সশস্ত্র ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে কৌশলটা ভালো। কিন্তু অদৃশ্য আতঙ্কবাদীদের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো কাজে লাগল না, কারণ তারা হঠাৎ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। পাল্টা আঘাতে হানার সুযোগ দেয়া হলো না, তার আগেই ডেপুটি দু’জন গুলি খেয়ে মারা পড়ল।
এজেন্টদের একজন জানালা পথে উঁকি দিয়ে বাইরেটা দেখছে, তার ইঙ্গিতে হে’লা কামিল নিচু জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরের তুষারের ওপর পড়লেন। তিনি দাঁড়াবার আগেই এজেন্টরা লাফ দিল। দু’জন তার দুপাশে পাঁচিল তৈরি করল, তাঁর দুটো হাত ধরে ছুটিয়ে নিয়ে চলল কোনাকুনি পথ ধরে হাইওয়ের দিকে।
মাত্র ত্রিশ পা এগিয়েছে ওরা, ইসমাইলের একজন তোক দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল। ছুটন্ত, পলায়নরত মানুষগুলোর চারদিকে বুলেট-বৃষ্টি শুরু হলো। এজেন্টদের একজন আচমকা মাথার ওপর খাড়া করল হাত দুটো, যেন আকাশটাকে খামচে চাইছে। হোঁচট খেয়ে তিন পা এগোল সে। আছাড় খেল সটান। সাদা তুষার টকটকে লাল হয়ে উঠল।
ওরা চেষ্টা করছে আমরা যেন হাইওয়ের দিকে যেতে না পারি। হাঁপাতে হাঁপাতে, ধমকের সুরে কথা বলছে সে, আমি আপনাকে কাভার দেব, ওদেরকে ঠেকাব। আপনি একা হাইওয়েতে পৌঁছতে চেষ্টা করবেন।
এজেন্টের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলেন হে’লা কামিল, কিন্তু লোকটা তার কাধ ধরে ঘুরিয়ে দিল, তারপর পিঠে হাত রেখে ঠেলে দিল সামনের দিকে। দৌড়ান, ফর গডস সেক, দৌড়ান! আর্তনাদ করে উঠল সে।
কিন্তু এজেন্ট দেখল, এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অজান্তেই হাইওয়েতে পৌঁছানোর জন্য ভুল একটা পথ বেছে নিয়েছে তারা। পথের শেষে, রাস্তার কাছাকাছি, জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো মার্সিডিজ বেঞ্চ সেডান। উদ্ভ্রান্ত এজেন্ট উপলব্ধি করল, গাড়ি দুটো আতঙ্কবাদীদের। দিশেহারা বোধ করলেও, লোকটা তার কত ভুলল না। সন্ত্রাসবাদীরা হে’লা কামিলকে বাধা দেয়ার জন্য কোনাকুনি একটা পথ ধরে ছুটে আসছে। ওদেরকে সে ঠেকাতে পারবে না, জানে। নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে পারলে দেরি করিয়ে দিতে পারবে। সেই সুযোগে, ভাগ্য যদি সহায়তা করে, হে’লা কামিল রাস্তায় উঠে যেতে পারবেন। ভাগ্য যদি আরেকটু সহায়তা করে, হাইওয়ের কোনো গাড়ি হয়তো তাকে দেখে দাঁড়াতে পারে।
মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আতঙ্কবাদীদের দিকে সরাসরি ছুটল এজেন্ট, উজির ট্রিগারে আঙুল, কামানের গোলার মতো মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অশ্রাব্য খিস্তি।
মুহূর্তের জন্য ইসমাইল আর তার দল থমকে গেল, কারণ তাদের মনে হলো খোদ শয়তান ওদেরকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে। অবিশ্বাস্য দুটো সেকেন্ড পেরিয়ে গেল। তারপর তারা সবাই একেযোগে গুলি ছুড়ল। অকুতোভয় সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট বুলেটের আঘাতে ছিটকে পড়ল তুষারের ওপর। তবে তার আগে তিনজন শত্রুকে ধরাশায়ী করতে পেরেছে সে।
গাড়ি দুটোকে হে’লা কামিলও দেখলেন। আরও দেখলেন, সন্ত্রাসবাদীরা তার দিকে ছুটে আসছে। পেছন থেকে কান ফাটানো গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেলেন তিনি। লম্বা পা ফেলে ছুটছেন, হাঁপাচ্ছেন, হোঁচট খেয়ে ছোট একটা গর্তের ভেতর আছাড় খেলেন। জগিং করা অনেক দিনের অভ্যেস, লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে আবার ছুটলেন তিনি। দেখলেন সামনেই কালো অ্যাসফল্ট। ছোটার গতি কমালেন না, যদিও জানেন অবধারিত মৃত্যুকে তিনি শুধু দেরি করাতে পারছেন, এড়াতে পারছেন না। নিশ্চিতভাবে জানেন, দুচার মিনিটের মধ্যে তারও লাশ পড়ে থাকবে।
.
২৮.
ব্রেকেনরিজ থেকে হাইওয়ে ধরে রওনা হলো কর্ড। পুরনো গাড়ি হলে কী হবে, নতুন রং করা হয়েছে, সকালের রোদ লেগে চকমক করছে গা। লিফটের দিকে হেঁটে যাচ্ছে স্কিয়ারা, ষাট বছরের পুরনো গাড়িটাকে দেখে সহাস্যে হাত নাড়ল তারা। ঘেরা অংশে, পেছনের সিটে বসে ঝিমুচ্ছে অ্যাল জিওর্দিনো। লিলি বসেছে। পিটের সাথে বাইরে।
ভোরে ঘুম ভেঙেছে পিটের ইতস্তত একটা ভাব নিয়ে। ব্রেকেনরিজে এসেছে অথচ স্কি করবে না, তা কি হয়? এর আগে যতবার এখানে এসেছে ও, তুষার ঢাকা পাহাড় আর প্রান্তরের ওপর ছোটছুটি করে পাঁচ বা সাতটা করে দিন মহা আনন্দে কাটিয়েছে। এবারের আসাটা অবশ্য কাজ নিয়ে, ড. ফোরম্যানের পরামর্শ দরকার ছিল। তাগাদা দেয়া হয়েছে, দুচারদিনের ভেতরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির হদিশ বের করতে হবে। কিন্তু হিরাম ইয়েজার কোনো সূত্র না দেয়া পর্যন্ত পিটের কিছু করার নেই। করার যখন কিছু নেই, স্কি করার সুযোগটা গ্রহণ করা উচিত নয়?
ঘুম থেকে তুলে প্রস্তাবটা দিতে যা দেরি, লিলি আর জিওর্দিনো লাফিয়ে উঠল। কোনো রকমে শাওয়ার সেরে, নাকেমুখে ব্রেকফাস্ট গুঁজে বেরিয়ে পড়েছে ওরা, যাচ্ছে স্কি সরঞ্জাম ভাড়া করার জন্য পরিচিত একটা দোকানে।
এত সকালে আতশবাজি পোড়ায় কে? হঠাৎ অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল লিলি।
আতশবাজি নয়, বলল পিট, গুলিবর্ষণের তীক্ষ্ণ শব্দ আর গ্রেনেড বিস্ফোরণের ভোঁতা প্রতিধ্বনি আগেই ওর কানে গেছে। মনে হচ্ছে যেন পদাতিকে বাহিনী যুদ্ধে নেমেছে।
আওয়াজটা আসছে ওদিকের জঙ্গল থেকে, একটা হাত তুলে দেখল লিলি। রাস্তার ডান দিক থেকে।
কর্ডের গতি বাড়িয়ে দিল পিট, ডিভাইডার উইন্ডোর গায়ে নক করল। তন্দ্রা ছুটে গেল, সিটের ওপর সিধে হয়ে বসে জানালার কাঁচ সরাল সে। শোনো, বলল পিট।
