এত দিনে ওগুলো নষ্ট হয়ে যাবার কথা নয়? জিজ্ঞেস করল পিট।
প্যাপিরাসের চেয়ে বেশি দিন টেকার কথা পার্চমেন্টের, বললেন ড. রোথবার্গ। পিটের দিকে তাকালেন তিনি। মোলোশো বছর পর ওগুলোর অবস্থা কী হয়েছে নির্ভর করে কোথায় রাখা হয়েছে তার ওপর। মিসরীয় সমাধি থেকে পাওয়া তিন হাজার বছরের পুরনো প্যাপিরাসের লেখাও তো পড়া গেছে।
গরম আর শুকনো আবহাওয়া।
ধরুন, সুইডেন বা রাশিয়ার উত্তর উপকূল কোথাও আছে ওগুলো।
চিন্তিতভাবে মাথা নিচু করলেন ড. নোথবার্গ। শীত ওগুলোকে সংরক্ষণ করবে, কিন্তু গরমের দিনে পচে যেতে পারে।
লাইব্রেরিটাকে অক্ষত খুঁজে পাবার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়ে গেল পিটের। কিন্তু লিলি ওর মতো হাতাশ নয়। সে কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি যদি জুনিয়াস ভেনাটর হতেন, ড. রোথবার্গ, কী ধরনের বই আপনি রক্ষা করতে চাইতেন?
কঠিন প্রশ্ন, চোখ পিট পিট করে লিলির দিকে ফিরলেন ড. রোথবার্গ। আমি শুধু আন্দাজ করতে পারি। সোফোক্লিস, ইউরিপেডিস, অ্যারিস্টটল আর প্লেটোর সমগ্র রচনা তো থাকবেই। আরও থাকবে, অবশ্যই, হোমার। তিনি বই লিখেছেন চব্বিশটা, কিন্তু অল্প দুচারটে হাতে পেয়েছি আমরা। আমরা ধারণা, গ্রিক, এট্রাসক্যান, রোমান ও ঈজিপশিয়ান মিলিয়ে পঞ্চাশ হার ভলিউম ইতিহাস অবশ্যই সাথে নিয়েছিলেন ভেনাটর, কারণ জাহাজের সংখ্যা তো আর কম ছিল না। ঈজিপশিয়ান বইগুলো অত্যন্ত মূল্যবান হবে, কারণ ওগুলো শুধু আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে ছিল বলে প্রাচীন মিসরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কিছুই আমরা আনতে পারিনি। এট্রাসক্যান সভ্যতা সম্পর্কেও প্রায় কিছুই আমরা জানি না অথচ ক্লডিয়াস তাদেরকে নিয়ে বড়সড় একটা ইতিহাস লিখেছিলেন-সেটাও নিশ্চয়ই লাইব্রেরির কোনো শেলফে আছে। ভেনাটরের জায়গায় আমি হলে হিব্রু আর খ্রিস্টান আইন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে লেখাগুলোও সাথে নিতাম। ওগুলোয় হয়তো এমন সব তথ্য ও উপাদান আছে, যা আজকের খ্রিস্টান ধর্মের পণ্ডিতদের বেকায়দায় ফেলে দিত।
বিজ্ঞান?
বিজ্ঞানের ওপর অসংখ্য বই লেখা হয়েছে সে যুগে। ভেনাটর সেগুলো না নিয়ে পারেন না।
রান্নার বইয়ের কথা ভুলে যাবেন না, লিলি বলে।
হেসে উঠলেন ড. রোথবার্গ। ভেনাটর অত্যন্ত বিবেচক ও বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, জ্ঞানের কোনো শাখাই তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। শুধু রান্নাবান্না কেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনের ওপর বা ঘর-গেরস্থালির ওপর লেখা বইও তিনি জাহাজে তুলেছিলেন বলে ধরে নেয়া যায়। সবার জন্যই কিছু না কিছু নিয়েছিলেন তিনি।
বিশেষ করে প্রাচীন জিওলজিকাল ডাটা, বলল পিট।
হ্যাঁ।
আচ্ছা, এ কথা কি জানা গেছে, মানুষটা কেমন ছিলেন তিনি? লিলির প্রশ্ন।
ভেনাটর?
হ্যাঁ।
তার যুগে তিনি সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম ছিলেন। এথেন্সে পণ্ডিত বলে খ্যাতি ছিল তার, সেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসেবে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় তাকে। আমরা জানি, রাজনীতি আর সামাজিক বিষয় নিয়ে একশোর ওপর বই লিখেছেন তিনি, আজ থেকে চার হাজার বছরের পুরনো পটভূমি সন্ধানও সেসব বইতে পাওয়া যায়। কিন্তু তার কোনো বই-ই রক্ষা পায়নি।
তাঁর সম্পর্কে আর কী জানেন আপনি? পিটের প্রশ্ন।
খুব বেশি না। ভেনাটরের অনেক মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যারা পরে বিখ্যাত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন অ্যানটিওক-এর ডায়োক্রেস। ডায়োক্লেস তার একটা রচনায় ভেনাটরের কথা উল্লেখ করেছেন-তার শিক্ষক নতুন কিছু প্রবর্তন বা আবিষ্কারের প্রতি নিবেদিত ছিলেন, এমন সব বিষয়ে গবেষণা চালাতেন তিনি, অন্যান্য পণ্ডিতরা সেসব বিষয়ে গবেষণা করতে ভয় পেতেন। যদিও খ্রিস্টান ছিলেন, তবে ধর্মকে তিনি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে দেখতেন। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ থিয়োফিলোস এর সাথে এই নিয়েই তার বিরোধ দেখা দেয়। ভেনাটরের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগেন থিয়োফিলোস, রায় দিয়ে বসেন লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণার ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সম্রাট থিয়োডোসিয়াসকে লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে রাজি করান। সম্রাট ছিলেন গোড়া খ্রিস্টান। পোড়ানোর সময় খ্রিস্টান আর অখ্রিস্টানদের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়ে যায়। ধরে নেয়া হয়েছিল, থিয়োফিলোস-এর ফ্যানাটিকাল অনুসারীদের হাতে নিহত হন ভেনাটর।
কিন্তু এখন আমরা জানি সংগ্রহের ভালো একটা অংশ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, বলল লিলি।
রাস্তার ঝাড়ুদার লটারিতে এক মিলিয়ন ডলার পেলে যেমন খুশি হয়, সিনেটর পিটের মুখে গ্রিনল্যান্ডে তোমরা কী আবিষ্কার করেছ শুনে আমিও ঠিক সে রকম খুশি হয়েছি।
ভেনাটর ওগুলো কোথায় রাখত পারেন, আপনি কোনো ধারণা দিতে পারেন? জিজ্ঞেস করল পিট।
দীর্ঘ এক মিনিট চুপ করে থাকলেন ড. রোথবার্গ। তারপর শান্ত গলায় তিনি বললেন, জুনিয়াস ভেনাটর সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন না। তিনি তার নিজের পথ অনুসরণ করছিলেন। জ্ঞানের পাহাড় ছিল তাঁর হাতে। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, অমূল্য সম্পদ ভাবী বংশধরদের জন্য সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেছেন। ষোলোশো বছর পেরিয়ে যেতে চলল অথচ আজও লাইব্রেরিটার কোনো সন্ধান আমরা পাইনি, এ থেকেই কি প্রমাণ হয় না যে লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি? পরাজয় স্বীকার করার ভঙ্গিতে হাত দুটো মাথার ওপর তুললেন তিনি। আমি কোনো সূত্র দিতে অপরাগ। ভেনাটরের বুদ্ধির নাগাল পাওয়া আমার সাধ্যের অতীত।
