হে শ্রদ্ধেয় নেতা, হে মহা বুজর্গ পীর, দয়া করে সব কথা আমাদেরকে খুলে বলুন! ব্যাকুল কণ্ঠে অনুরোধ জানাল ইয়াজিদের ছায়া অর্থাৎ মৌলানা আল-হাকিম।
ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল আখমত ইয়াজিদ। বিশ্বস্ত মেক্সিকো সূত্র থেকে জানতে পেরেছে সে, ট্যুরিস্টদের অপ্রত্যাশিত ভিড় হওয়ায় পাল্টা ডেল এসটে-তে অভিজাত কোনো হোটেল খালি নেই। জায়গার অভাবে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে রাজি নয় উরুগুয়ে সরকার, তাই বন্দরে নোঙর করা একটা জাহাজ ভাড়া করেছে তারা। ব্রিটিশ প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবরোয় অবস্থান করবে প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান ও তার সহকারীরা। তার সাথে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো ও স্টাফরাও থাকবে জাহাজে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার পর আখমত ইয়াজিদ চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হবার ভান করল, তারপর থেমে থেমে বলল, পরম করুণাময় আল্লাহ স্বয়ং আমার কাছে এসেছেন। তিনি এসে আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন জাহাজটা কব্জা করি।
সকল প্রশংসা আল্লাহর! হুঙ্কার ছাড়ল খালেদ ফৌজি।
বাকি সবাই চেহারায় অবিশ্বাস নিয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর তারা, সবাই প্রায় একযোগে, চোখে প্রত্যাশা নিয়ে ইয়াজিদের দিকে তাকাল, তবে কেউ কোনো প্রশ্ন উচ্চারণ করল না।
তোমাদের হাবভাব দেখে বুঝতে পারছি, শিষ্য এবং বন্ধুরা, আমার দিব্যদৃষ্টি সম্পর্কে তোমাদের সন্দেহ আছে।
সন্দেহ নেই বা কোনো কালে ছিল না, বলল মোহাম্মদ আল-হাকিম। কারণ আমরা জানি আপনি সদা সত্য কথা বলেন। তবে আমরা ভাবছি, আল্লাহর নির্দেশ আপনি বুঝতে ভুল করেননি তো?
না, আদেশটা স্পষ্ট ছিল, শুনতে আমার ভুল হয়নি। প্রেসিডেন্ট হাসানসহ জাহাজটাকে অবশ্যই দখল করতে হবে।
কী উদ্দেশ্য? প্রশ্ন করল মৌলানা আল-হাকিম।
দৃশ্যপট থেকে হাসানকে সরিয়ে রাখার জন্য, যাতে সে কায়রোয় ফিরতে না পারে, আর সেই সুযোগে আল্লাহর প্রিয় ইসলামিক ফোর্স ক্ষমতা দখল করবে।
কর্নেল নাগিব বশির বলল, কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমি জানি যে নিজে ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করলে আবু হামিদ তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাধা দেবে।
মানুষের ঢল আর স্রোতকে ঠেকাবে কীভাবে আবু হামিদ? জিজ্ঞেস করল আখমত ইয়াজিদ্র। নাগরিক অসন্তোষ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ঋণ শোধ করতে হচ্ছে, এই অজুহাতে সব রকম সাবসিডি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার, ফলে সাধারণ মানুষ সুদখোর ঋণ-দাতাদের ওপর ভয়ানক খেপে আছে। ঋণদাতা সংস্থাগুলোর নিন্দা না করে নিজেদের গলায় ফাঁস পরেছে হাসান আর আবু হামিদ। সবাই জানে, মিসরকে এখন শুধু নির্ভেজাল ইসলামী আইন রক্ষা করতে পারে।
লাফ দিয়ে চেয়ার ছাড়ল খালেদ ফৌজি মুঠো করা হাত তুলল মাথার ওপর, বজ্রকণ্ঠে বলল, আমাকে শুধু হুকুম করুন, হে ইসলামের খেদমতগার! আপনার এক কথায় বিশ লাখ মানুষকে আমি রাস্তায় মিছিল করাব। আপনি শুধু তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিন, হে আল্লাহর পেয়ারা দোস্ত!
সারা মুখে পবিত্র হাসি নিয়ে চুপ করে থাকল আখমত ইয়াজিদ। ধর্মীয় ভাবাবেগে একটু একটু কাঁপছে সে। তারপর সে বলল, জনতা, নেতৃত্ব দেবে। আমি তো গরিবের বন্ধু। জনতা নেতৃত্ব দেবে, আমি তাদের অনুসরণ করব।
আল্লাহ আমার গুনাহ মাফ করুন! প্রায় কেঁদে ফেলল মৌলানা আল-হাকিম। তাঁর নেক বান্দা জনাব আখমত ইয়াজিদকে আমি ভুল বুঝেছিলাম!
তুমি মৌলানা একটা কাপুরুষ! খালেদ ফৌজি চেঁচিয়ে বলল।
মোহাম্মদ আল-হাকিম তোমার চেয়ে জ্ঞানী, শান্তভাবে বলল খালেদ ফৌজি। তিনি জানেন, ঢিল একবার ছোঁড়া হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না। আল্লাহর নির্দেশ যখন এসেছে, সেটা নিখুঁতভাবে পালন করতে হলে নানা দিক খতিয়ে চিন্তা করার দরকার আছে।
কর্নেল নাগিব বশির কথা বলল, সন্ত্রাসবাদীদের মতো পাইকারি হত্যাকাণ্ড ঘটালে আমাদের আন্দোলনের জন্য তা মঙ্গল ডেকে আনবে না।
কর্নেল, তুমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে চাও? সরাসরি প্রশ্ন করল আখমত ইয়াজিদ, চেহারা দেখে মনে হলো ভারি বিস্মিত হয়েছে সে।
সবাই একযোগে কথা বলতে শুরু করল, প্রত্যেকেই নিজের কথা ছাড়া আর কিছু শুনতে আগ্রহী নয়। একা শুধু সুলেমান আজিজ নির্লিপ্ত থাকল। সব কয়টা গাধা, ভাবল সে, সব কয়টা। মুখ ফিরিয়ে ম্যাপের গায়ে সাঁটা প্রমোদতরীর দিকে তাকাল সে। মাথার ভেতর কাজ চলছে।
আমরা শুধু মিসরীয় নই, বলে চলেছে কর্নেল নাগিব বশির, সেই সাথে আমরা আরবও। আমরা যদি আমাদের অফিসারদের পাইকারিভাবে খুন করি, অন্যান্য আরব দেশগুলো আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। আল্লাহর নির্দেশ ইত্যাদি বলে তাদেরকে বোঝানো যাবে না, ব্যাপারটাকে তারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখবে।
মুসা মোহাইদিন ইঙ্গিত মৌলানা আল-হাকিমকে দেখল। মৌলানার কথায় যুক্তি আছে। বিদেশি একজন প্রেসিডেন্টের সামনে হাসানকে খুন করার চেয়ে তাকে বরং দেশের মাটিতে খুন করা হোক।
খুনটা করতে গিয়ে যদি বিদেশি প্রেসিডেন্ট বা তার সহকারীরা মারা পড়ে, সারা দুনিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে কথা উঠবে, চিন্তিত সুরে বলল মৌলানা আল-হাকিম।
খালেদ ফৌজি চিৎকার করে বলল, আপনারা সবাই আৰু হামিদের দালাল! আমি আবারও বলছি, জাহাজটা আক্রমণ করা হোক, দুনিয়া দেখুক আমরা কতটা শক্তি। রাখি। যদিও মারমুখো তরুণের কথায় কান দিল না কেউ।
