কম ঘটে না। ইতিমধ্যে দুবার দু’জন মানুষকে মারতে গিয়ে তাদের বদলে অন্য দু’জনকে মেরে এসেছে সে। এ ধরনের ঘটনা ইসমাইলের মতো খুনীদের আরও বিপজ্জনক করে তোলে। উত্তেজিত হাঙরের মতো অস্থিরমতি, কখন কী করবে ধারণা করা যায় না, ঘটনাচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে পাইকারি হারে নিরীহ মানুষজনকে খুন করবে। তার প্রেরণার উৎস হলো ধর্ম। তার ধারণা, ধর্মের নামে কাফেরদের খুন করে বিপুল সওয়াব হাসিল করছে সে। খুন করে ভারি মজা পায় মোহাম্মদ ইসমাইল, আরও খুন করা প্রেরণা অনুভব করে, ধরে নেয় আল্লাহ তার প্রতি বিশেষভাবে সন্তুষ্ট বলেই তাকে এত আনন্দ দান করছেন।
গাড়ি আরও জোরে চালাও! ড্রাইভারকে তাগাদা দিল সে। মনে থাকে যেন, সব কয়টার মাথায় গুলি করতে চাই আমি! বেজন্মাদের আমি দেখিয়ে দেব!
.
ওরা বোধ হয় অ্যামুনিশন বাঁচাচ্ছে, কৃতজ্ঞচিত্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল জিওর্দিনো।
আমাদেরকে মাঝখানে রেখে স্যান্ডউইচ তৈরি করতে চাইছি, বলল পিট। যাতে মিস না করে। রাস্তার দিকে চোখ, তবে মাথার ভেতর পালানোর পথ খোঁজার কাজ চলছে দ্রুত।
একটা রকেট লঞ্চার পেলে আমি আমার রাজ্য হারাতেও রাজি আছি।
ভালো কথা মনে করেছ। সকালে গাড়িতে ওঠার সময় কী যেন একটা ঠেকেছিল পায়ে, ঠেলে সিটের তলায় পাঠিয়ে দিই, বলল পিট।
মেঝের দিকে ঝুঁকে পিটের সিটের নিচেটা হাতড়াল জিওর্দিনো। ঠাণ্ডা, শক্ত কী। যেন একটা ঠেকল হাতে। চেহারা ব্যাজার হয়ে উঠল তার। স্রেফ একটা সকেট রেঞ্চ, এ দিয়ে কিছুই হবে না।
সামনে একটা জিপ ট্রেইল, স্কি রান-এর চূড়ায় উঠে গেছে। সাপ্লাই আর ইকুইপমেন্ট নিয়ে দুচারটে গাড়ি মাঝেমধ্যে যায় ওদিকে। জঙ্গল বা নালায় গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। হাইওয়েতে থাকলে বাঁচার কোনো আশা নেই।
সামনে কতদূর?
পরবর্তী বাঁকের কছাকাছি।
কিন্তু হাইওয়ে ছাড়লে আমাদের স্পিড আরও কমবে, বলল জিওর্দিনো। ব্যাপারটা ফাঁদ হয়ে উঠবে না তো?
তুমিই বলো।
তৃতীয়বার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। পঁচাত্তর মিটার দূরে ওরা, দূরত্ব প্রতি মুহূর্তে কমছে।
ওদের গতি মন্থর করতে হবে।
তুমি অনুমতি দিলে আমি আমার কুৎসিত চেহারাটা ওদেরকে দেখাতে পারি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতেও আপত্তি নাই, শুকনো গলায় প্রস্তাব রাখল জিওর্দিনো।
তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না, ওরা আরও বরং খেপে উঠবে। না হে, তার চেয়ে এক নম্বর কাজে লাগাও।
ব্রিফিংটা আমি মিস করেছি, ব্যাঙ্গের সুরে বলল জিওর্দিনো।
ছোঁড়াছুড়িতে তোমার হাত কেমন?
বুঝতে পেরে মাথা আঁকাল জিওর্দিনো। বাহনটাকে একটা সরলরেখায় ধরে রাখো, অ্যাল জিওর্দিনো-বম্ব এখন প্রতিপক্ষের ওপর নিক্ষিপ্ত হবে।
খোলা টাউন কার আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চমৎকার উতরে গেলে। পেছন দিকে মুখ করে সিটে হাঁটু সাঁটিয়ে সিধে হলো জিওর্দিনো, ছাদের ওপর উঁচু হলো তার কাঁধ আর মাথা। লক্ষ্যস্থির করল সে, হাত তুলল, ছুঁড়ে দিল রেঞ্চটা। ধনুকের মতো বাঁকা একটা পথ তৈরি করে ছুটল হাতিয়ার, সামনের মার্সিডিজটাকে লক্ষ্য করে।
পলকের জন্য থেমে গেল হৃৎপিণ্ড। রেঞ্চ টার্গেটে পৌঁছনোর আগেই বড় বেশি নিচে নেমে যাচ্ছে। টার্গেটে নয়, পড়ল হুডের ওপর। তবে পড়ে ছিটকে গেল, উইন্ডশিল্ডটা নিখুঁতভাবে চুরমার করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
আতঙ্কবাদী ড্রাইভার জিওর্দিনোকে জিনিসটা ছুঁড়তে দেখেছিল। তার ক্ষিপ্রতা ভালো হলেও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ভালো নয়। ব্রেকে চাপ দিল সে, বন বন করে হুইল ঘোরাল রেঞ্চের পথ থেকে সরে যাবার জন্য, ঠিক তখনই হাজারটা টুকরো হয়ে গেল উইন্ডশিল্ডের কাঁচ, ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। স্টিয়ারিং হুইলের গায়ে বাড়ি খেয়ে মোহাম্মদ ইসমাইলের কোলের ওপর পড়ল রেঞ্চটা।
