মুখে ঠাণ্ডা বাতাস লাগায় চোখ কোঁকাল জিওর্দিনো। কানের পেছনে হাত রাখল একটা। ধীরে ধীরে বিস্ময় ফুটে উঠল চেহারায় রাশিয়া ছত্রীসেনা পাঠিয়েছে?
দেখো, দেখো–ওহে, গড! চেঁচিয়ে উঠল লিলি। জঙ্গলে আগুন ধরে গেছে?
গাছপালার মাথার ওপর হঠাৎ ভাসতে দেঘা গেল কালো ধোয়া; ধোয়ার নিচে কমলা রঙের লকলকে শিখা। বড় বেশি ঘন, তাই না, ধোয়াটা? মন্তব্য করল জিওর্দিনো, আমি বলব, গাছপালা নয়, নিরেট কোনো কাঠামোয় আগুন ধরেছে-হয় কোনো বাড়ি, নয়তো দোচালায়।
হ্যাঁ, শান্ত সুরে বলল পিট। কী ঘটছে না বুঝে নামা উচিত হবে না। প্রথমে পাশ কাটিয়ে যাব আমরা। অ্যাল, সামনে চলে এসো। লিলি, পেছনে বসো, মাথা নিচু করে থাকবে।
কেন, আমাকে সামনে বসতে হবে কেন?
তোমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে কাভার দেয়ার জন্য, বলল পিট। তাড়াতাড়ি করো! ধমক লাগল ও। আমি সন্দেহ করছি, গোলাগুলি আর আগুন ধরাবার সাথে সন্ত্রাসবাদীরা জড়িত থাকতে পারে।
সন্ত্রাসবাদী! কী বলছ! পিট, তুমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছ?
পিট জবাব দিল না। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিল জিওর্দিনো। লিলিকে পেছনে আসতে সাহায্য করল সে, নিজে সামনে গিয়ে বসল।
প্রাইভেট রোডের মুখ থেকে আধ মাইল দূরে, হাইওয়ের পাশে থেমে আরোহীরা যার যার গাড়ির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে উঁকি মারছে, কালো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অটোমেটিক রাইফেলের আওয়াজ শুনছে। শেরিফের অফিস থেকে এখনও কেউ পৌঁছায়নি দেখে অবাক হলো পিট। তার পরই ওর চোখ পড়ল বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ভ্যানটার ওপর। প্রাইভেট রোডের মুখে একটা বাধা হয়ে রয়েছে ভ্যানটা।
ডান দিকে তাকাল পিট, ধোঁয়া আর আগুন ছাড়িয়ে আরও সামনে কিছু দেখার চেষ্টা করল। এমন সময় হঠাৎ জঙ্গলের কিনারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা মূর্তি, সরাসরি কর্ডের দিকে ছুটে এল সে।
ব্রেকের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল পিট, ডান দিকে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাল। নব্বই ডিগ্রি বাক নিয়ে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি ঘুরে গেল কর্ড। পেভমেন্টের সাথে ঘষা খেল টায়ার। অবধারিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়ে স্থির পাথর হয়ে গেছে মূর্তিটা, ড্রাইভারের কাছ থেকে মাত্র এক মিটার দূরে।
পিটের হার্টবিট বেড়ে গেল। সিট থেকে ঝুঁকে নারীমূর্তির দিকে ভালো করে তাকাল ও, চোখে ফুটে উঠল সমীহ আর অকৃত্রিম বিস্ময়।
আ-আপনি। হে’লা কামিল হাঁপিয়ে উঠলেন। সত্যিই কি আপনি?
মিস কামিল? শূন্য চোখে চেয়ে আছে পিট।
ওহ্, থ্যাঙ্ক গড! ফিসফিস করে বললেন হে’লা কামিল। প্লিজ, সাহায্য করুন আমাকে! সবাইকে ওরা মেরে ফেলেছ! ওরা আ-আমাকে খুন করতে আসছে!
পিট হুইলের পেছন থেকে, আর লিলি প্যাসেঞ্জার কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে পড়ল। পেছনের সিটে উঠতে হে’লা কামিলকে সাহায্য করল ওরা। কারা? জিজ্ঞেস করল পিট।
আখমত ইয়াজিদের ভাড়াটে লোক। সিক্রেট সার্ভিসের সব কয়জন এজেন্টকে মেরে ফেলেছে। গাড়ি ছাড়ন, প্লিজ। এক্ষুনি এসে পড়বে ওরা!
শান্ত হোন, তার একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিল লিলি, এই প্রথম লক্ষ করল মহাসচিবের কাপড়চোপড় ধোয়া লেগে কালো হয়ে আছে, চুল এলোমেলো। আপনাকে আমরা সরাসরি একটা হাসপাতালে নিয়ে যাব।
তাড়াতাড়ি! জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললেন হে’লা কামিল। দেরি করলে আপনারাও মারা পড়বেন।
হে’লা কামিলের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ফেরাল পিট, আর ঠিক সেই সময় ঝোঁপ-ঝাড় ফুড়ে হাইওয়েতে বেরিয়ে এল মার্সিডিজ দুটো। এর সেকেন্ডের বেশি দেখল না ও, লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ড্রাইভিং সিটে। ফার্স্ট গিয়ার দিয়েই মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর, কর্ড ঘোরাল ওর জন্য খোলা একমাত্র দিকটায় ব্রেকেনরিজ-এর ফিরতি পথ ধরে ছুটল গাড়ি।
স্পেয়ার টায়ারের মাথায় একটা আচ্ছাদন রয়েছে, সেটার ওপর বসানো রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল পিট। মার্সিডিজ দুটো পিছু নিয়েছে, মাত্র তিনশো মিটার দূরে ওগুলো। পরমুহূর্তে দৃশ্যটা চুরমার হয়ে গেল একঝাঁক বুলেট ছুটে এসে আয়নার কাঁচ গুঁড়িয়ে দেয়ায়।
মেঝের সাথে সেঁটে থাকুন! চিৎকার করল পিট।
পেছনের অংশে ড্রাইভ শ্যাফট না থাকায় মেঝেতে প্রচুর জায়গা, হে’লা কামিলকে নিয়ে সেখানে কুণ্ডলী পাকাল লিলি।
চিন্তা করবেন না, অভয় দিয়ে বলল ও। একবার শহরে পৌঁছতে পারলে আমরা নিরাপদ।
মাথা নাড়লেন হে’লা কামিল। এ যাত্রা আমাদের কেউ বাঁচতে পারবে না। আমরা ফ্যানাটিকাল আতঙ্কবাদীদের পাল্লায় পড়েছি।
সামনের সিটে কুঁকড়ে যতটা সম্ভব ছোট হয়ে গেছে অ্যাল জিওর্দিনো। এটার টপ স্পিড কত? তুমি জানো, এখনও আমি বিয়ে করিনি!
এল-টোয়েনটি নাইনের টপ স্পিড রেকর্ড করা হয়েছে সাতাত্তর, জবাব দিল পিট, ওগুলো কী?
ঝট করে ঘুরল জিওর্দিনো, দরজার ওপর ঝুঁকে উঁকি দিল পেছনে। সামনে থেকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোনো মডেলেরর মার্সিডিজ, তবে সম্ভবত থ্রি হানড্রেড এস.ডি.এল.।
ডিজেল?
টার্বো চার্জড ডিজেল, ঘণ্টায় দুশো বিশ কিলোমিটার ছুটতে পারে।
দূরত্ব কমছে?
ছারপোকাকে বানর তাড়া করলে দূরত্ব কমে না বাড়ে? ঝাঁঝের সাথে পাল্টা প্রশ্ন করল জিওর্দিনো। শেরিফের অফিস অনেক দূরে থাকতেই ওরা আমাদেরকে ধরে ফেলবে।
পায়ের চাপ দিয়ে মেঝের সাথে সেঁটে ধরল পিট ক্লাচ। গিয়ার বদলে থার্ডে দিল। কোথাও না থেমে নাগালের বাইরে থাকার চেষ্টা করব। থামতে যাচ্ছি দেখলেই এলোপাতাড়ি গুলি করবে ওরা, তাতে বহু নিরীহ মানুষ মারা পড়তে পারে। খুন করা ওদের এক ধরনের নেশা।
