কিন্তু আন্দাজ করতে অসুবিধা কী? জিজ্ঞেস করল পিট।
ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে, নৃত্যরত শিখাগুলোর দিকে দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন ড. রোথবার্গ। আমরা ধারণা, ভেনাটর ওগুলো এমন এক জায়গায় রেখেছেন, যেখানে খোঁজার কথা ভাববে না কেউ।
.
২৭.
মোহাম্মদ ইসমাইলের হাতঘড়িতে সাতটা আটান্ন মিনিট। একটা ঝোঁপের আড়ালে শুয়ে, পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে লজটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। দুটো চিমনির একটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। হে’লা কামিল, সে জানে, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেন, রাঁধতেও জানেন ভালো। তার অনুমানটাই ঠিক, গার্ডদের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করছেন তিনি।
মরুর মানুষ, হিম শীতল ঠাণ্ডা তার সহ্য হচ্ছে না। গোড়ালি ব্যথা করছে, হাত পায়ের আঙুল দস্তানার ভেতর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। হাটচলা করা সুযোগ থাকলে খুশি হতো সে। ধীরে ধীরে ভয়টা বাড়ছে তার, এভাবে তুষারের ওপর পড়ে থাকলে ক্ষিপ্রতা হারাবে সে। অপারেশনটা ভেস্তে যেতে পারে, কোনো উদ্দেশ্য পূরণ না করেই খুন হয়ে যেতে পারে প্রতিপক্ষের হাতে।
এ সবই আসলে অনভিজ্ঞতার ফল। মিশনের সংকটময় মুহূর্তে অস্থির হয়ে উঠছে সে। হঠাৎ তার সন্দেহ হলো, আমেরিকান গার্ডরা তার উপস্থিতির কথা জেনে ফেলেনি তো? নার্ভাস হয়ে পড়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার বা উপস্থিত বুদ্ধি খাটাবার ক্ষমতা হারাচ্ছে মোহাম্মদ ইসমাইল।
সাতটা উনষাট মিনিট। প্রাইভেট রোডে ঢোকার মুখে চট করে একবার তাকাল সে। ভ্যানটা সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। চার ঘণ্টা পর পর পালা বদল, লজ থেকে ভ্যানে আসে দু’জন, ভ্যান থেকে লজে ফিরে যায় অপর দু’জন। সময় ঘনিয়ে এসেছে, লজ থেকে দু’জন, যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে। লজ থেকে ভ্যানটা একশো মিটার দূরে।
বাড়ির পাশ ঘেঁষে একজন গার্ড টহল দিচ্ছে। বরফের ওপর দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে সে। মোহাম্মদ ইসমাইলের দিকে আসছে লোকটা। নিঃশ্বাস বাস্প হয়ে যাচ্ছে বেরিয়েই। সতর্ক দৃষ্টি বেমানান কিছু দেখার জন্য ছটফট করছে।
চারপাশের বৈচিত্র্যহীন দৃশ্য বা হাড় কাঁপানো শীত সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে নিস্তেজ করতে পারেনি। দৃষ্টিপথের প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে এগোচ্ছে সে। ডানে-বায়ে তাকাচ্ছে। আর এক মিনিটও নেই, তুষারের ওপর মোহাম্মদ ইসমাইলের পায়ের দাগ দেখতে পাবে সে।
ভাগ্যকে অভিশাপ দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, নড়েচড়ে তুষারের ভেতর আরও সেঁধিয়ে যাবার চেষ্টা করল। ঝোঁপের আড়ালে থাকলে কী হবে, সরু পাতা আর চিকন ডালের ফাঁক দিয়ে অবশ্যই তাকে দেখতে পাবে লোকটা। ওগুলো বুলেটও ঠেকাতে পারবে না।
কাঁটায় কাঁটায় আটটা বাজল। সেই সাথে লজের সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দু’জন লোক। তাদের মাথায় ক্যাপ, গায়ে স্কি কোট। রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে তারা, শান্তভাবে কথা বলছে, চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে তুষার ঢাকা আশপাশ।
পালাবদলের মুহূর্তে ভ্যানে লোক থাকবে চারজন, ইসমাইলের প্ল্যান ছিল ঠিক তখনই হামলা করবে তারা। হিসেবে ভুল হয়েছে তার, পজিশনে পৌঁছে গেছে সময়ের আগে। প্রাইভেট রোড ধরে পঞ্চাশ মিটারের মতো এগিয়েছে লোক দু’জন, এই সময় টহলরত গার্ড ইসমাইলের পায়ের ছাপ দেখতে পেল।
দাঁড়িয়ে পড়ল সে, ট্রান্সমিটার ধরা হাতটা উঠে গেল ঠোঁটের কাছে। ঠোঁট ফাঁকই হলো শুধু, কোনো আওয়াজ বেরোল না, তার আগেই ইসমাইলের হেকলার অ্যান্ড কোচ এমপি-ফাইভ সাবমেশিন গানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তার গলা।
অনভিজ্ঞ ইসমাইল অসময়ে অ্যাকশন শুরু করতে বাধ্য হলো। পেশাদার কেউ হলে সাইলেন্সর লাগানো সেমিঅটোমেটিক ব্যবহার করত, গুলি করত মাত্র একটা, সেটা লাগত গার্ডের দুই চোখের ঠিক মাঝখানে। দশ রাউন্ড গুলি করে গার্ডের গলা আর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছে সে, আরও বিশ রাউন্ডের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের বনভূমিতে। তার সঙ্গীদের একজন ব্যস্ততার সাথে ভ্যান লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ল একের পর এক, আরেকজন ভ্যানের দুপাশে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ল। একটা গ্রেনেড উইন্ডশিল্ড দিয়ে ভেতরে ঢুকল, জোরাল আওয়াজের সাথে বিস্ফোরিত হলো সেটা। সিনেমায় যেমন দেখা যায় তেমন কিছু ঘটলো না, আগুনের কুন্ডলী নিয়ে বিস্ফোরিত হলো না গ্যাস ট্যাংক। ভ্যানের শরীর ফুলে উঠল, ফেটে গেল, যেন পাকা একটা ফল।
আরোহীদের দু’জনেই সাথে সাথে মারা গেছে।
রক্ততৃষ্ণায় অধীরে দুই খুনি, কারও বয়সই বিশের বেশি নয়, বিধ্বস্ত ভ্যানের ওপর বার বার আঘাত হানল, রাস্তার ওপর যে আরও দু’জন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট রয়েছে তাদের কথা ভুলে গেছে। ইতোমধ্যে গাছের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে তারা, কাঁধ থেকে উজি নামিয়ে অব্যর্থ নিশানায় ঘায়েল করল আনাড়ি দুই আতঙ্কবাদীকে। ভ্যানের ভেতর সঙ্গী যারা রয়েছে তাদের আর সাহায্য দরকার নেই, বুঝতে পেরে লজের দিকে দ্রুত পিছু হটতে শুরু করল তারা, একজন ইসমাইলের সাথে গুলি বিনিময় করছে। কাছেপিঠে একটা বড় পাথর পেয়ে তার আড়ালে কাভার নিয়েছে ইসমাইল।
ইসমাইলের প্ল্যানটা মার খেল আরও একটা কারণে। কথা ছিল, গুলির শব্দ হবার সাথে সাথে দশজন আতঙ্কবাদী লজের পেছনের দরজার দিকে ছুটবে। হাঁটু সমান উঁচু, আলগা তুষার বাধা দিল তাদেরকে। অনেক দেরি করে ফেলল তারা, লজের ভেতর থেকে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা ঝাঁক ঝাক গুলি ছুঁড়ে ঠেকিয়ে দিল তাদের।
