চার দিনের মধ্যে শেষ করতে পারবে?
তুমি তাগাদা দিলে ভাড়াটে কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে পারি।
তাগাদা খুব জোরাল বলে ধরে নাও। আর্জেন্ট প্রায়োরিটি।
ঠিক আছে, সাধ্যমতো চেষ্টা করব।
ব্রেকেনরিজ, কলোরাভোয় রয়েছি আমরা। যদি কিছু পাও, ব্রেকেনরিজ হোটেলে খবর দেবে। ইয়েজারকে রুম আর ফোন নম্বর দিল পিট। ভালো কথা, তোমাকে এত খুশি লাগছে কেন?
নদীটা কোথায় এখনও তা আমি জানি না, জবাব দিল হিরাম ইয়েজার, কিন্তু জানি কোথায় সেটা নেই।
.
হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরোল ওরা, সাদা পাউডারের মতো তুষারে ঢাকা পড়ে গেল জামা-কাপড়। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ২২ বি নম্বরে থাকেন ড. বেরট্রাম রোথবার্গ। দরজা খুলে দিয়ে এমন আন্তরিকতার সাথে ওদেরকে তিনি অভ্যর্থনা জানালেন যেন কত বছরের পরিচয়। সিটিংরুমে, আগুনের চারপাশে বসালেন ওদেরকে। নিজে রান্না করতে শিখিনি, রেস্তোরাঁ থেকে দিয়ে যায়-আজ আটটার সময় দেবে। তার আগে একটু গরম হয়ে না, বাছারা! তিনি নিজেই সবার হাতে হুইস্কির গ্লাস ধরিয়ে দিলেন। পিট নিজেদের পরিচয় দিল না। সন্দেহ নেই, সিনেটর পিট আগেই ওদের সবার বর্ণনা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
বাবা বলছিলেন আপনি নাকি সারা জীবন ধরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ওপর গবেষণা করছেন।
ছোটখাট মানুষটা, মোটা সোয়েটার আর ট্রাউজার পরে আছেন, দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা পড়ে আছ ছোট্ট মুখটা। সলজ্জভাবে একটু হাসলেন তিনি। বত্রিশ বছর। ধুলো ঢাকা বুকশেলফ আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে শুধু চোখ নষ্ট করেছি, বোধ হয় বিয়ে করে সংসারী হলেই ভালো করতাম। তবে সাবজেক্টটা আমার কাছে রক্ষিতার মতো কখনও কিছু চায় না, শুধু দেয়। আমি যে তার প্রেমে পড়ে গেছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন প্রৌঢ় ইতিহাসবেত্তা। তারপর লিলির দিকে ফিরে বললেন, একজন আর্কিওলজিস্ট হিসেবে তুমি আমার অনুভূতি বুঝতে পারবে।
লাইব্রেরিটা সম্পর্কে বলবেন আমাদের, প্লিজ? অনুবোধ জানাল জিওর্দিনো।
ফায়ারপ্লেসের আগুনটা উসকে দিয়ে এলেন ড. রোথবার্গ। প্রাচীন দুনিয়ার একটা বিস্ময় ছিল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। গোটা সভ্যতার সমস্ত দলিলপত্র আর নমুনা ওখানে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। আধবোজা চোখে বলে গেলেন তিনি, যেন তাকে সমাহিত করা হয়েছে।
গ্রিক ঈজিপশিয়ান আর রোমানদের মহৎ শিল্প আর সাহিত্য ইহুদিদের পবিত্র বাণী, প্রাচীন দুনিয়ার সেরা মেধাসম্পন্ন মনীষীদের জ্ঞান আর কীর্তি, দর্শনের বিস্ময়কর তত্ত্ব, সুর আর সঙ্গীতের অপূর্ব সব আবিষ্কার, প্রাচীন বেস্টসেলার, বিজ্ঞান আর মেডিসিনের যুগান্তকারী সব কৃতিত্ব, কী না জমা ছিল লাইব্রেরিটায়!
ওটা কি সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকত?
মুর্খ বা ভিখিরীদের অবশ্যই প্রবেশাধিকার ছিল না, বললেন ড. রোথবার্গ। তবে গবেষক আর পণ্ডিতরা নিয়মিত যেতেন লাইব্রেরিতে-পরীক্ষা, যাচাই, অনুবাদ, সংশোধন করতেন তারা; ক্যাটালগ তৈরি করতেন। শুধু সংগ্রহশালা বললে ভুল হবে, ওটা ছিল দুনিয়ার প্রথম রেফারেন্স লাইব্রেরি। প্রতিটি আইটেম ক্যাটালগে ভোলা ছিল, সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো রাখা হতো।
পরবর্তী সম্রাটরা এবং বহু জাতি আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ঋণ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছে। প্রাচীন যুগে আর কোনো প্রতিষ্ঠানে এত জ্ঞান-সম্পদ ছিল না। প্লিনী, প্রখ্যাত রোমান পণ্ডিত, প্রথম খ্রিস্টাব্দে এনসাইক্লোপিডিয়া রচনা করেন। অ্যারিসটোফানেস, খ্রিস্টের জন্মের দুশো বছর আগে লাইব্রেরির প্রধান ছিলেন-তোমরা জানো, তিনিই প্রথম অভিধান রচনা করেন। ক্যালিম্যাচাস গ্রিক ট্র্যাজেডির বিখ্যাত লেখক, সবার আগে রচনা করেন হুজ হু! পণ্ডিত, অঙ্কশাস্ত্রবিদ ইউক্লিড জ্যামিতির ওপর প্রথম টেক্সটবুক লেখেন। সুষ্ঠুভাবে সাজিয়ে ব্যাকরণের নিয়মকানুন প্রথম প্রকাশ করেন। ডাইয়োনাইসিয়াস। আর্ট অব গ্রামার তার একটা মহৎ সৃষ্টি, প্রায় সব ভাষার জন্য ওটা একটা মডেল হয়ে ওঠে। এই সব মনীষীরা, আরও হাজার হাজার পণ্ডিতদের সাথে বসে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে কাজ করেছেন।
আপনি যেন একটা ইউনিভার্সিটির বর্ণনা দিচ্ছেন, মন্তব্য করল পিট।
ইউনিভার্সিটিই তো ছিল সেটা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার। তখনকার দিনে লাইব্রেরি আর মিউজিয়ামটাকে এক করে বলাও হত তাই-হেলেনিস্টিক দুনিয়ার ইউনিভার্সিটি। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল সব কাঠামোর মধ্যে পিকচার গ্যালারি ছিল, মূর্তিগুলোর জন্য ছিল আলাদা হলঘর, কবিতা পাঠের আসর বসত থিয়েটার হলে, পণ্ডিতরা জ্ঞানগর্ভ লেকচার দিতেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। লাইব্রেরির সাথে ডরমিটরি, ডাইনিং হল, চিড়িয়াখানা আর বোটনিক্যাল গার্ডেনও ছিল। প্রকাণ্ড আকারের দশটা হলঘরে রাখা হতো বই আর পাণ্ডুলিপি। সেগুলোর কয়েক হাজার ছিল হাতে লেখা, হয় প্যাপিরাসে নয়তো পার্চমেন্ট। লেখার পর সেগুলো গুটিয়ে ব্রোঞ্জ টিউবে ঢুকিয়ে রাখা হতো।
দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? প্রশ্ন করল অ্যাল।
প্যাপিরাস ট্রপিকাল প্লান্ট। মিসরীয়রা ওটার কাণ্ড থেকে লেখার জন্য কাগজের মতো এক ধরনের জিনিস তৈরি করত। পার্চমেন্ট, ভেল্যাম-ও বলা হয়, তৈরি হতো পশুর চামড়া থেকে-হাতি গরু ছাগল বা ভেড়ার বাচ্চার চামড়াই ব্যবহার করা হতো সাধারণত।
