সন্ত্রাসবাদীদের একজন লজের উত্তর দেয়ালের নিচে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় পেল। গ্রেনেডের পিন খুলে জানালা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল সে। জানালার কাঁচ কতটা পুরু ধারণা করতে পারেনি, ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল গ্রেনেড়। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হবার আগে আতঙ্কে শুধু চেহারাটা বিকৃত করার সময় পেল সে।
লাফ দিয়ে ধাপ পেরোল এজেন্ট দু’জন, সদর দরজা স্যাৎ করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। বিরামহীন গুলি করছে সন্ত্রাসবাদীরা, একজনের পিঠে একটা বুলেট ঢুকল। পড়ে গেল লোকটা, তার শুধু পা দুটো দোরগোড়ায় দেখা গেল। এক সেকেন্ড পর টেনে ভেতরে ঢোকানো হলো তাকে, দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
অবিরাম গুলিবর্ষণের সব কয়টা জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ল, কিন্তু শক্ত কাঠের দেয়ালগুলোর তেমন কোনো ক্ষতিই হলো না। এজেন্টরা ইসমাইলের আরও দু’জন লোককে ফেলে দিল, তবে বাকি সবাই আড়াল নিয়ে এগিয়ে এল লজের আরও কাছাকাছি। এরপর তারা বিশ্ব মিটার দূর থেকে একের পর এক গ্রেনেড ছুঁড়তে শুরু করল জানালা লক্ষ্য করে।
লজের ভেতর কারও মুখে কথা নেই। একজন এজেন্ট নির্দয় ধাক্কা দিয়ে আনছে সে, ইচ্ছে ফায়ারপ্লেসের মুখটা আড়াল করবে, এই সময় এক ঝাঁক বুলেট ঢুকল ঘরের ভেতর। দেয়ালে পিছলে তিনটে বুলেট ছুটে এল, লোকটার শিরদাঁড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকল একটা, বাকি দুটো হৃৎপিণ্ড ফুটো করল। ডেস্কের আড়ালে বলে কিছুই দেখতে পেলেন না হে’লা কামিল, তবে কাঠের মেঝেতে পতনের শব্দটা তিনি শুনতে পেলেন।
গ্রেনেডগুলো বিপজ্জনক করে তুলল পরিস্থিতি। কাছ থেকে গ্রেনেডের টুকরো রাইফেল বুলেটের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। এজেন্টরা অভিজ্ঞ, নিশানাভেদে অব্যর্থ, কিন্তু এ ধরনের ব্যাপক হামলার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। অ্যামুনিশন শেষ হয়ে এসেছে, হাতে আর মাত্র কয়েকটা ক্লিপ।
ইসমাইল প্রথম গুলি করার সাথে সাথে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, কিন্তু জরুরি আবেদনটা ডেনভার সিক্রেট সার্ভিস অফিস হয়ে স্থানীয় শেরিফের কাছে পৌঁছতে মাঝখানে অপচয় হয়েছে মূল্যবান কয়েকটা মিনিট।
স্টোররুমে বিস্ফোরিত হলো একটা গ্রেনেড, রং ভর্তি বড় একটা টিনের পাত্রে আগুন ধরে গেল। স্লেব্লোয়ারে ভরার জন্য যে গ্যাস ক্যানটা ছিল, বিস্ফোরিত হলো সেটা। দেখতে দেখতে লজের এক দিকের পুরোটা দেয়ালে আগুন ধরে গেল।
আগুন ভালো করে ছড়াবার সাথে সাথে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক থেকে বৃত্তটাকে ছোটো করে আনল সন্ত্রাসবাদীরা। তাদের অটোমেটিক রাইফেল প্রতিটি জানালা আর দরজার দিকে তাক করা। আগুনের পুড়ে মরার ভয়ে লজের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে, ধৈর্যের সাথে সেই আশায় অপেক্ষা করছে।
এজেন্টদের মাত্র দু’জন এখনও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙাচোরা, উল্টে পড়া ফার্নিচারের সাথে রক্তাক্ত স্তূপের মতো পড়ে আছে বাকি সবাই। আগুনের শিখা সগর্জনে কিচেন হয়ে পেছন দিককার সিঁড়ি লক্ষ্য করে ছুটল, ছড়িয়ে পড়ল ওপরতলার বেডরুমগুলোয়। এরই মধ্যে আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে, ফায়ারব্রিগেড় ছাড়া আর কারও নেভাবার সাধ্য নেই। নিচের তলায় যারা রয়েছে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে সবাই। আর বেশিক্ষণ এখানে তারা টিকতে পারবে না।
শহরের দিক থেকে ভেসে আসা সাইরেনের আওয়াজ উপত্যকায় প্রতিধ্বনি তুলল।
এজেন্টদের একজন ফায়ারপ্লেসের সামনে থেকে উল্টে পড়া ডেস্কটা সরাল। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন হে’লা কামিল। এজেন্টের সাথে ক্রল করে নিচু একটা জানালার দিকে এগোলেন তিনি।
লোকাল শেরিফের ডেপুটিরা আসছেন, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল এজেন্ট। সন্ত্রাসবাদীরা ওদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়বে। সেই সুযোগে লজ থেকে বেরোব আমরা। তা না হলে পুড়ে মরতে হবে।
হে’লা কামিল শুধু নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাতে পারলেন। কানেও তিনি ভালো শুনতে পাচ্ছেন না। গ্রেনেডগুলোর বিস্ফোরণ তার কানে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। তবে চেহারায় ভয় বা হতাশার চিহ্ন মাত্র নেই, শুধু চোখ দুটো ভিজে রয়েছে। তাকে রক্ষার জন্য এজেন্টদের অকাতরে প্রাণ দিতে দেখেছেন তিনি, তাদের জন্য প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। একটা রুমাল দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরলেন, ধোঁয়ায় ভরে আছে ঘরের ভেতরটা।
বাইরে তুষারের ওপর শুষে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে মোহাম্মদ ইসমাইল। গোটা লজ দেখতে দেখতে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো। জানালা দিয়ে ধোঁয়া আর শিখা বেরিয়ে আসছে। কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকে, এক্ষুনি বেরিয়ে না এলে পুড়ে মরতে হবে তাকে।
কিন্তু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার সময় নেই, বুঝতে পারল ইসমাইল। লাল আর নীল আলোর ঝলক দেখে টের পেয়ে গেছে সে, পুলিশের গাড়ির হাইওয়েতে পৌঁছে গেছে।
টিমে ছিল বাবোজন, তাকে নিয়ে সাতজন বেঁচে আছে। কেউ আহত হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে, আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা যেন ইন্টারোগেট করতে না পারে। সাংকেতিক ভাষায় নিজের লোকদের নির্দেশ দিল সে। বৃত্ত ভেঙে পিছিয়ে এল লোকগুলো, তারপর এন্ট্রান্স রোডের দিকে ছুটল।
ডেপুটিদের প্রথম দলটা পৌঁছেই লজে ঢোকার রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করর। একজন রেডিও যোগে রিপোর্ট অপরজন সতর্কতার সাথে জ্বলন্ত লজটার দিকে তাকাল, শক্ত করে ধরে রিভলভারটা ওদের কাজ হলো দেখা রিপোর্ট করা, ব্যাকআপ টিমের জন্য অপেক্ষায় থাকা।
